ছোটদের কথা এমন করে খুব কম মায়েরাই ভেবেছেন। জ্ঞানদানন্দিনীর অন্যান্য প্রবন্ধেও দেখা যাবে শিশুচিন্তার প্রাধান্ত। তার লেখা তিনটে প্রবন্ধ ভারতী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তার মধ্যে একটির নাম কিন্টার গার্ডেন। দ্বিতীয়টির নাম স্ত্রীশিক্ষা। অর্থাৎ প্রথমটি শিশুশিক্ষা ও দ্বিতীয়টিতে নারীশিক্ষার কথা বলা হয়েছে। তবে স্ত্রীশিক্ষারও মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানদানন্দিনীর মতে আদর্শ জননী হওয়া। শিশুকেন্দ্রিক রচনা ছাড়াও তার লেখা আরও দুটি রচনা আমরা পাই। একটি মারাঠী রচনার বঙ্গানুবাদ ভাউ সাহেবের খবর—তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধের পটভূমিতে লেখা কাহিনী। আর একটি হল ইংরাজনিন্দা ও স্বদেশানুরাগ নামক প্রবন্ধ।
জ্ঞানদানন্দিনী ভারতের প্রথম আই. সি. এস অফিসারের স্ত্রী, উচ্চবিত্ত ইঙ্গবঙ্গ সমাজের সঙ্গে তার হৃদ্যতা, নিজেও বিলেত ঘুরে এসেছেন। সুতরাং বিলিতি হাব-ভাব রুচি-চিন্তার সঙ্গে তার মিল হওয়াই স্বাভাবিক। অথচ জ্ঞানদানন্দিনী নিজে সাহেবিয়ানা বেশি পছন্দ করতেন না। একটি নারীর পূর্ণ আত্মবিকাশের জন্য যতখানি পশ্চিমী রীতি গ্রহণ করা উচিত তিনি ঠিক ততটুকুই নিয়েছিলেন। তাই গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে কিংবা জামা-জুতো পরে গাড়ি চড়ে বেড়াতে তার যেমন আপত্তি ছিল না তেমনি বাধা ছিল না স্বদেশের মঙ্গল চিন্তায়। তবে তিনি ভুয়ো ইংরেজনিন্দা করে সারাজীবন ইংরেজের অনুগ্রহ ভিক্ষা করে কাটিয়ে দেওয়াকে তীব্র ভাষায় ভৎসনা করে স্বদেশবাসীকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে বলেছেন। তিনি জানতেন, আমাদের জাতীয় যথার্থ স্থায়ী উন্নতি আমরা ভিন্ন কাহারও দ্বারা সাধিত হইতে পারে না।
জ্ঞানদানন্দিনীকে আমরা সব কাজেই এগিয়ে আসতে দেখেছি। এমনকি অভিনয় করার বেলায়ও তার ডাক পড়ত। সব কাজেই তার অনায়াস পটুতা। দেওরদের মাথায় পাগড়ি বেঁধে দেওয়ার জন্যে যেমন তাঁর ডাক পড়ত তেমনি সবাই তাকে খুঁজত নাটকের মহল দেবার সময়। ঠাকুরবাড়িতে নাটক-পাগল লোকের অভাব ছিল না। সেখানে কথায় কথায় থিয়েটার দেবার বা নাটকাভিনয়ের কথা শোনা যায়। মনে হয় বাঈ-নাচের পরিবর্তে এটি গৃহীত হয়েছিল। জোড়াসাঁকো থিয়েটার উঠে গেল, জোড়াসাঁকোর উঠোনের ঘরোয়া অভিনয় বন্ধ হল তবু নাট্যামোদী মানুষের মন চাপা রইল না। তাই নতুন করে যখন রাজা ও রাণী লেখা হল তখন জ্ঞানদানন্দিনীর বাড়িতেই বসল নাটকের মহলা। ভূমিকাও প্রায় ঠিকঠাক :
রাজা বিক্রম–রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাণী সুমিত্রা—জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
দেবদত্ত–সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর
নারায়ণী—মৃণালিনী দেবী
কুমার–প্রমথ চৌধুরী
ইলা—প্রিয়ম্বদা দেবী
অন্যান্য ভূমিকায় ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য ছেলেরা। অভিনয় দারুণ জমেছিল। সবাই ভাল অভিনয় করেছিলেন। লোকে কাকে ছেড়ে কাকে দেখে? সেই ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে অভিনয় দেখে গেল পাবলিক স্টেজের কয়েকজন অভিনেতা অভিনেত্রী। তারপর? সে এক দারুণ ব্যাপার। প্রত্যক্ষদর্শী অবনীন্দ্রনাথ। তিনি জানিয়েছেন, পাবলিক স্টেজে রাজা ও রাণী অভিনয় দেখার নিমন্ত্রণ পেয়ে তারা গিয়েছিলেন সেখানে। গিয়ে একেবারে তাজ্জব বনে গেলেন রাণী সুমিত্রা স্টেজে এল, একেবারে মেজ জ্যাঠাইমা। গলার সুর, অভিনয়, সাজসজ্জা, ধরনধারণ হুবহু মেজ জ্যাঠাইমাকে নকল করেছে। এমারেল্ড থিয়েটারের এই অভিনয় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল আর রাণী সুমিত্রা সেজে জ্ঞানদানন্দিনীকে নকল করেছিল যে অভিনেত্রী তার নাম গুলফম হরি। রাজার ভূমিকায় মতিলাল সুর, কুমারের ভূমিকায় মহেন্দ্রলাল বস্তু ও ইলার ভূমিকায় কুসুমকুমারীর (হাড়কাটা) অভিনয়ও ভাল হয়েছিল।
