কবিতা আর দুটি উপন্যাস, লিখেছিলেন ইংরেজী ও ফরাসী ভাষায়। সে যুগে ইংরেজী ভাষায় নাটক, নভেল অনেকেই লিখতেন। বিদেশিনী শিক্ষয়িত্রীদের শিক্ষার ফলে ইংরেজী শেখার পথও হয়েছিল সরল। স্বর্ণকুমারীও তার নিজের গল্প ও উপন্যাসের অনুবাদ করেছেন, তবে সে অনেক পরে।
মাঝে মাঝে স্বর্ণকুমারীকে অসাধারণ সৌভাগ্যবতী বলে মনে হয়। পথের কাঁটাও বুঝি তার পায়ের তলায় ফুল হয়ে ফুটেছে। নতুন কিছু করার জন্যে জ্ঞানদানন্দিনীকে যত ঝড়ঝাপ্টা সইতে হয়েছিল তাকে সে সব দুর্যোগ স্পর্শ করতে পারেনি। তিনি পেলেন শুধুই শ্রদ্ধা, শুধুই সম্মান, শুধুই অভিনন্দন। একেই বলে ভাগ্য! সত্যিই কি কোন বাধা ছিল না? না, স্বর্ণকুমারী কোন বাধাকে বাধা মনে করেননি। আপাতভাবে সংসারে উদাসীন হওয়ার জন্য স্বর্ণকুমারী সবসময় এক নিরাসক্ত দূরত্বের মধ্যে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। বাকিটুকু ঘিরে রেখেছিল জানকীনাথ ঘোষালের ভালবাসা। স্ত্রীকে তিনি সমস্ত দুঃখ-বিপদের হাত থেকে সরিয়ে চেষ্টা করেছেন সাহিত্যক্ষেত্রে সার্থক করে তুলতে। স্বর্ণকুমারীর সাহিত্যিক খ্যাতি চিড় ধরায়নি তাদের দাম্পত্য জীবনে।
স্বর্ণকুমারী যখন নিজেকে লেখিকা হিসাবে তৈরী করে নিচ্ছেন তখন অন্যান্য মেয়েরা কি করছিলেন? অন্যান্য বাড়ির অন্দরমহলের খবর সংগ্রহ করা সহজ নয়। আগে ঠাকুরবাড়িটাই দেখা যাক। স্বর্ণকুমারীর দিদি-বৌদিদিরা মগ্ন থাকতেন ঘরের কাজে। সকাল থেকৈ, তাদের বসত তরকারি বানানোর আসর, সেই সঙ্গে মেয়েলি আড্ডা—এই আসরে যোগ দিতেন সৌদামিনী, শরৎকুমারী, বর্ণকুমারী, প্রফুল্লময়ী, সর্বসুন্দরী, কাদম্বরী আরো অনেকে। মহর্ষি বাড়ি ফিরলে তদারক করতে আসতেন সারদাদেবী। এছাড়া বাড়ির অন্যান্য আশ্রিতা মহিলারাও যোগ দিতেন। হাতের কাজের সঙ্গে জমে উঠত গল্প। বাড়ির ছোট ছোট মেয়েরা গল্পের টানে হাজির হত সেখানে। সরলাও প্রায়ই যেতেন কিন্তু নিজের মাকে কোনদিন সে আসরে যেতে দেখেননি।
শরৎকুমারী ভালবাসতেন রূপচর্চা করতে। সবচেয়ে বেশি সময় নিয়ে রূপটান মেখে চৌবাচ্চার জলে সাঁতার কেটে তিনি অনেকটা সময় কাটিয়ে দিতেন। তার স্বামী যদুনাথ (যদুকমল) মুখোপাধ্যায় ছিলেন সুরসিক ব্যক্তি। শোনা যায়, অনেকেরই কৌতূহল ছিল ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের রূপ রঙ নিয়ে। একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন যদুনাথকে। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন দুধে আর মদে। কেউ কেউ মনে করতেন ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের এই দুটি পদার্থ দিয়ে স্নান করানো হত জন্মাবার পরই। যদুনাথের রহস্যপ্রিয়তার এই ছোট্ট ছবিটি উপহার দিয়েছেন সত্যেন্দ্র-দুহিতা ইন্দিরা, তার অপ্রকাশিত গ্রন্থ শ্রুতি ও স্মৃতিতে। ঠাকুরবাড়িতে মেয়েরা রন্ধনচর্চাও