উনিশ শতকে বিধবা-সমস্যা নিয়ে অনেকেই ভাবনা-চিন্তা শুরু করেছিলেন। শুধু ভাবনা-চিন্তা নয়, সক্রিয় হয়ে কাজে যোগ দিয়েছিলেন আরো অনেকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ১৮৫৬ সালের এই ডিসেম্বর প্রথম বিধবা-বিবাহ দেবার পর উৎসাহ-উদ্দীপনা অনেক বেড়ে গেল। বালবিধবা কালীমতীকে বিবাহ করেন। ঈশ্বরচন্দ্রের প্রিয়পাত্র ঐশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। এ ব্যাপারে অবশ্য ব্রাহ্ম সমাজ অসাধারণ আগ্রহ দেখিয়েছে। আদি ব্রাহ্ম সমাজে বিধবা-বিবাহের প্রবর্তন হয় অনেক পরে কিন্তু দুর্গামোহন দাস, শিবনাথ শাস্ত্রী প্রমুখ উৎসাহী ব্রাহ্ম যুবকেরা অনেক অসাধারণ দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। আমরা সত্যেন্দ্রনাথের উদার দৃষ্টি ও স্ত্রীস্বাধীনতাপ্রয়াসী মনটির কথা জানি। দুর্গামোহন দাসের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল আরো উদাত্ত, আরো বলিষ্ঠ। সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করে তিনি নিজের তরুণী বিমাতার সঙ্গে একজন বন্ধুর বিয়ে দিয়েছিলেন। তার স্ত্রী ব্ৰহ্মময়ীও ছিলেন অসাধারণ মহিলা। শিবনাথ শাস্ত্রীও কম যান না। তিনি প্রথম জীবনে পিতার আদেশে প্রথমা স্ত্রী প্রসন্নময়ী থাকা সত্ত্বেও বিবাহ করতে বাধ্য হয়েছিলেন বিরাজ মোহিনীকে। পরে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করে স্থির করেন তিনি বিরাজমোহিনীকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ না করে আবার তার নতুন করে বিয়ে দেবেন। অবশ্য বিরাজমোহিনীর প্রবল আপত্তিতে ব্যাপারটা বেশি দূর গড়াতে পায়নি। ঠাকুরবাড়ি থেকে এই ধরনের মনোভাব কোন সময়ই সমর্থন পায়নি। ১৮৭২ সালে কেশব সেন অসবর্ণ বিবাহকে যখন বৈধ ঘোষণা করে বিশেষ বিবাহনীতি (তিন আইন) চালু করলেন, তখন ঈশ্বরচন্দ্র রাজনারায়ণ বসুর মেয়ে লীলাবতী মিত্রের কাছে কয়েকজন অসহায় বিধবাকে পাঠান যাতে তিনি তাদের পুনর্বিবাহের ব্যবস্থা করতে পারেন। লীলাবতীও কম সাহসের পরিচয় দেননি। তিনি ১৮৮৩ থেকে ১৮৯০-এর মধ্যে আটটি বিধবা মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন।
স্বর্ণকুমারীও যে বিধবাদের কথা ভাবেননি তা নয়। তিনি নারীকল্যাণমূলক কাজ আরম্ভ করেছিলেন সখিসমিতির মধ্যে দিয়ে। নামটি দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। স্বর্ণকুমারী তার বান্ধবীদের নিয়ে এই সমিতি পরিচালনা করতেন! এই সমিতির প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিধবা ও কুমারী মেয়েদের লেখাপড়া শিখিয়ে অন্তঃপুরের শিক্ষয়িত্ৰী করে ভোলা। তখনও মেয়েরা বিশেষতঃ বিবাহিতারা স্কুলে পড়তে আসত না অথচ লেখাপড়া শেখার আগ্রহ বেড়ে গেছে। তাই ঘরে ঘরে শিক্ষয়িত্রীর প্রয়োজন-তাদের অভাবে শিক্ষক কিংবা বিদেশিনী মিশনারী মেম সাহেব নিয়োগ করা হত। স্বর্ণকুমারী দেখলেন বাঙালী মেয়েরা লেখাপড়া শিখলে অনায়াসেই এই কাজটি পেতে পারে। অর্থোপার্জনে স্বনির্ভর হলে অনাথ বিধবাদের জীবনযাত্রা যে সহজতর হবে তাতে সন্দেহ ছিল না। সখিসমিতি যে এ ব্যাপারে খুব সফল হয়েছিল তা নয়, তবে স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে ও মেয়েদের আত্মনির্ভর হয়ে ওঠার জন্য সখিসমিতির মতো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন ছিল। সত্যি কথা বলতে কি আজও সে প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি।
