এই বিচিত্রবেশিনীরা সাধারণ হিন্দু সমাজের চোখে ছিলেন যোগেন বসুর মডেল ভগিনীর মতো বিচিত্র জীব। জ্ঞানদানন্দিনী নিজে অবশ্য এ বিষয়ে কিছু বলেননি তবে তার দুই ননদ সৌদামিনী আর স্বর্ণকুমারীর রচনা থেকে জানা যায় তাদের পথ মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। তারা যখন সেমিজ, জামা, জুতো, মোজা পরে গাড়ি চড়ে বেড়াতে বেরোতেন তখন চারদিকে ধিক্কারের ঘূর্ণীঝড় উঠত। শুধু ধিক্কার নয়, শাড়ির সঙ্গে জ্যাকেট পরে বাইরে বেরোলে তাদের বিলক্ষণ হাস্যভাজন হতেও হত। হিন্দুদের সেলাই-করা জামা পরে কোন শুভ কাজ করতে নেই। তাই পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে আরো কিছুদিন গণ্ডগোল চলেছিল। তবে যুগ বদলেছে, তাই মুসলমানী পোশাককে তাঁরা যেমন অন্তঃপুরে ঢুকতে দেননি তেমনি করে ব্রাহ্মিকাদের পোশাককে বাধা দিতে পারলেন না। নতুন ধরনের শাড়ি পরার ঢংএর নামই হয়ে গিয়েছিল ব্রাহ্মিক। শাড়ি। তবে বিয়ে-টিয়ের সময় সনাতন নিয়মই চলত। গগনেন্দ্রনাথ ১৯০১ সালে যখন তাঁর ন বছরের মেয়ে সুনন্দিনীকে সম্প্রদান করতে যাচ্ছেন তখনও বরপক্ষের একজন আপত্তি জানিয়ে বলেন, সেলাই-করা কাপড় পরে তো মেয়ে সম্প্রদান হয় না। গগনেন্দ্র যখন গৌরীদানই করছেন তখন আর নিয়মটুকু মানতে দোষ কি? গগনেন্দ্র জানতেন সে কথা। ঠাকুরবাড়ির ছেলে হলেও তাঁর বাড়িতে সনাতন হিন্দু নিয়মই চলে আসছে। তাই তিনি স্বভাবসিদ্ধ উদারভঙ্গিতে হেসে বলেছিলেন, দেখুন মেয়ের গায়ে কোন জামা নেই। সত্যিই তো! সমবেত বরযাত্রীরা দেখলেন মেয়ের গায়ে জামা নেই বটে তবে শাড়িটা এমন কায়দায় পরানো হয়েছে যে জামা নেই বোঝাই যায়নি। শিল্পী গগনেন্দ্র নিজস্ব পরিকল্পনা দিয়ে মেয়েকে সাজিয়েছিলেন। কনে সাজাবার এই ঢংটি সবার খুব পছন্দ হয়েছিল।
বেশবাসে আধুনিকতা আনা ছাড়াও জ্ঞানদানন্দিনী আর দুটি জিনিসের প্রবর্তক—বিকেলে বেড়াতে বেরোনো আর জন্মদিন-পালন। এ দুটিই তিনি বিলেত থেকে আমদানী করেছিলেন। ছেলে ও মেয়ের জন্মদিনে বাড়ির সমস্ত ছোটরা নিমন্ত্রিত হত। আমোদ-প্রমোদে জ্ঞানদানন্দিনী চাকরবাকরদেরও বঞ্চিত করতেন না। সুরেন্দ্রের জন্য বর্ষাকালে তাই সে সময় বাড়ির সব ভৃত্যের জন্যে আসত ছাতা আর ইন্দিরার জন্ম শীতকালে তাই পরিচারকেরা পেত একখানি করে কম্বল। জ্ঞানদানন্দিনীর উৎসাহেই সরলা-হিরন্ময়ীরা প্রথম রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালন করেন সত্যেরে ৪নং পার্ক টীটের বাড়িতে। সেই উৎসবের দিন জানা গেল জ্যোতিরিন্দ্রের জন্মদিনও কাছাকাছি কোন এক তারিখে। পরের বছর থেকে জ্ঞানদানন্দিনীর উৎসাহে তারও জন্মদিন পালনের ব্যবস্থা হয়। তবে এই অনুষ্ঠানে জন্মতিথির সংখ্যা অনুসারে মোমবাতি জ্বালানো শুরু করেন স্বর্ণকুমারীর বড় মেয়ে হিরন্ময়ী।
