ঠাকুরবাড়িতে নিম্নমানের নাচ-গান হত না বটে তবে রসের ভোজে কেউ কোনদিন বাদ পড়তেন না কারণ রসস্রষ্টা ছিলেন তারা নিজেরাই। বাড়ির যে কোন আনন্দ-উৎসবের সময় নানারকম অনুষ্ঠান হত। এর উদ্যোক্তা ছিলেন স্বয়ং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। বছর দশেক আগেকার জোড়াসাঁকো থিয়েটারের উদ্যোক্তা ছিলেন গণেন্দ্র, গুণেন্দ্র, সারদাপ্রসাদ ও জ্যোতিরিন্দ্র। এখন সে থিয়েটারের পাট চুকে গেছে কিন্তু বদলায়নি নাট্যামোদীর মন। তাই আবার নতুন করে নাটক জমিয়ে তুললেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। পুরনো থিয়েটারি মজলিশ বাড়িতে ঢুকতে পেলে না বটে তবু নাটক জমে উঠল। জোড়াসাঁকো থিয়েটারের সেই কুশলী অভিনেতা জ্যোতিরিন্দ্র, যিনি নটীর ভূমিকায় অভিনয় করে সবার মন। ভুলিয়ে ছিলেন, তিনিই আসর সাজালেন। পুরনো কুশীলবরা নেই, কেউ বা পরলোকে। এবার নতুন করে যোগ দিলেন বাড়ির মেয়েরা। যদিও ঘরোয়া অনুষ্ঠান, দর্শকরাও আত্মীয় স্বজনেরা। তবু এ ঘটনায় চমকে উঠল সবাই। অভিনয়কে বাড়ির উঠোনে টেনে আনা ও সম্ভ্রান্ত ঘরের মেয়েদের মঞ্চে এসে দাঁড়ানো দুটোই ছিল অসম্ভব ব্যাপার।
স্বর্ণকুমারীর বসন্ত-উৎসবের অভিনয় হয়েছিল ঠাকুরবাড়ির ঘরোয়া আসরে। একদিন বারান্দার জমাটি আড্ডায় বসে কথা উঠল, সেকালে বসন্ত-উৎসব কেমন হত? আসর জমে উঠল তর্কে বিতর্কে। সব কাজের উদ্যোক্তা জ্যোতিরিন্দ্র প্রস্তাব করলেন, এসো না, আমরাও একদিন সেকেলে ধরনের বসন্ত-উৎসব করি। কারুর উৎসাহ তো কম নয়। দেখতে দেখতে পিচকারী আবীর কুঙ্কুম প্রভৃতি প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম এসে গেল। রঙিন আলোয় ছাদের বাগানে খুব আবীর খেলা হবে। আমোদ-প্রমোেদ বাদ যায় কেন? স্বর্ণকুমারী লিখে ফেললেন বসন্ত-উৎসব। গীতিনাটিকার সূচনা হল স্বর্ণকুমারীর হাতে। এই বিরাট আনন্দযজ্ঞে অবশ্য রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত ছিলেন না। তিনি তখন সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে বিলেতে বসে কোন এক মরা সাহেবের বিধবা গিন্নীকে বেহাগ-সুরে শোকগীত শোনাচ্ছেন।
বসন্ত-উৎসবের নায়িকা লীলা সাজলেন কাদম্বরী। আর যে সন্ন্যাসিনীর কৃপায় লীলা তার প্রেমিককে ফিরে পেল সেই সন্ন্যাসিনী সাজলেন স্বর্ণকুমারী নিজে। গেরুয়া সাজের সঙ্গে তার উদাসিনী প্রকৃতিটি সুন্দর খাপ খেয়েছিল। নায়ক হয়েছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। তবে বসন্ত-উৎসবের পরবর্তী অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথও প্রতিনায়ক হয়ে টিনের তলোয়ার ঘুরিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। এরপর কিছুদিন ধরে তিন ভাইবোনে গীতিনাট্য লেখা এবং অভিনয় চালিয়ে গেলেন নিয়মিতভাবে। পরে স্বর্ণকুমারী লেখেন বিবাহ-উৎসব।
অবিরাম ঝর্ণার মতো বয়ে চলল স্বর্ণকুমারীর লেখার স্রোত। রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিলে ঠাকুরবাড়ির আর কেউই বোধহয় এত বেশি লেখেননি। তার সাহিত্য-আলোচনার ক্ষেত্র এটি নয়। বাংলা সাহিত্যে স্বর্ণকুমারী তার যোগ্য আসন আজও পাননি। অথচ একদিকে বঙ্কিমচন্দ্র অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ এই দুটি ভিন্ন কোটির মধ্যবর্তী সেতু হিসেবে আমরা স্বর্ণকুমারীর নাম করতে পারি। ঐতিহাসিক গল্প ও উপন্যাস রচনায় টড কাহিনী অনুসরণ করেও তিনি যে মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন তার তুলনা হয় না।
