এক এক সময় মনে হয় জ্ঞানদানন্দিনী বিলেত গিয়েছিলেন কেন? শুধু সত্যেন্দ্রর সেই অচরিতার্থ যৌবন স্বপ্ন সফল করবার জন্যে, না সব বিষয়ে ভারতীয় নারীর আদর্শ হয়ে ওঠার জন্যে? বেশ অবাক লাগে যখন শুনি তিনি বিলেত গিয়েছিলেন শুধু স্ত্রী-স্বাধীনতার সঙ্গে পরিচিত হতে দেশে ফিরি তিনি তার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে পেরেছিলেন। খুলে দিয়েছিলেন সম্ভাবনাময় নতুন উষার স্বর্ণদ্বার। অবশ্য এ কথার অর্থ এই নয় যে আর কেউ সে সময় কিছুমাত্র করেননি বা চালচলনে বিদেশিয়ানা নিয়ে আসেননি। রামবাগানের দত্ত পরিবারের তরু ও অরু লেখাপড়া শিখতে বিদেশে গিয়েছিলেন। গিয়েছিলেন মেরী কার্পেন্টারের অনুরোধে রাজকুমারী বন্দ্যোপাধ্যায়ও। আরো দু-চার জনকে খুঁজে পাওয়া যাবে না তা নয়, তবে তারা বাঙালী-সংস্কৃতির সঙ্গে ঠিক যেন মিশে যাননি। পুরোপুরি সাহেব হয়ে-যাওয়া পরিবারগুলোর সঙ্গে দেশের হৃদয়ের যোগ কম ছিল। তাই আন্দোলন সৃষ্টি করেছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী।
সর্বপ্রথম ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের মেয়েরা। কিছুদিন ধরেই ব্রাহ্ম সমাজ-মন্দিরে মেয়েরা যোগ দেবার অনুমতি পেয়েছেন। তাঁরা বসতেন চিকের আড়ালে স্বতন্ত্র আসনে। হঠাৎ ১৮৭২ সাল নাগাদ কয়েকজন আচার্যকে জানালেন তারা তাদের বাড়ির মেয়েদের নিয়ে পর্দার বাইরে বসতে চান। যেমন কথা তেমন কাজ। অন্নদাচরণ খাস্তগির ও দুর্গামোহন দাস তাদের স্ত্রী ও মেয়েদের নিয়ে এসে বসলেন সাধারণ উপাসকদের মধ্যে, পুরুষদের সঙ্গে। এতে অন্যান্য ব্রাহ্মদের আপত্তি ছিল না। কেশব সেন বাধ্য হয়ে পর্দা ছাড়াই মেয়েদের উপাসনা-মন্দিরে বসবার অনুমতি দিলেন। এইভাবে প্রকাশ্যে পর্দার বিরোধিতা শোনা গেল। জগদানন্দ মুখোপাধ্যায় ১৮৭৯ সালে প্রিন্স অব ওয়েলসের সঙ্গে নিজের পরিবারের মহিলাদের সাক্ষাতের অনুমতি দিলেন। সে নিয়েও কত কাণ্ড হল!
বাইরে বেরোবার জন্যে জ্ঞানদানন্দিনী বাঙালী মেয়েদের দিলেন একটি রুচিশোভন সাজ। অবশ্য দেশী ধাঁচে শাড়ি পরা যে খারাপ ছিল তা নয় তবে তাতে সৌষ্ঠব ছিল না। বোম্বাইয়ে গিয়ে তিনি প্রথমেই জবরজং ওরিয়েন্টাল ড্রেস বর্জন করে পাশী মেয়েদের শাড়ি পরার মিষ্টি ছিমছাম ধরনটি গ্রহণ করেন। নিজের পছন্দমতো একটু অদল-বদল করে জ্ঞানদানন্দিনী এই পদ্ধতিটাকেই বজায় রাখলেন। স্বর্ণকুমারীর ছোট মেয়ে সরলা দেখেছিলেন ছোটবেলায় তার মা এবং মেজমামী দেশে ফিরলেন নতুন ধাঁচের শাড়ি পরে, বাড়িশুদ্ধ সব মেয়েই সেটি গ্রহণ করতে ব্রাহ্মিকারাও তার প্রতি আকৃষ্ট হলেন।
