.
৯. আমার স্বাস্থ্যের দিকে অতন্দ্র দৃষ্টি
আমার শরীর-স্বাস্থ্য, রোগ-চিকিৎসা সম্বন্ধে তিনি কতটা অধিকার খাটাইতেন, তার প্রমাণ পাইয়াছিলাম করাচিতে মন্ত্রী থাকাকালে। একবার আমার পায়ের চিকিৎসা করিতে গিয়া ডাক্তাররা ঠিক করিলেন আমার বা উরাতে সাফেনাস নামক রগ একটি কাটিয়া ফেলিতে হইবে। হাসপাতালে মন্ত্রীর উপযোগী ব্যবস্থাদি করিয়া ডাক্তাররা আমাকে নিতে আসেন। আমার স্ত্রী ডাক্তারদেরে জেরা করিয়া কী ধরনের অপারেশন হইবে, তা জানিয়া নেন এবং তাতে আপত্তি করেন। আমাকে তিনি বুঝাইতে চেষ্টা করেন যে ঔষধে সকল প্রকারের চেষ্টা শেষ না করিয়া অপারেশনে আমার রাজি হওয়া উচিৎ নয়। আমি জবাব দিলাম এ ব্যাপারে ডাক্তারদের মতকে চূড়ান্ত বলিয়া মানা উচিৎ। উত্তরে তিনি বলিলেন : পূর্ব-পাকিস্তানের প্রধান-প্রধান ডাক্তারদেরে না দেখাইয়া করাচির ডাক্তারদের মতকে তিনি চূড়ান্ত বলিয়া মানিয়া নিতে রাজি নন। আমি বিবি সাহেবের এই অযৌক্তিক জিদে বড়ই বেকায়দায় পড়িয়া যাই। যারা করাচিতে আমার চিকিৎসা করিতেছেন তারা সকলেই নামকরা বড় ডাক্তার। কেউ ফিজিশিয়ান, কেউ সার্জন। তাঁদের অভিমতের নির্ভুলতার সন্দেহ করিবার কোনও কারণ নাই। তিনি আমার কথার জবাবে বলিলেন: তাদের নির্ভুল মত দুদিন পরেও নির্ভুলই থাকিবে। ইতিমধ্যে দুই-একদিনের জন্য ঢাকা গিয়া ওখানকার ডাক্তারদের কনসাল্ট করিয়া আসিতে দোষ কী?’ আজ শিরাটা না কাটিলেও দু’দিন পরে কাটা যাইবে। কিন্তু একবার কাটিয়া ফেলিলে পুনর্বহাল করা যাইবে না। ডাক্তাররা যথেষ্ট শ্রদ্ধা-বিনয়ের ভাব দেখাইয়া দৃঢ়তার সঙ্গে জানাইলেন যে মন্ত্রী-হিসাবে আমার স্বাস্থ্যের জিম্মাদার তাঁরা। বেগম সাহেবের তাতে হস্তক্ষেপ করিবার কোনও অধিকার নাই। অধিকারের প্রশ্ন তোলায় বিবি সাহেব আগুন হইয়া গেলেন। ডাক্তারদেরে বলিলেন : মন্ত্রী হওয়ার দরুন যদি স্বামীর চিকিৎসার উপর আমার কোনও হাত না থাকে, এই মন্ত্রিত্বই যদি আপনাদেরে এই একক অধিকার দিয়া থাকে, তবে আমি তাঁকে এই মুহূর্তে মন্ত্রিত্বে পদত্যাগ করাইব। তবু আজ অপারেশনের জন্য আমার স্বামীকে আপনাদের হাতে ছাড়িয়া দিব না।’
আমার স্ত্রী অগ্নিমূর্তি ও এই দৃঢ়তা দেখিয়া ডাক্তাররা প্রথমে স্তম্ভিত হইলেন। তার অজ্ঞতায় কৌতুক বোধ করিলেন। ফলে নরম হইলেন। ভাবিলেন বোধ হয় অজ্ঞ মেয়েলোকের সঙ্গে তর্ক করা নিষ্ফল। ডাক্তাররা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করিয়া অপারেশনের দিন পিছাইয়া দিলেন এবং মুখে খাইবার ঔষধ দিয়া বিদায় হইলেন। ডাক্তাররা বিদায় হইলে বিবি সাহেব প্রাইভেট সেক্রেটারিকে দিয়া তৎক্ষণাৎ সেই-রাত্রের প্লেনেই ঢাকা আসিবার দু’খানা টিকিট করিয়া ফেলিলেন। এর ফলে পরদিন সকালে সাতটার সময় আমি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন রোগী। বিবি সাহেবের কথাই ঠিক। ঢাকা ও মির্যাপুরের সব ডাক্তাররাই একমত হইলেন যে, বিবি সাহেব অপারেশন বাধা দিয়া আমাকে বাঁচাইয়াছেন। ঐ অপারেশন মস্ত বড় ভুল হইত। জীবনের নামে বাঁ-পা হারাইতাম।