জ্ঞানদানন্দিনীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের আরো একটু পরিচয় আছে। সত্যেন্দ্র বোম্বাই থেকে কলকাতায় ফিরে আসার পরে জ্ঞানদানন্দিনী একান্নবর্তী ঠাকুরবাড়িতে যৌথ পরিবারের একজন হয়ে থাকতে চাননি। তিনিই প্রথম জোড়াসাঁকোর বাড়ি ছেড়ে অন্য বাড়িতে উঠে যান স্বামী-পুত্র-কন্যাকে নিয়ে। বাঙালী জীবনে এর আগে এই স্বাতন্ত্র্য দেখা যায়নি। তখন মেয়ের বিয়ে হলে জামাইকেও ঘরজামাই করে রাখা হত এবং তাদের জন্যে আলাদা মহলের ব্যবস্থা হত। আমাদের আধুনিক জীবনের পারিবারিক ছকটি জ্ঞানদানন্দিনীই নিজের হাতে গড়ে দিলেন। এটি ভাল না মন্দ সে বিতর্কে না গিয়েও বলতে পারি পারিবারিক গণ্ডির ছোট সীমাকেই আমরা ভালবাসতে শুরু করেছি। তবে জোড়াসাঁকো থেকে চলে এলেও ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে জ্ঞানদানন্দিনীর যোগ কিছুমাত্র শিথিল হয়নি। পারিবারিক যে কোন কাজে তার অপরিসীম উৎসাহ ছিল। যখন যার যা প্রয়োজন নিঃসংকোচে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন মেজ বৌয়ের কাছে। কিশোর। রবীন্দ্রনাথ বিলেতে গিয়ে উঠবেন কার কাছে? না, মেজ বৌঠানের কাছে। জোড়াসাঁকোয় প্রফুল্লময়ী বুক-ভরা কান্নার বোঝা নামিয়ে হাল্কা হবেন কার কাছে? না, মেজদির কাছে। রেণুকা অসুস্থ, মাতৃহীন দুটি শিশুকে রবীন্দ্রনাথ কোথায় রেখে যাবেন? কেন, জ্ঞানদানন্দিনী তো রয়েছেন। অবনীন্দ্রকে ছবি আঁকার উৎসাহ দিলেন কে? কে আবার, জ্ঞানদানন্দিনী! প্রতিমার জন্যে আর্টের টিচার খুঁজে দেবেন কে? জ্ঞানদানন্দিনী ছাড়া আর কে আছে? সব দায়িত্ব সব ভার তাকে দিয়ে সবাই নিশ্চিন্ত।
শুধু বড়দের নয়, ছোটদের কথাও অত বড় বাড়িতে জ্ঞানদানন্দিনী ছাড়া আর কেই-বা ভেবেছেন। তাদের মধ্যে সুপ্ত প্রতিভার সন্ধান করে তাদের জাগাবার চেষ্টাও তিনি কম করেননি। বাড়ির ছোট ছেলেমেয়েদের জড়ো করে তিনি একটা পত্রিকা বার করলেন বালক নামে। সুধীন্দ্র, বলে, সরলা, প্রতিভা, ইন্দিরা অনেকেরই সাহিত্যচর্চার প্রথম হাতে-খড়ি হয় বালকে। স্বয়ং সম্পাদিকা অর্থাৎ জ্ঞানদানন্দিনী নিজে অবশ্য লিখেছিলেন একটিমাত্র রচনা। তিনি কনটেমপোরারি রিভিউ থেকে ডেবাগোরিও মোগ্রিয়েভিং-এর সাইবেরিয়া থেকে পলায়নের রোমাঞ্চকর কাহিনীটি অনুবাদ করেন আশ্চর্য পলায়ন নামে।
শুধু পত্রিকা প্রকাশ নয়, ছেলেদের ছবি আঁকায় উৎসাহ দিয়ে জ্ঞানদানন্দিনী বসিয়েছিলেন একটা লিথো প্রেস। বেশির ভাগ খরচ দিতেন তিনি নিজে। ছোটদের জন্যে তার আরো একটি দান আছে। নাতি সুবীরেন্দ্রের জন্যে দুখানি রূপকথাকে নাট্যরূপ দিয়েছিলেন তিনি। সাত ভাই চম্পা ও টাক ডুমাডুম। রূপকথাকে নাট্যরূপ দেওয়া শক্ত, বিশেষ করে দ্বিতীয়টিকে। কিন্তু শিশুমনে এর আবেদন অপরিসীম। জ্ঞানদানন্দিনী এত সুন্দর করে শিয়ালের নাক কাঁটার গল্প বলেছেন যে বহুশ্রুত গল্পটিকেও বারবার শুনতে ইচ্ছে করে, আর মনে হয়, আহা, সব রূপকথাগুলো কেন র হাতের ছোঁয়ায় নতুন হয়ে উঠল না। শিয়াল যখন বলে—ওগো না গো না-তোমার কিছু ভয় নেই—আর যদিই বা একটু আধটু কেটে যায়, তাতে আমার চেহারা খারাপ হবে না। আমার ত আর মানুষের মতো ন্যাড়া নাক নয়, কাঁটার দাগ রোঁয়ার ভিতরে দিব্যি ঢাকা থাকবে। তখন শিশুমন কল্পনার সিঁড়ি বেয়ে উধাও হয়ে যায় রূপকথার রহস্যজগতে। তাই নাকুর বদলে নরুণ পেলুম তাকডুমা ডুমডুম তাদের কাছে হয়ে ওঠে আদি কবিতা।