আবার ফেরা যাক স্নেহলতা প্রসঙ্গে। স্বর্ণকুমারী বিধবাদের লেখাপড়া শিখিয়ে তাদের আত্মনির্ভর করে তুলতে চাইলেও তাদের পুনর্বিবাহ দেবার চেষ্টা করেননি। তবে এভাবে বিধবা-সমস্যার সমাধান সত্যিই হয় কিনা সে নিয়েও চিন্তা করেছিলেন। সেই চিন্তার ফসল স্নেহলতা। তাই স্নেহের মৃত্যুর পরে জগৎবাবুর চিন্তার সূত্র ধরে আমরা যখন লেখিকার ভাবনার সঙ্গে পরিচিত হই তখন চমকে উঠি। জগৎবাবু এই উপন্যাসের একটি প্রধান চরিত্র। স্নেহের মৃত্যুর পর তার মনে হয়েছিল, স্নেহকে লেখাপড়া না শিখাইলে সে বেশ সন্তুষ্ট চিত্তে আপনার অদৃষ্ট বহন করিতে পারি, আপনার অধঃপতন। মৃত্যু আপনি ডাকিয়া আনিত না। এ কথা লেখিকারও কথা। যুক্তি যদি ভেতর থেকে মনকে নাড়া দেয় তাহলে উপেক্ষিত জীবনের বঞ্চনা ও ক্ষোভকে অদৃষ্ট বলে মেনে নেবার অপরিসীম শক্তির ভিত আসে দুর্বল হয়ে। নারী হয়ে স্বর্ণকুমারী এই সত্যকে অস্বীকার করতে পারেননি। তাই বিধবাদের আত্মনির্ভরতা এবং অর্থোপার্জনের পথ দেখিয়ে দিলেই যে সব হল না সেটা তিনি জানতেন। হিরন্ময়ী বিধবা শিল্পাশ্রমের জন্যে লেখা নিবেদিতা নাটকেও তিনি এই সমস্যার আরেকটি কুৎসিত রূপ ফুটিয়ে তুলেছেন। তবে কোথাও তিনি সমাধানের পথ দেখাতে পারেননি এমনকি সে চেষ্টাও করেননি। তবু মনে হয় তিনি বিধবা মেয়েদের সমাজের মধ্যে সসম্মানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। সম্মানের পরিবর্তে শুধু অন্নের সংস্থান, অর্থোপার্জন, শিক্ষা এমন কি পুনর্বিবাহও তার মতে, কোন নারীকে পূর্ণ করে তুলতে পারে না। স্বর্ণকুমারীর সমসাময়িক আরো কয়েকজন লেখিকা সামাজিক উপন্যাস লিখে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এঁদের একজনের নাম কুসুম কুমারী দেবী ও অপরজন শরৎকুমারী চৌধুরাণী। কুসুমকুমারীর স্নেহলতা, প্রেমলতা ও শান্তিলত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশংসা লাভ করেছে। শরৎকুমারীকে সার্টিফিকেট দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ।
স্বর্ণকুমারীর অপর জনপ্রিয় উপন্যাসটির নাম কাহাকে। এখানে স্বর্ণকুমারী সমস্ত পুরুষালি ঢং বিসর্জন দিয়ে শুধু একটি মেয়ের ভালবাসার কথা শুনিয়েছেন। স্বর্ণকুমারীর লেখায় যারা নারীসুলভ রমণীয়তা পাননি কাহাকে তাদের সন্তুষ্ট করেছে। অন্য কোন সমস্যা এখানে নেই, আছে শুধু একটি আধুনিকার আত্মকথন। শিক্ষিত আধুনিক নায়িকা নিজেকে বিশ্লেষণ করে ভালবাসার স্বরূপ সন্ধান করেছে। নারীসুলভ স্বাভাবিক লজ্জা ও সংস্কারকে বর্জন করে স্বর্ণকুমারী যেভাবে নারীমনকে বিশ্লেষণ করেছেন তার তুলনা এ যুগেও খুব বেশি মেলে না। সাধারণ জীবনের দৈনন্দিন বাস্তবতার সঙ্গে হয়ত তার পরিচয় কিছু কম ছিল কিন্তু মনোবিশ্লেষণ দিয়ে তিনি সেই অভাবকে পূর্ণ করে দিয়েছেন। অনেকেই কাহাকে উপন্যাসে লেখিকার নিজস্ব পরিবেশ অর্থাৎ তৎকালীন শিক্ষিত ও সম্ভান্ত পরিবারের পরিবেশ খুঁজে পেয়েছেন। লেখিকার নিজের পরিবেশ বলেই কাহাকে এত জীবন্ত এ ধারণাও করা হয়। স্বর্ণকুমারীর নিজের জীবনের সঙ্গে নায়িকার সাদৃশ্য না থাকলে এ পরিবেশে তিনি যে খুব স্বচ্ছন্দ সে কথা অস্বীকার করে লাভ নেই। কাহাকে শুধু বাঙালী পাঠকদের ভাল লেগেছিল তা নয়, বিদেশীদেরও মন ছুয়েছিল।
