বঙ্কিমচন্দ্রের মতো স্বর্ণকুমারীও একসঙ্গে সৃষ্টি ও সংস্কারের কাজে হাত দিয়ে উপন্যাসের রম্যজগৎ ছেড়ে নেমে এসেছিলেন প্রবন্ধ লেখার দুরূহ কাজে। তাই, পৃথিবীর মতো কষ্টসাধ্য প্রবন্ধ লেখার পেছনেও তার আন্তরিকতাটুকু চোখে পড়ে। এমন বিষয় নিয়ে, এই রকেট নিয়ে গ্রহান্তরে ছুটে যাবার যুগেও, মেয়েরা বড় একটা প্রবন্ধ লেখেন না। হয়ত মহাবিশ্বলোকে ইশারায় কেঁপে ওঠে তাদের অন্তর। অথচ স্বর্ণকুমারী বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ লেখার কাজে হাত দিয়েছিলেন বঙ্কিমের বিজ্ঞানরহস্য প্রকাশের মাত্র সাত বছর পরে, রামেন্দ্রসুন্দর তখনও সাহিত্যের আসরে নামেননি। এমন সময় স্বর্ণকুমারী বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ভূবিজ্ঞানীদের মতামত সংকলন করে সাতটি প্রবন্ধ লিখে বাঙালী মেয়েদের মধ্যে বিজ্ঞানালোচনার সূত্রপাত করেন। এসময় স্কুল বুক সোসাইটির উদ্যোগে স্কুলপাঠ্য ভূগোল ও বিজ্ঞানের নানারকম বই বেরিয়েছে। কিন্তু স্বর্ণকুমারী প্রবন্ধগুলি লেখেন নবজাগ্রত বাঙালী-মানসে পৃথিবী সংক্রান্ত যাবতীয় প্রশ্নের যথাসম্ভব ভাল উত্তর দেবার জন্যে।
বাংলায় বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লেখবার সময় স্বর্ণকুমারী একটা কঠিন বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন সেটি হল বাংলা পরিভাষার অভাব। পারিভাষিক শব্দের অভাবে বাংলায় লাপলা, হারসেল, টমস, নর্মাণ, লাকিয়ার, গডফ্রে, ব্যালফোর, ফিগুয়ে প্রভৃতি ভূবিজ্ঞানীর মতামত প্রকাশ করতে গিয়ে স্বর্ণকুমারী প্রথম বেশ বিপদে পড়েছিলেন। তাই নিজেই কিছু পরিভাষা সৃষ্টি করেন। তার তৈরি করা পরিভাষার সংখ্যা কম নয়, তবে তার ঝোঁক ছিল সহজ ও সুশ্রাব্য শব্দের দিকে। যেমন :
ফার্ণ=পর্ণীতরু
পেনামব্রা=উপচ্ছায়া
সেন্সিটিভ = মোহিষ্ণু
সোলর স্পট =সূর্যবিম্ব
পিগমি = বালখিল্য
ট্রায়াসিক = ত্রিস্তর
য়ুনিভার্স= বিশ্বাকাশ
হিপনোটিস্ম্ =স্বাপ্নিকতা
ডিডাসন = অবরোহ
এইজাতীয় পরিভাষা সুনির্বাচিত শব্দচয়নে স্বর্ণকুমারীর কৃতিত্বের পরিচয় দেয়।
সাহিত্যচর্চা ও সমাজসেবার সঙ্গে সঙ্গে স্বর্ণকুমারী যোগ দিয়েছিলেন কংগ্রেস অধিবেশনে। তার স্বামী জানকীনাথ ছিলেন ভারতীয় কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় কর্মক্ষেত্র ছিল ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস। কংগ্রেসের জন্ম থেকে আরম্ভ করে অনেকগুলো বছর তিনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনিই হয়েছিলেন কংগ্রেসের জেনারেল সেক্রেটারি। স্বামীর সঙ্গে স্বদেশপ্রেমে দীক্ষা নিয়েছিলেন স্বর্ণকুমারী। তিনি কংগ্রেসের পঞ্চম ও ষষ্ঠ অধিবেশনে যোগদান করেন। ঐ অধিবেশনে আরেকজন মহিলাও যোগ দিয়েছিলেন, তিনি প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে তারও কোন যোগ ছিল না তবে তৎকালীন নারী সমাজে তিনি রীতিমতো আলোড়ন জাগিয়েছিলেন। কাদম্বিনী যেখানে যেতেন, সেখানেই ভিড় জমে যেত তাকে দেখবার জন্য। স্বর্ণকুমারীর স্বদেশ চিন্তা তাঁর শেষ জীবনে লেখা উপন্যাসত্রয়ীতে যেমন প্রতিফলিত হয়েছে তেমনি প্রতিফলিত হয়েছে তার ছোট মেয়ে সরলার জীবনে। এমনকি তিনি ভেবেছিলেন সরলার বিয়ে দেবেন না, তাকে স্বদেশসেবায় উৎসর্গ করবেন। বিদেশের বিশেষত ইংলণ্ডে মেয়েদের স্বাধীনতা, আত্মনির্ভরতা এমনকি রাজনৈতিক কার্যকলাপে অংশগ্রহণ সব কিছুই স্বর্ণকুমারীর ভাল লাগত। তিনি জানতেন পুরুষেরা এজন্য বিরক্তি প্রকাশ করে, ঠাট্টা তামাসা করে কিন্তু তাদের সম্মানের চক্ষেই দেখে, তাদের হাতেই কলের পুতুলের মতো নাচে। ভারতের মেয়েরা কি এভাবে এগিয়ে আসবে না। যদিও স্বর্ণকুমারীর সাহিত্যকৃতি কোন পুরস্কারের মুখাপেক্ষী ছিল না তবু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান জগত্তারিণী স্বর্ণপদক দেওয়া হয়। এই পদকের প্রথম প্রাপক স্বর্ণকুমারীর ছোট ভাই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। যতদূর জানি তিনিই প্রথম নারী, যিনি এই স্বর্ণপদক লাভ করলেন। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে স্বর্ণকুমারীর উজ্জ্বলতাই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।
০৪. স্বর্ণকুমারী ও জ্ঞানদানন্দিনীর শিক্ষার গোড়াপত্তন
যেখানে স্বর্ণকুমারী ও জ্ঞানদানন্দিনীর শিক্ষার গোড়াপত্তন হয়েছিল সেই ঠাকুরবাড়ির ঘরোয়া স্কুলটিতে আবার ফিরে যাওয়া যাক। এই ঘরোয়া স্কুলে কেউ স্পেশাল ক্লাস যদি করে থাকেন তবে তিনি নীপময়ী। প্রবল বিদ্যানুরাগী হেমেন্দ্রনাথ স্ত্রীকে সর্ববিদ্যায় পারদর্শিনী করে তুলতে চেয়েছিলেন। তার সে সাধ পূর্ণ করেছিলেন তার মেয়েরা। নীপময়ীই কি অপূর্ণ রেখেছিলেন স্বামীর মনোবাসনা? জ্ঞানদানন্দিনীর মতো নীপময়ী কোন হৈচৈ তোলেননি সত্যি, তবু এই বিরাট বাড়িটির অন্দরমহলে নারী জাগরণের কি রকম প্রস্তুতি চলেছিল, কি ভাবে তাদের স্বামীরা তাদের গ্রহণ করতেন জানবার জন্যেই পেছন ফিরে তাকানো যেতে পারে।
নীপময়ী দেবেন্দ্রনাথের প্রিয় বন্ধু হরদেব চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে। তার ছোট বোন প্রফুল্লময়ীও ঠাকুরবাড়ির বৌ হয়েছিলেন। হরদেব বন্ধুর অনুরোধে সৌদামিনীর সঙ্গে তাঁর নিজের দুই মেয়েকেও বেথুনে পাঠিয়েছিলেন। অবশ্য যারা বেগুনে পড়তে গিয়েছিলেন, তারা নীপময়ী-প্রফুল্লময়ী নন, তাদের দিদি অন্নদা ও সৌদামিনী। মহর্ষি এবং হরদেব দুই বন্ধু হলেও তাদের মধ্যে সামাজিক অবস্থার দুস্তর প্রভেদ ছিল। তাই নীপময়ীর বিয়ে নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়নি। খুব গণ্ডগোল দেখা দিয়েছিল।