এই অভিনয়কে কেন্দ্র করে অবশ্য আরো একটা ঘটনা ঘটেছিল। ঝড় তুলেছিল বঙ্গবাসী পত্রিকা। ঠাকুর বাড়ির নতুন ঠাট নাম দিয়ে একটা প্রবন্ধ ছাপা হল, তাতে ঐ নাটকের পাত্রপাত্রীদের তালিকা এবং ব্যক্তিগত জীবনে তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের কথা স্পষ্ট করে লিখে কোন কোন নিষিদ্ধ সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী সাজা হয়েছে সেটা দেখিয়ে দেওয়া হয়। আগেই বলেছি, রাজা ও রাণীর ভূমিকায় অভিনয় করেন রবীন্দ্রনাথ ও জ্ঞানদানন্দিনী অর্থাৎ দেবর-বৌদিদি আর দেবদত্ত ও নারায়ণী সাজেন সত্যেন্দ্রনাথ ও মৃণালিনী অর্থাৎ ভাশুর-ভ্রাতৃবধু। কিন্তু এসব ছোটখাট ব্যাপারের দিকে তাকাতে হলে জ্ঞানদানন্দিনীকে অনেক আগেই থেমে যেতে হত।
নিজে লেখা ছাড়াও অপরকে উৎসাহ দিয়ে লেখানোর দিকে জ্ঞানদানন্দিনীর ঝোঁক ছিল বরাবর। ছোটদের কথা তো আগেই বলেছি। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সংস্কৃত নাট্যানুবাদের মূলেও ছিলেন তার এই মেজ বৌঠান। তার আগে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ একটিও সংস্কৃত নাটক পড়েননি। জ্ঞানদানন্দিনীর অনুরোধে তাকে শকুন্তলা পড়ে শোনাতে গিয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়ে সংস্কৃত নাটক অনুবাদে হাত দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে ও ছোটদের জন্যে লিখতে উৎসাহ দিয়েছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী। তাঁর বালকের জন্যই কবি ছোটদের লেখায় হাত দিতে বাধ্য হন। কথায় কথা বাড়ে : আমরা আর একটি কথা বলে জ্ঞানদানন্দিনীর প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে যাব। তিনি তো অনেক কাজেই উৎসাহী ছিলেন। একবার বোম্বাই থেকে ফিরে করলেন কি, একরকম জোর করেই একজন ফটোগ্রাফার ডাকিয়ে শাশুড়ী, জা, ননদ, ও বাড়ির অন্যান্য মেয়ে বৌয়েদের ফটো তুলিয়ে ফেললেন। সেদিন তার আগ্রহ আর উৎসাহ না থাকলে অনেকেই হয়ত ক্ষণকালের আভাস থেকে চিরকালের অন্ধকারে হারিয়ে যেতেন। ধারণা গড়ে নেবার মতো একটা সামান্য ছবিও আমাদের চোখের সামনে এসে পৌঁছত না। কে বলতে পারে, হয়ত রবীন্দ্রনাথের ছবি কবিতাটা লেখাই হত না কোনদিন। একাকিনী জ্ঞানদানন্দিনী এভাবেই অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিলেন বাঙালী মেয়েদের।
০৩. জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে
জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে সব কাজেই জড়িয়ে মিশিয়ে আছেন স্বর্ণকুমারী, ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক। মেয়েরা কেউ কেউ সবে যখন কিছু করবার কথা ভাবছেন তখন স্বর্ণকুমারী এসেছেন একেবারে ঝোড়ো হাওয়ার মতো। লেখাপড়ার পাঠ ভালভাবে শেষ হতে না হতেই তিনি তরতর করে লিখে ফেললেন একেবারে আস্ত একখান উপন্যাস। সবাই অবাক। তা উনিশ শতকটপ তো অবাক হবারই যুগ। কঁচা ভিতের ওপর পাকা ইমারত গড়তে দেখলে কে না বিস্মিত হয়? এই তো সেদিন, মাঝে দশটা বছর গেছে কি যায়নি, প্রথম সার্থক বাংলা উপন্যাসখানি লিখে বঙ্কিমচন্দ্র তার ঔপন্যাসিক জীবন শুরু করেছেন। এখনও সবার মনে দুর্গেশনন্দিনীর অমলিন স্মৃতি। চারপাশে শুধু নাটক-প্রহসন আর নকশার ভিড়। কখন উপন্যাস লেখায় হাত দিলেন এই অষ্টাদশী তরুণীটি? এ তো শুধু প্রথম লেখা নয়। এ যেন আবির্ভাব!
