সখিসমিতির কথা আগেই বলেছি। স্বর্ণকুমারী অন্যান্য লেখিকাদের সব সময়েই উৎসাহ যোগাতেন। সেযুগে লেখিকার প্রায়ই ছিলেন একে অপরের সখি বা সই। পুরুষের ক্ষেত্রে হয়ত প্রতিযোগিতা ছিল কিন্তু মেয়েরা ছিলেন মেয়েলি ঈর্ষার ঊর্ধ্বে। একজন লেখিকাকে কোন সময়েই অপর লেখিকার কঠোর সমালোচনা করতে দেখা যায়নি। স্বর্ণকুমারীর অনেক সখি—শরৎকুমারী তার বিহঙ্গিনী সই, মহিলা কবি গিরীন্দ্রমোহিনী তার মিলন-বিরহ সই—এরকম আরো অনেক সখি ছিল। সখিসমিতির উদ্যোগেই সর্বপ্রথম শিল্পমেলা হয়। স্বর্ণকুমারী চেয়েছিলেন মেয়েদের হাতের কাজকে শিল্পের মূল্য দিয়ে সকলের চোখের সামনে তুলে ধরতে। এতদিন হাতের কাজ শুধু ঘরের শোভা বাড়িয়েছে, সমাজে কৌলিন্য পায়নি। শিল্পীও পায়নি প্রাপ্য সম্মান। শিল্পমেলায় সেই সুযোগ এল। বেথুন কলেজ-প্রাঙ্গণে বসল মেলা। রবীন্দ্রনাথ লিখে দিলেন অভিনয়োপযোগী একটা নাটক মায়ার খেলা। মেয়েরাই অভিনয় করলেন তাতে; দর্শকও শুধুই মেয়েরা। তাঁদের সেই উৎসাহ-আনন্দ-উদ্দীপনার বুঝি তুলনা হয় না। অভিনয় ঠাকুরবাড়ির মেয়েরাই করলেন, বাইরের দু-একজনও হয়ত ছিল। কিন্তু হাতের কাজের পুরস্কার পাবার সময় দেখা গেল ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের হারিয়ে দিয়ে প্রথম পাঁচটি পুরস্কারই পেলেন ভিন্ন পরিবারের মেয়েরা। প্রথম বছর (১২৯৫) যারা শ্রেষ্ঠ পুরস্কার পেয়েছিলেন তাঁদের নাম ও শিল্পকর্মের বিবরণ পাওয়া গেছে। যেমন,
প্রথম পুরস্কার—মিস মানুক রঞ্জিতের বেলসেতুর ছবি
দ্বিতীয় পুরস্কার-শ্ৰীমতী ভুবনমোহিনী দাসী ক্ষীরের ফুলশয্যা ও খোদিত প্রস্তরছাপ
তৃতীয় পুরস্কার—শ্ৰীমতী গিরীন্দ্রমোহিনী দাসী মাটির গ্রাম্যছবি ও কার্পেটে দেবী চৌধুরানী
চতুর্থ পুরস্কার—মিস সরকার সুতার সুক্ষ্ম কারুকার্য
পঞ্চম পুরস্কার—শ্ৰীমতী বসন্তকুমারী দাস জরীর কাজ
এঁদের মধ্যে তৃতীয় পুরস্কার পান কবি গিরীন্দ্রমোহিনী। পঞ্চম পুরস্কারপ্রাপ্ত বসন্তকুমারী সখিসমিতির কত্রীসভার একজন। অন্যান্য কত্রীরা হলেন, স্বর্ণলতা ঘোষ, বরদাসুন্দরী ঘোষ, ললিতা রায়, সরলা রায়, মনোমোহিনী দত্ত, থাকমণি। মল্লিক, সৌদামিনী গুপ্তা, প্রসন্নতারা গুপ্তা, হিরন্ময়ী দেবী, সৌদামিনী দেবী, চন্দ্রমুখী বসু, মৃণালিনী দেবী, বিধুমুখী রায়, প্রসন্নময়ী দেবী, সুরবালা দেবী, গিরীন্দ্রমোহিনী দেবী ও স্বয়ং স্বর্ণকুমারী।
সখি গিরীন্দ্রমোহিনীর মতো স্বর্ণকুমারীও কবিতা লিখতেন, গান লিখতেন আর লিখতেন গাথা। আজকাল গাথা লেখার দিন শেষ হয়ে গেছে কিন্তু উনিশ শতকে একটা কাহিনী নিয়ে কবিতা লেখাকে বলা হত গাথা। শরৎকুমারীর স্বামী অক্ষয় চৌধুরী গাথা রচনার সূত্রপাত করলে রবীন্দ্রনাথ, স্বর্ণকুমারী ও আরো অনেকে গাথা লেখায় মন দিয়েছিলেন। স্বর্ণকুমারীর গাথা পড়ে দু-একটা পত্রিকা বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। কিন্তু