করতো, শরৎকুমারী ছিলেন রন্ধন-পটিয়সী। অন্যান্য বাড়ির মেয়েরাও যে অন্যভাবে জীবন কাঁটাতেন তা নয়। বিনয়িনীর অপ্রকাশিত আত্মকথা কাহিনী পড়ে জানা যায় তাদের বাড়িতে অর্থাৎ অবন-গগন ঠাকুর পরিবাবের মেয়েদের অনেক সময় কেটে যেত ঠাকুরঘরে। অন্যান্য বাড়িতেও অধিকাংশ মেয়ে এমনি ভাবেই সময় কাঁটাতেন। এছাড়া কেউ দিতেন পুতুলের বিয়ে, কেউ খেলতেন তাস-পাশা কিংবা দশ-পঁচিশ। স্বর্ণকুমারী এভাবে জীবন কাঁটাননি : নিজেকে অন্য সব দিক থেকে সরিয়ে এনে তিনি অনেক অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।
দীপনির্বাণ উপন্যাসের পরে প্রকাশিত হল বসন্ত-উৎসব, প্রায় একই সঙ্গে আত্মপ্রকাশ করল ছিন্নমুকুল! এবার যশের মুকুট তার মাথায় পরিয়ে দিলেন পাঠকসমাজ। ইদানীংকালে হয়ত অনেকেই ভুলে গেছেন যে, বাংলায় অপেরাধর্মী গীতিনাটিকা লেখার ব্যাপারেও স্বর্ণকুমারী পথিকৃতের গৌরব দাবি করতে পারেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের বাল্মীকি-প্রতিভ এমনকি জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মানময়ীরও আগে রচনা করেন বসন্ত-উৎসব। লেখার সঙ্গে সঙ্গে অভিনয়। ঠাকুরবাড়িতে তখন সুবর্ণ যুগ চলছে। বাড়িতে রয়েছেন স্বর্ণকুমারীর নাট্যরসিক দাদা জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও তাঁর সাহিত্যপ্রেমিকা স্ত্রী কাদম্বরী। সত্যেন্দ্র-জ্ঞানদানন্দিনী মাঝে মাঝে আসতেন ঝোড়ো হাওয়ার মতো; জীর্ণ পুরাতনকে ভাসিয়ে দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে। প্রচণ্ড উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে হয়ে গেল হিন্দুমেলা। এরপর ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েরা মেতে উঠলেন একটা নতুন পত্রিকা প্রকাশের জন্যে। পাঁচ বছর আগে বেরিয়েছে বঙ্গদর্শন। ঘরে ঘরে বঙ্কিমের বঙ্গদর্শনের আদর। ওই রকম ভাল কাগজ বার করা যায় না কি? মহর্ষির বড় ছেলে দ্বিজেন্দ্র একটু প্রাচীনপন্থী, তার ইচ্ছে তত্ত্ববোধিনীকেই আরো জঁকিয়ে তোলা। নব্যপন্থী জ্যোতিরিন্দ্রের সে ইচ্ছে নয়। পুরনো জিনিষকে নতুন করা যায় না। শেষে তারই জয় হল। ভাই-বোনেরা মিলে খসড়া করেন, পরিকল্পনা হয়, রাত বাড়ে।
কি নাম দেওয়া হবে?
সুপ্রভাত?
না, কেমন যেন শোনাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোটে যে নামটি গৃহীত হল সেটি যেমন সুন্দর, তেমনি অর্থবহ।
কী নাম?
ভারতী।
প্রথম দিকে ভারতী ছিল জ্যোতিরিন্দ্র-কাদম্বরীর মানসকন্যা, পরে স্বর্ণকুমারীই ছিলেন ভারতীর প্রকৃত কর্ণধার। অবশ্য সে অনেক পরের কথা, ১৮৮৪ সালের কথা। তার বছর সাতেক আগে ভারতীর প্রথম সম্পাদক হন দ্বিজেন্দ্রনাথ। প্রথম সংখ্যা থেকেই কিশোর রবীন্দ্রনাথ শুরু করেছিলেন মেঘনাদবধের কঠোর সমালোচনা। আবার ফিরে আসা যাক পূর্ব প্রসঙ্গে।
