উনিশ শতকে ইংরেজীতে নভেল লেখার একটা রেওয়াজ ছিল। সে সময় অনেকেই ইংরেজী উপন্যাস লিখতেন, কেউ কেউ নিজেদের বাংলা লেখা অনুবাদ করে নিতেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই ধরে নেওয়া যায় ইংরেজী ভাষাটা তখনকার ছেলেমেয়েদের কাছে শক্ত ছিল না। যে কোন ধনী পরিবারে ছোট বেলা থেকেই ছেলেমেয়েদের ইংরেজী পড়ানো হত। পড়ার বইও লেখা হত ইংরেজীতে। গভর্নেস বা শিক্ষয়িত্ৰী হতেন বিদেশিনী। কাজে কাজেই ইংরেজী ছিল শাসক ইংরেজের মতোই বাঙালীর কাছের জিনিস। মহিলারাও ইংরেজী ভাষায় উপন্যাস লিখতেন। এ সময় কতজন বাঙালী লেখিকা ছিলেন প্রশ্ন জাগতে পারে। ১৮৫৪ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে ১৯৪ জন লেখিকার নাম পাওয়া যায়। তাছাড়া বোধহয় আরো জন পঞ্চাশেক লেখিকা ছিলেন যারা নাম প্রকাশ করতে চাননি! সুতরাং স্বর্ণকুমারীকে একাকিনী ভাবলে ভুল করা
যাইহোক, কথা হচ্ছিল উপন্যাসের অনুবাদ নিয়ে। এ ব্যাপারে স্বর্ণকুমারী বেশ উৎসাহী ছিলেন। তাঁর দুটো উপন্যাস, চোদ্দটা গল্প ও একটা নাটক অনূদিত হয়। সবচেয়ে আগে ক্রিস্টিনা আলবার্স অনুবাদ করেন ফুলের মালা। মডার্ণ রিভিউ-এ দি ফ্যাটাল গারল্যাণ্ড নামে ছাপা হয়। ফুলের মালা উপন্যাস হিসাবে খুব সার্থক হয়নি! খুব সম্ভব সেজন্যেই রবীন্দ্রনাথের এই অনুবাদ সম্বন্ধে ভাল ধারণা ছিল না। ১৯১৩ সালে কবি যখন ইংলণ্ডে তথন স্বর্ণকুমারী তাঁর কাছে এই বইটি পাঠান, হয়তো বিদেশের বাজারে একটু পরিচিত হবার জন্যেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অভিমত জানালেন।
আমি জানি এ বই প্রকাশ করবার চেষ্টা এখানে সফল হবে না। তাছাড়া তর্জমা খুব ভালো হয়েছে তা নয়—অর্থাৎ ইংরেজী রচনার উচ্চ আদর্শে পৌঁছয়নি। [ ২৮. ১. ১৯১৩ ]
তাঁর একই মন্তব্য শোনা গেছে ইন্দিরাকে লেখা চিঠিতেও। কবি তাঁকে। লিখেছেন :
নদিদি আমাকে তার ফুলের মালার তর্জমাটা পাঠিয়েছিলেন। এখানকার সাহিত্যের বাজার যদি দেখতেন তাহলে বুঝতে পারতেন এসব জিনিস এখানে কোন কোনমতেই চলতে পারে না। এরা যাকে reality বলে সে জিনিসট। থাকা চাই। [ ৬.৫, ১৯১৩]
কবির পক্ষে এ নিয়ে কথা বলা মুস্কিল হয়েছিল এইজন্যে যে, তাঁর কবিতা সে সময় বিদেশে যথাযোগ্য সম্মান পেয়েছে। কিন্তু তার সঙ্গে তো আর কারুর তুলনা চলতে পারে না। অথচ এ কথা বলতে গেলে ভুল বোঝার শংকা বেশি। তিনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর অনেক বাঙালী লেখকের ধারণা হয়েছিল যে তাদের গ্রন্থের অনুবাদ প্রকাশ হলে তারাও উপযুক্ত সম্মান পেতে পারেন। এই ধরনের লেখকদের কথা বলবার সময় রবীন্দ্রনাথ স্বর্ণকুমারী সম্বন্ধেও শ্রদ্ধাপোষণ করেননি। তিনি রোটেনস্টাইনকে লিখেছিলেন,
She is one of those unfortunate being who has more ambition than abilities. But just enough talent to keep her mediocrity alive for a short period. Her weakness has been taken advantage of by some unscrupulous literary agents in London and she has had stories translated and published. I have given her no encouragement but I have not been successful in making her see things in their proper light.