স্বর্ণকুমারীর ঐতিহাসিক উপন্যাসের সংখ্যা কম নয়। দীপনির্বাণ, মিবাররাজ, বিদ্রোহ, ফুলের মাল্য, হুগলীর ইমামবাড়া—প্রত্যেকটিই জনপ্রিয় হয়েছিল। ইতিহাসের ফাঁক ভরিয়ে তোলার জন্যে তিনি মাঝে মাঝে যে কৌশল অবলম্বন করতেন তা সত্যিই প্রশংসনীয়। যেমন ধরা যাক, কুমার ভীমসিংহ গল্পের কথা। রাজসিংহের প্রথম পত্নী কমলকুমারী ও দুই রাণীর দুই পুত্র ভীমসিংহ ও জয়সিংহের কথা টড কাহিনীতে আছে। কিন্তু রাজসিংহের দ্বিতীয় স্ত্রীর কোন নাম নেই। কিন্তু স্বর্ণকুমারী যখন গল্প লিখছেন তখন বঙ্কিমের রাজসিংহ উপন্যাস লেখা হয়ে গেছে। কিষাণগড়ের চারুমতীকে বঙ্কিম রূপনগরের বীরাঙ্গনা চঞ্চলকুমারী করে তুললেন। এর পাঁচ বছর পরে গল্প লিখতে বসে স্বর্ণকুমারী অবলীলায় জয়সিংহ-জননীর নাম দিয়ে দিলেন চঞ্চলকুমারী। টডের ইতিহাস একটু ক্ষুন্ন হল বটে কিন্তু হোঁচট খেলে না পাঠকের মন। কল্পনা বাস্তবে মেশা ছায়া-ছায়া নামহারা একটা চরিত্র ব্যক্তিত্ব লাভ করল স্বর্ণকুমারীর হাতে।
ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখলেও সামাজিক গল্প-উপন্যাস লিখে স্বর্ণকুমারী নাম করেন বেশি। যদিও ঠাকুরবাড়ির বিশেষতঃ এ বাড়ির মেয়েদের সঙ্গে সাধারণ বাঙালী সমাজের ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল না বলে তাদের লেখায় বাস্তব জীবনের ছাপ বিশেষ পাওয়া যায় না, এমন একটা ধারণা বহুদিন থেকেই আমাদের মনে বাসা। বেঁধে আছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন পৃথিবীর সঙ্গে যথার্থ পরিচয়ের অভাব তাদের পঙ্গু করে রেখেছে। তিনি সম্ভবতঃ সেজন্যেই স্বর্ণকুমারীর রচনাগুলির অনুবাদ-প্রকাশে প্রবল আপত্তি জানিয়েছিলেন। পারিবারিক জীবনের ছোটবড় খুঁটিনাটি ব্যাপারের দিকে চোখ তুলে না তাকালেও স্বর্ণকুমারী বাস্তব। জীবন সম্বন্ধে উদাসীন ছিলেন না। সমাজ-সংসার সব কিছুর উর্ধ্বে যে মানুষের মন, তিনি তার নাগাল পেয়েছিলেন। তাই তার সর্বশ্রেষ্ঠ দুটি উপন্যাসই সামাজিক উপন্যাস।
প্রথমে ধরা যাক স্নেহলতার কথা। বিশ শতকের সমালোচকদের ভাষায়, বাঙালী সমাজে আধুনিকতার সমস্যা লইয়া এই প্রথম উপন্যাস লেখা হইল। আগেই বলেছি, স্বর্ণকুমারী সব বিষয়েই অতি ভাগ্যবতী, নয়ত বিধবা-সমস্যা নিয়ে এর অনেক আগে থেকেই তো লেখালেখি চলছে, স্বর্ণকুমারীর ভাগ্যে অভিনন্দন জুটবে কেন? তবে এ বিষয় নিয়ে স্বর্ণকুমারীকে ভাবতে দেখে একটু অবাক লাগে কারণ মহর্ষি স্বয়ং বিধবা বিবাহের বিরোধী ছিলেন। বিধবা স্নেহলতাও অবশ্য বিষবৃক্ষের কুন্দনন্দিনীর পন্থা অনুসরণ করেছে কিন্তু চোখের বালির বিনোদিনীই কি নতুন পথ দেখাতে পেরেছিল? যাক সে কথা, স্বর্ণকুমারী বিধবা-সমস্যাকে দেখেছেন সমাজ-সংস্কারকের দৃষ্টিতে নয়, নারীর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। নারীর প্রেম-ভালোবাসা-সংশয়-লজ্জা সংকোচ-ভয়-সংস্কার সব কিছুর মধ্য দিয়েই তিনি মেয়েদের সমস্যাকে দেখতে চেয়েছেন। বাংলা সাহিত্যে এই দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্রই বৈশিষ্ট্য এনেছিল।
