আবির্ভাবই বটে। ১৮৭৬ সালে ডিসেম্বর মাস, শীতার্ত সন্ধ্যা উজ্জ্বল হয়ে উঠল এক অনামিকার শুভ আবির্ভাবে। বইয়ের নাম দীপনির্বাণ। সকলেই উলটে পালটে দেখে। সকলের মনেই নানারকম প্রশ্ন। লেখকের নামহীন বইটি নিয়ে জল্পনা চলছে। কার লেখা বই? কার লেখা হতে পারে? এরই মধ্যে কানাঘুষো শোনা গেল বইখানি একটি মেয়ের লেখা।
মৌচাকে যেন ঢিল পড়ল এবার।
একজন মেয়ের লেখা? পড়ে বিশ্বাস হয় না। ভাষায় এমন বাঁধুনি, লেখায় এমন মুন্সিয়ানার ছাপ! মেয়েলি জড়তা-সংকোচ কুণ্ঠা কোথাও কিছু নেই। এ কি কোন মেয়ের লেখা হতে পারে? সাধারণী কাগজ সমালোচনা করলে :
…শুনিয়াছি এখনি কোন সম্ভাবংশীয় মহিলার লেখা। আহলাদের কথা। স্ত্রীলোকের এরূপ পড়াশোনা, এরূপ রচনা, সহৃদয়তা, এরূপ লেখার ভঙ্গি বঙ্গদেশ বলিয়া নয় অপর সভ্যতর দেশেও অল্প দেখিতে পাওয়া যায়! প্রশংসা ঠিকই। কিন্তু তারই মধ্যে লুকিয়ে রইল সন্দেহের কাঁটা। খচখচ করে বেঁধে মহিলার লেখা।
সত্যিই কি মহিলার লেখা?
কে সেই মহিলা? কী তাঁর পরিচয়?
মহিলার নামে পুরুষের লেখাও তো হতে পারে।
স্বর্ণকুমারীর মেজদাদা সত্যেন্দ্র তখন বিদেশে; তিনি ভাবলেন এ নিশ্চয় তার ভাই জ্যোতিরিন্দ্রর লেখা। অভিনন্দন জানিয়ে চিঠি পাঠালেন, জ্যোতির জ্যোতি কি প্রচ্ছন্ন থাকিতে পারে? সত্যিই পারে না। স্বর্ণকুমারীর বর্ণালী দীপ্তিও অজানা খনির নতুন মণির আলোর মতো ছড়িয়ে পড়ল দিকে দিকে। সন্দেহের আর অবকাশ রইল না।
স্বর্ণকুমারীকে নিয়ে এত আলোড়ন উঠেছিল কেন? তিনিই কি প্রথম বাঙালী লেখিকা না প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক? ইতিহাস বলবে, এর কোনটাই ঠিক নয়। ঠাকুরবাড়ির মতো শিক্ষিত ও সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকেই প্রথম লেখিকার আবির্ভাব হওয়া অসঙ্গত নয়, অসম্ভবও ছিল না। কিন্তু দীপনির্বাণ প্রকাশের আগেই মার্থা সৌদামিনী সিংহের নারীচরিত কিংবা নবীনকালী দেবীর কামিনী কলঙ্ক লেখা হয়েছে, প্রকাশিত হয়েছে হেমাঙ্গিনী দেবীর মনোরমা কিংবা সুরঙ্গিণী দেবীর তারাচরিত। যতদূর জানি, প্রথম বাংলা কাব্য-লেখিকার নাম কৃষ্ণকামিনী দাসী। তার চিত্তবিলাসিনী ১৮৫৬ সালে প্রকাশিত হয়। ফুলমণি ও করুণার বিবরণ-কে বাদ দিলে এটিই বাঙালী মেয়ের লেখা প্রথম গ্রন্থ। এরপর প্রবন্ধ-জাতীয় রচনা প্রথম লেখেন পাবনার বামাসুন্দরী দেবী ১৮৬১ সালে। তার পুস্তিকাখানির নাম ছিল কি কি কুসংস্কার তিরোহিত হইলে এদেশের শ্রীবৃদ্ধি হইতে পারে। প্রথম মহিলা নাট্যকার কামিনীসুন্দরী দেবী উর্বশী নাটক লেখেন ১৮৫৬ সালে। অনেকের মতে প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিকের নাম শিবসুন্দরী দেবী। তার তারাবতী প্রকাশিত হয় ১৮৬৩ সালে (মতান্তরে ১৮৭৩ সালে), শিবসুন্দরী ছিলেন পাথুরেঘাটার হরকুমার ঠাকুরের স্ত্রী। তার কনিষ্ঠ পুত্র শৌরীন্দ্রমোহন তারাবতীর ইংরাজী অনুবাদ করে (১৮৮১) নিজের গানের বইয়ের সঙ্গে বিভিন্ন দেশে উপহার পাঠিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে বলে নেওয়া ভাল, পাথুরেঘাটা-ঠাকুরবাড়ির মহিলারাও কিছু কিছু সাহিত্যচর্চা করতেন। সংখ্যায় কম হলেও আমরা ঐ বাড়ির ছ-সাতজন মেয়ে ও বৌকে কবিতা কিংবা নাটক লিখতে