কবি এ চিঠিটা কবে লিখেছিলেন জানা যায়নি। মনে হয়, এ সময় স্বর্ণকুমারীর আরেকটি উপন্যাসের অনুবাদ এ্যান্ আফিনিস্ট সঙ লণ্ডনে প্রকাশিত হয়েছে। এই উপন্যাসটি কাহাকের অনুবাদ, অনুবাদিকা স্বর্ণকুমারী স্বয়ং। কোন কারণেই দমে না গিয়ে স্বর্ণকুমারী কাহাকে অনুবাদ করেছিলেন। লণ্ডন থেকেই বইটি প্রকাশিত হয় ১৯১৩ সালের ডিসেম্বরে। ১৮৭৬-এর ডিসেম্বর থেকে ১৯১৩-র ডিসেম্বর দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে স্বর্ণকুমারী এসে দাঁড়ালেন শীল রজনীর তুষার-কুয়াশাঢাকা লণ্ডনবাসী পাঠকের কাছে। তাঁরা দেখলেন, একটি বিদেশী বই, শেষ করে মনে হল অসমাপ্ত গানের কলি যেন। ঝরে পড়ল মুগ্ধ পাঠকের প্রশংসাবাণী।
Remarkable for the picture of Hindu life the story is overshadowed by the personality of the authoress, one of foremost Bengali writer to-day. (Clarion) আর একটু সোচ্চার প্রশংসা করলেন ওয়েস্ট মিনিস্টার গেজেটের সম্পাদক :
Mrs. Ghosal, as one of pioneers of the women movement in Bengal, and fortunate in her own upbring, is well qualified to give this picture of a Hindn maiden development.
রবীন্দ্রনাথ যে কেন এত আশংকা করেছিলেন বোঝা যায় না। তাঁর সমস্ত অনুমানকে অমূলক প্রমাণ করে ১৯১৪ সালে এ্যান্ আনফিনিস্ট সঙ-এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ঐ একই কোম্পানী থেকে। সুতরাং সাময়িকভাবে হলেও স্বর্ণকুমারী বিদেশীদের আকৃষ্ট করেছিলেন। কাহাকের আরো একটি অনুবাদ হয়েছিল। সেটি কলকাতা থেকে ১৯১০ সালে টু হুম নামে প্রকাশ করা হয়। টু হুমের অনুবাদিকা স্বর্ণকুমারীর ভাইঝি শোভনা। দুটো অনুবাদের মধ্যে স্বর্ণকুমারীর লেখাটিই বেশি স্বচ্ছন্দ। এছাড়াও দিব্যকমল নাটকটি অনূদিত হয় জার্মান ভাষায় প্রিন্সেস কল্যাণী নামে এবং বেশ কয়েকটি ছোট গল্প শর্ট স্টোরিজ নামে ইংরেজীতে। সুতরাং স্বদেশে-বিদেশে সর্বত্রই স্বর্ণকুমারী লেখিকার সম্মান অর্জন করেছিলেন।
আমাদের দেশে সাধারণত লেখক খ্যাতি তারাই পান যারা উপন্যাস লেখেন। স্বর্ণকুমারী সফল উপন্যাস রচয়িত্রী হলেও তিনি আরো অনেক কিছু লিখতেন। তাঁর লেখা ছোটগল্পও বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। যদিও বাংলা সার্থক ছোটগল্প প্রথম লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ। তার আগে যারা গল্প লিখেছেন তারা জানতেনও না তাদের নতুন রচনাটিকে কি নামে ডাকা হবে। তাই স্বর্ণকুমারীর লেখা গল্প কুমার ভীমসিংকে কখনও বলা হয়েছে ঐতিহাসিক উপন্যাস আবার কখনও ঐতিহাসিক নাটক। বাংলা ছোটগল্পের যখন এই রকম অবস্থা তখন স্বর্ণকুমারী বাঙালী মেয়েদের নিয়ে বেশ কয়েকটা ছোটগল্প লিখেছিলেন। মালতী, লজ্জাবতী, গহনার ভাবিনী, যমুনা প্রতিদিনের শত তুচ্ছের আড়ালে আড়ালে লুকিয়ে থাকে, হারিয়ে যায়। স্বর্ণকুমারী আঁকলেন তাদেরই লজ্জানত-দ্বিধাজড়িত মুখের ছবি। এসব ছবি তিনি সংগ্রহ করেছিলেন সমাজসেবা করতে করতে।
