গণ্ডগোল হবে নাই বা কেন? হরদেব চট্টোপাধ্যায় কুলীন ব্রাহ্মণ, তিনি ব্রাহ্ম মতে পিরালী ব্রাহ্মণের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবার ব্যবস্থা করলে জ্ঞাতি কুটুষেরা দিশাহারা হয়ে ভাবলেন তাদের সবারই জাত যাবে। জাতকুল রক্ষার তোড়জোড় চলল ভালমতো। হরদেবের বড় ছেলে স্ত্রী-পুত্র নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন অন্য জায়গায়। শিশু পৌত্রের জন্যে বুকটা ফেটে গেলেও সংকল্পচ্যুত হলেন না হরদেব। দেবেন্দ্র যে তার প্রাণের বন্ধু, তার ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবেন, সেখানে সমাজ বাধা দেবার কে? এখন সমাজের ক্ষমতা আর তো নেই। এই তো সেদিন এক কুলীনের বউ স্বামীর বিরুদ্ধে মামলা করে খোরপোষ আদায় করলেন, খুব বেশিদিনের কথা নয়, মাত্র ১৮৫৬ সালের ঘটনা। বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ দিয়েছেন। সমাজ কি আর করতে পারে? হরদেব ভয় পেলেন না।
অপর পক্ষও যে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসেছিল তা নয়। একশ জন লাঠিয়াল নিয়ে তারা তৈরি হলেন যাতে বর এলেই লাঠির ঘায়ে তার পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটিয়ে কনেকে তুলে নিয়ে চম্পট দেওয়া যায়। তারপর? হয়ত দ্বাদশী নীপময়ীর জন্যে এক অন্তর্জলী যাত্রী কুলীন পাত্রকেও তারা জোগাড় করে রেখেছিলেন; তবে ব্যাপারটা এতদূর গড়াতে পারেনি। খবরটা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় পুলিশপাহারা বসল বিয়েবাড়িতে। গোধূলি লগ্নে বরবেশে এলেন হেমেন্দ্রনাথ যেমন রূপ তেমনি সাজের বাহার, দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল যেন। বেনারসী জোড়ের ওপর নানারকম গয়না—গলায় মুক্তোর মালা, হীরের হার, হাতে বাল, আঙুলে নানারকম আংটি ঝলমল করছে। বালিকা প্রফুল্লময়ীর দেখে মনে হয়েছিল বরবেশে বুঝি মহাদেব এসেছেন তার দিদিকে বিয়ে করতে।
সালঙ্কারা নীপময়ী হেমেন্দ্রকে সাতবার প্রদক্ষিণ করে পরিয়ে দিলেন বরণমালা। ব্রহ্মোপাসনা শেষ করে তারা বাসরে প্রবেশ করলেন। কৌতূহল হলে সেখানেও একটু উঁকি মেরে আস। চলে; কারণ হেমেন্দ্র আমার বিবাহ পুস্তিকায় সমস্ত খুঁটিনাটি বিবরণ লিখে রেখেছেন। ব্রাহ্ম বিবাহ বলে বাসরে অব্রাহ্ম মহিলারা আসেননি। তাই হেমেন্দ্রকেও অব্রাহ্মিক পরিহাস সহ্য করতে হয়নি। শুধু তাই নয়, পাছে তারা কোন পরিহাস করেন সেই ভয়ে হেমেন্দ্র স্ত্রীশিক্ষার প্রসঙ্গ তুললেন এবং তাদের বাড়ির অনেক মেয়ে সংস্কৃত ও ইংরেজী পড়তে পারেন বলে সমবেত মহিলাদের অবাক করে দিলেন। হেমেন্দ্রর এই উক্তি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, সেকালে সব ব্রাহ্ম মহিলাই উচ্চশিক্ষিতা ছিলেন না। সাধারণত আমরা ব্রাহ্মিকা বলতেই যা বুঝি তার বাইরেও অনেকে ছিলেন। সুকুমারী ও হেমেন্দ্রর এই ধরনের ব্রাহ্ম বিবাহ দেওয়ায় মহর্ষিভবনের সামাজিক গণ্ডিটি আরো ছোট হয়ে এল। কিন্তু সেদিকে তাকাবার সময় কারুর ছিল কি?