দেখেছি। যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের ছোট মেয়ে মনোরমা লিখেছিলেন কবিতায় পিতৃদেবচরিত। এছাড়া বিরজামোহিনী ও অনিরুদ্ধ মিলন নাটক এবং গৌরগীতিকা ও মানকুঞ্জ কাব্যগ্রন্থ। ঘরে বসেই তিনি কাকার কাছে শিখেছিলেন সুরকানন বাজাতে। শৌরীন্দ্রমোহনের দুই মেয়ে শ্রীজয়ন্তী ও জয়জয়ন্তীও কিছু কিছু লিখেছেন, প্রকাশিতও হয়েছিল। জয়জয়ন্তী লিখেছিলেন জয়ন্তী দেবী নামে। তার দুখানি গ্রন্থের নাম মহামিলন ও জীবনমুক্তি। কালীকৃষ্ণ ঠাকুরের স্ত্রী সৌদামিনী লেখেন ভক্তিরসতরঙ্গিনী। প্রথম মহিলা আত্মজীবনীকার রাসসুন্দরী দেবী (১৮৭৬)। বামা রচনাবলীর প্রথম ভাগেও (১৮৭২) বেশ কয়েকজন লেখিকার সন্ধান পাওয়া যায়। তবে সেগুলির অধিকাংশই প্রবন্ধ। সমাজ সংস্কার, স্ত্রীশিক্ষা, নীতি প্রভৃতি গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে একসময় প্রবন্ধ লিখেছেন কামিনী দত্ত, স্বর্ণলতা ঘোষ, মধুমতী গঙ্গোপাধ্যায়, বিবি তাহেরণ লেছ, গোলাপমোহিনী দাসী, রমাসুন্দরী ঘোষ, ক্ষীরদা মিত্র, শ্ৰীমতী সৌদামিনী ও আরো অনেকে। এরা কেউই জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। শিবসুন্দরী প্রমুখ কয়েকজন ছাড়া অন্যরা কোন বিখ্যাত সন্ত্রান্ত পরিবার থেকেও আসেননি। তবু তাদের বিদ্যানুরাগ ও সাহিত্যপ্রতি আমাদের মুগ্ধ করে। যাক সে কথা, এই তথ্যের দিকটিকে বাদ দিলে স্বর্ণকুমারীর পূর্ববর্তিনীদের কাউকেই সাহিত্যিক হিসেবে গ্রহণ করা চলে না। পরম গৌরবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করলেও মেয়েদের সাহিত্য এতদিন ছিল শুধু হাস্যকর এবং অনুকম্পার বস্তু। অথচ বিশ্বসাহিত্যে প্রথম উপন্যাসের স্রষ্টা কোন পুরুষ নন, একজন মহিলা। তাঁর নাম মোরাকিসিকিবু (১৮৭৮-১৯৩১)। এই জাপানী মহিলাই লিখেছিলেন গেঞ্জি মনোগাতারি নামে প্রথম উপন্যাস। যাই হোক বাংলা সাহিত্যের আসরে স্বর্ণকুমারী এসে আদায় করে নিলেন প্রার্থিত সম্মান। হাসি আর করুণার বদলে দেখা দিল শ্রদ্ধামেশানো বিস্ময়! মেয়েদের চলার পথ, আত্মপ্রকাশের পথ আরো বুঝি একটু সুগম হল।
উপন্যাস ছাড়াও স্বর্ণকুমারী লিখেছিলেন গল্প, নাটক, প্রহসন, কবিতা, গাথা, গান, রম্যরচনা, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনী, গীতিনাট্য, স্মৃতিকথা, স্কুলপাঠ্য বই— একজন মহিলার পক্ষে যা প্রায় অসম্ভবের পর্যায়ে পড়ে। আশ্চর্যের কথা এই যে তিনি তার পূর্ববর্তিনীদের দ্বারা বিন্দুমাত্র প্রভাবিত হননি। তার আদর্শ লেখক ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, যদিও তার ইতিহাসনিষ্ঠা রমেশ দত্তকেই মনে করিয়ে দেয়। বঙ্কিমের মতো লেখক আদর্শ হওয়ায় স্বর্ণকুমারীর রচনায় রমণীয় লাবণ্যের কিছু অভাব ঘটেছে। অবশ্য তাতে খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। আর যেখানেই হোক। সাহিত্যে মেয়েলি ভঙ্গির আদর নেই। স্বর্ণকুমারীর অধিকাংশ রচনাই পুরুষালি টংএ লেখা। অথচ তিনি গল্প-উপন্যাস লিখতে শুরু করেন বেশ অল্প বয়সে। এই বয়সে উপন্যাস লেখার নজির অবশ্য আরো আছে। তরু দত্তের কথাই ধরা যাক না। মাত্র একুশ বছর বয়সে দুরোগ্য ব্যাধিতে তরুর মৃত্যু হয় কিন্তু সেই স্বল্প কটি দিনের মধ্যেই তিনি লিখেছিলেন অনেক গুলো মনে রাখবার মতো না।