আজকের দিনে সে সব রচনা মোটেই সাড়া জাগাতে পারে না এমন কি তার সুন্দর গানগুলোও না। তবে এখনও যে স্বর্ণকুমারী কয়েকটা ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে আছেন তার প্রথমটি হল পত্রিকা সম্পাদনা ও দ্বিতীয়টি হচ্ছে বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ রচনা। আজও কোন লেখিকা কোন নীরস তথ্যভারাক্রান্ত বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখতে রাজী হবেন কিনা সন্দেহ। এই দুটি ক্ষেত্রে স্বর্ণকুমারী যেন পুরুষোচিত বলিষ্ঠতার পরিচয় দিয়েছেন।
বাংলায় মহিলা পরিচালিত সাময়িকপত্রের সংখ্যা কম নয়! ১৮৭৫ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে অন্ততঃ ২৬ জন সম্পাদিকার আবির্ভাব হয়েছিল। বলাবাহুল্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন স্বর্ণকুমারী। ঠাকুরবাড়ির আরো অনেক মেয়ে এবং বৌ পত্র-পত্রিকা সম্পাদনার কাজে এগিয়ে এসেছেন, তবে সে অনেক পরে। জ্ঞানদানন্দিনীর কথা আগেই বলেছি। তিনি ছাড়াও ইন্দিরা, হিরণায়ী, সরল, প্রতিভা, প্রজ্ঞা, হেমলতা ও আরো অনেকে সম্পাদিকা হিসেবে কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।
১৮৭৫ সালের জুলাই মাসে থাকমণি দাসীর সম্পাদনায় প্রথম মহিলা। পরিচালিত পত্রিকা প্রকাশিত হয়। তবে থাকমণি বোধহয় ছিলেন নামে মাত্র সম্পাদিকা। তাঁর বাবা এই পত্রিকা বার করেছিলেন। এর বছর দুই পরে ঠাকুরবাড়ি থেকে প্রকাশিত হয় ভারতী। সাত বছর পরে, কাদম্বরীর আকস্মিক মৃত্যুর পর স্বর্ণকুমারী এই পত্রিকার পরিচালনভার গ্রহণ করেন। তিনি যে একজন ভাল সম্পাদিকা একথা হয়ত জানাই যেত না, যদি না কাদম্বরীর আকস্মিক মৃত্যু ঘটত। শরৎকুমারীর ভাষায় এই দুর্দিনে তিনি নারীর পালন শক্তির পরিচয় দিলেন। শুধু কি তাই? এই ভারতীর জন্যেই স্বর্ণকুমারীকে লিখতে হল নতুন নতুন প্রবন্ধ, নাটক, প্রহসন কত কী!
মহিলা নাট্যকারের কথা বলেছি। কিন্তু তারা যে কোনদিন প্রহসন লিখবেন সেটা অনেকেই আশা করেনি। স্বর্ণকুমারী অনেকগুলো নাটক ছাড়া লিখেছেন দুটি প্রহসন। কারুণিক প্যাটার্নের গল্প-উপন্যাস লিখতে লিখতে তিনি যে হাসাতেও পারেন তারই দুটি সার্থক উদাহরণ হয়ে দাঁড়াল পাকচক্র আর কনেবদল। এছাড়া তিনি লিখেছেন অনেকগুলো শারাড! শারাড কথাটা শুনতে যত অপরিচিত লাগছে আসলে তা নয়। খানিকটা রঙ্গকৌতুক পরিবেশনই এর লক্ষ্য। অভিনয়ের মধ্যে থেকে দর্শককে হেঁয়ালিটি বার করতে হয়। যেমন ধরা যাক পাহাড় কথাটি। একজন সাজলেন বোগী, তার পায়ের হাড় ভেঙেছে। ডাক্তার এসে তার পা টিপে টাপে দেখলে; দর্শক বুঝল এর মধ্যে পাহাড় কথাটি লুকিয়ে আছে। স্বর্ণকুমারীর বৈজ্ঞানিক বর ও লজ্জাশীলা শারাড হিসেবে অতুলনীয়। প্রথম মহিলা শিশু সাহিত্যিক হিসেবেও স্বর্ণকুমারী স্মরণীয়। তার গল্পস্বল্পে (১৮৮৯) ছোটদের মনের কথা সুন্দরভাবে ধরা পড়েছে।