বোম্বাই থেকে অনা বলে ঠাকুরবাড়িতে এই শাড়ি পরার ঢংয়ের নাম ছিল বোম্বাই দস্তুর কিন্তু বাংলাদেশে তার নাম হল ঠাকুরবাড়ির শাড়ি। জ্ঞানদানন্দিনী বোম্বাই থেকে ফিরে এ ধরনের শাড়ি-পরা শেখানোর জন্যে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। অনেক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মিকা এসেছিলেন শাড়ি-পরা শিখতে, সবার আগে এসেছিলেন বিহারী গুপ্তের স্ত্রী সৌদামিনী। অবশ্য তখনও তার বিয়ে হয়নি। শাড়ির সঙ্গে জ্ঞানদানন্দিনী শায়া-সেমিজ-ব্লাউজ-জ্যাকেট পরাও প্রচলন করেন। এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার, অন্যান্য ব্রাহ্মিকারাও বাইরে বেরোবার সাজের কথা ভাবছিলেন। মনোমোহন ঘোষের স্ত্রী সরাসরি গাউন পরতেন। ঠাকুরবাড়িতেও ইন্দুমতী পরতেন গাউন। কিন্তু সব বাঙালিনী গাউন পরতে রাজী নন বলে দুর্গামোহন দাসের স্ত্রী ব্ৰহ্মময়ী পরতেন একটা জগাখিচুড়ি-মার্কা পোশাক। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ যেমন স্বদেশী পোশাক তৈরি করবার জন্যে পাজামাতে কেঁচা আর সোলার টুপির সঙ্গে পাগড়ির মিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন তেমনি ব্রাহ্মিকার মেমসাহেবদিগের গাউনের উপরিভাগে আঁচল জুড়িয়া এক প্রকার আধা বিলাতি আধ দেশী। পরিচ্ছদ সৃষ্টি করেন। বোম্বাই দস্তুর নতুনত্বের গুণে সবাইকে আকৃষ্ট করল। তবে এতে মাথায় আঁচল দেওয়া যেত না বলে প্রগতিশীলার একটি ছোট টুপি পরতেন। তার সামনেটা মুকুটের মতো, পেছনে একটু চাদরের মতো কাপড় ঝুলত। জ্ঞানদানন্দিনীর টুপি পরা ছবি আমি দেখিনি তবে মাথায় শাড়ির আঁচলে ছোট্ট ঘোমটা টানা প্রবর্তন করেন তার মেয়ে ইন্দিরা, তখন সাবেকী ধরনে শাড়ি পরার গৌরব আবার ফিরে এসেছে।
এখনকার আধুনিকারা যে ভাবে শাড়ি পরেন সেই ঢংটি জ্ঞানদানন্দিনীর দান নয়। বোম্বাই দস্তুর-এ যেসব অসুবিধে ছিল সেগুলো দূর করবার চেষ্টা করেন কুচবিহারের মহারাণী কেশব-কন্যা সুনীতি দেবী। তিনি শাড়ির ঝোলানো অংশটি কুঁচিয়ে ব্রোচ আটকাবার ব্যবস্থা করেন। তার সঙ্গে তিনি মাথায় পরতেন স্প্যানিশ ম্যাটিলাজাতীয় একটি ছোট্ট ত্রিকোণ চাদর। তার বোন ময়ূরভঞ্জের মহারাণী সুচারু দেবী দিল্লীর দরবারে প্রায় আধুনিক শাড়ি পরার টংটি নিয়ে আসেন। এটিই নাকি তার শ্বশুরবাড়ির শাড়ি পরার সাবেকী ঢং। বাস্তবিকই উত্তর ভারতের মেয়েরা, হিন্দুস্থানী মেয়েরা এখনও যে ভাবে সামনে আঁচল এনে সুন্দর করে শাড়ি পরে তাতে ঐ ধরনটিকেই বেশি প্রাচীন মনে হয়। বাঙালী মেয়ের অধিক স্বাচ্ছন্দ্যগুণে এটিকেই গ্রহণ করলেন তবে জ্ঞানদানন্দিনীর আঁচল বদলাবার কথাটি তারা ভোলেননি তাই এখন আঁচল বাঁ দিকেই রইল। কিছুদিন মেমেদের হব স্কার্টের অনুকরণে হব করে শাড়ি পরাও শুরু হয় তবে অত আঁটসাট ভাব সকলের ভাল লাগেনি। শাড়ির সঙ্গে সঙ্গে উঠল নানান। ফ্যাশানের লেস দেওয়া জ্যাকেট ও ব্লাউজ। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, বিলিতি দরজীর দোকান থেকে যত সব ছাঁটকাটা নানা রঙের রেশমের ফালির সঙ্গে নেটের টুকরো আর খেলো লেস মিলিয়ে মেয়েদের জামা বানানো হত।