ঠাকুরবাড়িতে তখন নতুন ভাবের স্রোত বইছে। উৎসাহ-উদ্দীপনায় দিন কাটছে খেয়ালখুশির হালকা হাওয়ায় ওড়া পাখির মতো। বাইরের শিক্ষিত সমাজেও চলছে উৎসাহ উদ্দীপনা। সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন নিয়ে আসছে ব্রাহ্ম সমাজ। কেশব সেন একদিন একদল ব্রাহ্ম মহিলাকে নিয়ে বরস নামে এক পাত্রীর বাড়িতে চায়ের নিমন্ত্রণ রাখতে গেলেন। চায়ের পেয়ালায় তুফান রোজই ওঠে। হেমেন্দ্রও এই ফাঁকে একটা কাজ করলেন। তিনি স্ত্রীকে লেখাপড়া শেখানোর সঙ্গে সঙ্গে গান শেখাবার ব্যবস্থা করে দিলেন।
এমন দুর্জয় সাহসের কথা তখন কেউ ভাবত না কারণ ভদ্রঘরের বাঙালী মেয়েরা মোটেই গান শিখতেন না। কবে থেকে এ ব্যবস্থা চালু হল বলা মুস্কিল, হয়ত ঔরঙ্গজেবের সময় থেকেই গানের চর্চা বন্ধ হয়েছিল। বাংলাদেশে গান শিখতেন পুরুষেরা, গান শিখত বাঈজীরাও। নটীর নূপুর নিক্কণে আর বাঈজীর কোকিল কণ্ঠের কাছে বাবুরা নিজেদের সর্বস্ব বিকিয়ে দিলেও সমাজের দিক থেকে ভদ্রঘরের মেয়েদের নাচগান শেখানো ছিল বড় নিন্দনীয়, গহিত ব্যাপার। মেয়েরা গান শোনার শখ মেটাত বৈষ্ণবীদের গান শুনে। তবে বাড়ির মধ্যে নিজের মনে তারা গুনগুন করতেন না এ কথা মোটেই বিশ্বাস্য নয় কারণ স্বর্ণকুমারী আর কাদম্বরী দুজনেই গান জানতেন। তবে ওস্তাদী হিন্দুস্থানী গান সঙ্গীতজ্ঞের কাছে শেখেননি।
হেমেন্দ্রনাথ এ বাধা না মেনে স্ত্রীকে গান শেখাবার জন্যে মহর্ষির কাছে অনুমতি চাইলেন। মহর্ষির রক্ষণশীল মন প্রথমটায় বুঝি সায় দিতে চায়নি। কিন্তু যা সত্যিই মন্দ নয় তাকে তিনি বাধা দেবেন কেন? পিতার অনুমতি পেয়ে হেমেন্দ্র বাড়ির গয়ক বিষ্ণু চক্রবর্তীর কাছে নীপময়ীর গান শেখার ব্যবস্থা করে দিলেন।
তারপর?
তারপর কি হল? যিনি একটা বড়সড় সংবাদ হয়ে উঠতে পারতেন, যাকে নিয়ে সমাজপতিরা আর একবার হাঁ হাঁ করে সমাজকে রসাতলে পাঠাতে পারতেন, পড়শিনীরা আর একবার গালে হাত দিয়ে ভাববার সুযোগ পেতেন, তাঁকে নিয়ে একটা গুঞ্জন পর্যন্ত উঠল না। কেন? মেজবৌ জ্ঞানদানন্দিনীর মতো নীপময়ী বাইরে ছড়িয়ে পড়েননি বলে? বিচিত্র মানুষের মন! দুই ভাইয়ের একজন স্ত্রীকে ভারতীয় নারীর আদর্শ করে তুলতে বিলেত পাঠান, আরেকজন স্ত্রীকে সর্ববিদ্যায় পারদর্শিনী করে তোলেন নীরবে নিভৃতে। জ্ঞানদানন্দিনী যদি নারী জাতির আদর্শ হন নীপময়ীও তো তাই। তবু দুজনের মধ্যে কত প্রভেদ।
নীপময়ী সম্বন্ধে আমাদের কৌতূহল শেষ পর্যন্ত থেকেই যায়। এগারোটি সুযোগ্য-সার্থক সন্তানের জননী নীপময়ী গান জানতেন, ছবি আঁকতেন, নানা ভাষার বই পড়তেন, দেশী বিলিতি রান্না করতেন। আমরা জানি, নতুন বৌ এলে তাকে ঠাকুরবাড়ির আদব-কায়দা শেখাবার ভার পড়ত নীপময়ীর ওপরে। মহর্ষির নির্দেশে ফুলতলির ভবতারিণীকেও গড়ে পিটে মৃণালিনী করে তুলেছিলেন আর কেউ নয়, এই নীপময়ী। অথচ কোনদিন তাকে নিজের কথা বলতে শোনা গেল না। বোঝা গেল না, সর্বগুণান্বিতা নীপময়ী জীবনকে কি ভাবে গ্রহণ করেছিলেন। একথা সত্যি, তিনি বহির্জগতে কোন প্রভাব বিস্তার করেননি। অন্যান্য সম্রান্ত পরিবারের শিক্ষিত বন্ধুর মতোই তার জীবন কেটেছে।