শুধু এইবার নয়। আরেকবার করাচির বড়-বড় সার্জন-ফিজিশিয়ানরা একমত হইয়া আমার গল-ব্লাডার অপারেশন করিতে চাহিয়াছিলেন। এ বারও বিবি সাহেব বাধা দেন এবং আবার এক্স-রে করাইয়া ঢাকার ডাক্তারদের দেখাইয়া প্রমাণ করেন যে, আমার গল-ব্লাডারে কোনও স্টোন হয় নাই।
এই সব ঘটনা হইতে এটাই বুঝা যাইবে যে, আমার স্ত্রী নিজেকেই সকল ব্যাপারে আমার গার্ডিয়ান নিযুক্ত করিয়াছেন এবং আমি তা সানন্দে মানিয়া লইয়াছি। সানন্দে মানিয়া লইয়াছি এই জন্য যে স্ত্রীর এই অভিভাবকত্ব কখনো আমার কাছে প্রভুত্ব বলিয়া ঠেকে নাই। বরঞ্চ কথায় ও কাজে আমার সুখ-সুবিধার জন্য শারীরিক পরিশ্রমে তিনি প্রমাণ করিতেন, আজও করেন, তিনি আমার দাসী মাত্র। কাজেই দাম্পত্য জীবনে আমি পরম সুখী এ কথা শুধু আমার একার কথা নয় আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধবরাও তা বলিয়া থাকেন।
.
১০. সুখী দাম্পত্য জীবন
আমার অনেক বন্ধু-বান্ধবের ধারণা এবং সে ধারণা তাঁরা মুখে প্রকাশও করিয়া থাকেন যে, দাম্পত্য জীবনে এই নিরঙ্কুশ সুখই আমার প্রতিভা বিকাশে বিঘ্ন উৎপাদন করিয়াছে। তাঁদের দু-চারজন খুব কঠোর ভাষায় কিন্তু আন্তরিকতার সঙ্গে বলিয়াছেন : তুমি বউ-এর আঁচলে বাধা গৃহপালিত পশু “ডোমিটিকেটেড এনিম্যাল” মাত্র। আর্ট-সাহিত্যে মৌলিক কিছু দিবার দিন তোমার ফুরাইয়াছে। শুধু আমাকে একা নয় আরো অনেককেই একথা তাঁরা বলিয়াছেন। সারা দুনিয়ার বহু দৃষ্টান্ত দিয়া এঁরা দেখাইয়া থাকেন যে, চিরস্মরণীয় মনীষীরা কেউই দাম্পত্য জীবনে সুখী ছিলেন না। মনীষী বলিতে তারা নিশ্চয়ই কবি-সাহিত্যিক ও দর্শনী-বিজ্ঞানীদেরেই বুঝাইয়া থাকেন। কারণ দাম্পত্য জীবনে পরম সুখী বহু লোক রাষ্ট্রনেতা হিসাবে চরম সাফল্য লাভ করিয়াছেন। অসুখী স্বামী ইব্রাহিম লিংকনের মোকাবিলা আমরা অনেক রুযভেল্ট, চার্চিল, গান্ধীর নাম করিতে পারি। তবে কবি-সাহিত্যিকদের বেলা বন্ধুদের কথায় জোর আছে বলিয়া আমার মনে হয়। অনুভূতির তীব্রতা ছাড়া উকৃষ্ট কাব্য-সাহিত্য সৃষ্টি হইতে পারে না। মনের দিক হইতে সুখী লোকের অনুভূতি তীব্র হওয়ার অসুবিধা আছে। পাথরে পাথর ঘষিলে যেমন আগুন ক্ষরিত হয়, তেমনি বেদনার আঘাতেই মন হইতে তীব্র অনুভূতি বিচ্ছুরিত হয়। সুখের অপর নাম সন্তোষ। দাম্পত্য-সুখের অপর নাম গৃহ-প্রীতি বা ঘরমুখিতা। এই সন্তোষ ও ঘরমুখিতা মানুষের কল্পনা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও বেপরোয়া সাহস ভুতা করিয়া দেয়। এমন লোক মৌলিক শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টির শক্তি হারাইয়া ফেলে। ঘরে বা পরিবারে যার মন বাঁধা পড়িল, তার চিন্তার পরিধিও স্বভাবতই ছোট হইয়া গেল। ঐ সংকীর্ণ মন ও সীমাবদ্ধ দৃষ্টি দিয়া কেউ বড়-কিছু সৃষ্টি করিতে পারে না।
