কাজেই আমি একা নই। এই আট কোটি বাঙ্গালীর শতকরা নিরানব্বইজনই আমাদের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার মতই কৃষ্টিক স্বকীয়তারও দৃঢ় সমর্থক। আর লেখক-সাহিত্যিকদের কথা? তারা কত জন? এঁদের পাঠকই বা কয়জন? জনতার শতকরা মাত্র কুড়িজন লেখা-পড়া জানেন। এঁদের কত ডেসিমেল পয়েন্ট পার্সেন্ট লেখেন, আর কত ডেসিমেল পার্সেন্ট পড়েন? বলা যায়, এঁরা যতই মুষ্টির ভগ্নাংশ হউন, এঁরাই দেশের কৃষ্টি-সাহিত্যের নিয়ামক। কথাটা ঠিক। কিন্তু এঁদের কতজন সজ্ঞানে অপর রাষ্ট্রের ভাষিক কৃষ্টিক উপনিবেশের দালালি করিতেছেন? খুবই নগণ্য অংশ। আর সকলে পশ্চিম-বাংলার কথ্যভাষাকেই বাংলা-সাহিত্যের চলতি মাধ্যম বলিয়া জানেন। তারা ভাবেন, এটাই উন্নত বাংলা। সাহিত্যের উন্নত সর্বাধুনিক ভাষা। এটা যে পশ্চিম বাংলারই কথ্য ডায়লেক্ট তা-ও অনেকে জানেন না। তারা এটাকে সর্বাধুনিক সাহিত্যের ভাষা হিসাবেই চিনেন। যদিও তারা এ ভাষায় শুধু লেখেন, কথা বলেন না। কিন্তু এটাতে তারা কোনও অসংগতি দেখিতে পান না। আমরা কেতাবি ভাষায় কবে কথা বলিয়াছি? যেদিন এঁরা জানিবেন, কেতাবি ভাষা কেতাবি ভাষাই, ওটা অপর কোনও বিদেশের বা অঞ্চলের কথ্যভাষা নয়, সেদিন তারা আত্মমর্যাদার খাতিরেই নিজেদের কথ্যভাষায় যেমন কথা বলিবেন, তেমনি নিজস্ব সফিসটিকেটেড মার্জিত সাহিত্যের ভাষা নিজেরাই করিয়া লইবেন। এত বড় জাতির জনতা যেদিন সংকল্প করিবে : আমরা কারো থনে নিচু থাকিব না, কারো কাছে নীচ হইব না, সেদিনই আমরা মুক্ত হইব।
তবু আমি বুঝি ও সরলভাবে স্বীকার করি যে, আমি বর্তমানে বাংলাদেশের সাহিত্যের ক্ষেত্রে যুগ-ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলিতেছি। স্রোতের বিরুদ্ধে চলিবার চেষ্টা করিতেছি। এ ব্যাপারে আমি ডা. ইয়ুং ইমার্সনের কথাও ভুলি নাই। বরঞ্চ তাদের জীবন হইতে প্রেরণা লাভ করিয়াছি। ডা. ইয়ুং তার পশুচলেটস অব এনালিটিক্যাল সাইকলজিতে লিখিয়াছেন : স্পিরিট অব দি এজ, মানে যুগধর্ম, ধর্মোন্মাদনার চেয়েও শক্তিশালী। এটা কোনও যুক্তির ধার ধারে না। ওটা একটা প্রবণতা। অবচেতনার মধ্য দিয়া দুর্বল মনে তা প্রভাব বিস্তার করে দুর্বার গতিতে। এই যুগ-ধর্মের বিরুদ্ধে যাওয়া শুধু নিষ্ফল নয়, পাগলামিও। ওটা অবৈধ, অশালীন কুফরি ব্যক্তির জন্য বিপজ্জনক। তবু আমি এই যুগ-ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়াইছি এই সত্য উপলব্ধি করিয়া যে এটা ‘যুগে’র হইলেও ধর্মে’র শক্তি এর মধ্যে নাই। এটা ফ্যাশন মাত্র। মার্কিন জাতির পথ প্রদর্শক ইমার্সন যে তথাকথিত যুগ-ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়া ছিলেন তা পরবর্তী অধ্যায়ে বর্ণনা করিয়াছি। তা ছাড়া এঁদের কেউ কেউ যুক্তি দেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন জিলা ও অঞ্চলের কথ্যভাষা এতই ভিন্ন ও পৃথক যে, এদেশে বাংলাভাষাকে সর্বাঞ্চলীয় সর্বজনগ্রাহ্য কোনও বাংলাদেশি জাতীয় রূপ দেওয়া সম্ভব নয়।
কথাটা যে কত অসার, অসত্য ও ভ্রান্ত, তা ভাষাবিজ্ঞানীমাত্রেই জানেন। সব রাষ্ট্রের, সব জাতির, সব দেশের বেলাতেই গোড়াতে এই আঞ্চলিক বিভিন্নতা থাকে ও ছিল। দেশ, রাষ্ট্র ও জাতির স্বার্থেই সে বিভিন্নতা ডিঙ্গাইয়া জাতীয় ভাষা ও সাহিত্য সৃষ্টি হইয়াছে। কলিকাতার যে ভাষাকে এঁরা এত সহজে চলতি বাংলা’ বলেন, তারও জন্ম এইভাবেই হইয়াছে।
অধ্যায় ষোল – রাষ্ট্রিক বনাম কৃষ্টিক স্বাধীনতা
১. মার্কিন নজির
আমাদের জাতীয় মর্যাদা, কৃষ্টিক স্বকীয়তা ও রাষ্ট্রিক সার্বভৌম-স্বাধীনতার জন্য যে দুইশ বছরের আমাদের কালচারের টাওয়ার কলিকাতার প্রভাবমুক্ত হইতে হইবে, এটা আমি উপলব্ধি করি জার্মান, ইটালি, আয়ারল্যান্ড ও মার্কিন মুল্লুকের ভাষিক-সাহিত্যিক কৃষ্টিক-উদ্বর্তনের ইতিহাস পড়িয়া। এইসব আন্দোলনের ইতিহাসই আমার মনে গভীর রেখাপাত করিয়াছে সত্য কিন্তু মার্কিন মুল্লুকের সর্বগ্রামটা আমার মন ও মস্তিষ্ককে উদ্বেলিত করিয়াছে সবচেয়ে বেশি। এ দাগ সৃষ্টি করেন ইমার্সন। ১৯৬২ সালে আমি বাংলা একাডেমিতে ‘সাহিত্যের প্রাণ, রূপ ও আঙ্গিক’ নামে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ পড়ি। তাতে পাক-বাংলার ভাষা-সাহিত্যের স্বাতন্ত্র্য ও কৃষ্টিক স্বকীয়তার কথা বলি এবং বৃটেনের ভাষা-সাহিত্য হইতে মার্কিন ভাষা-সাহিত্যের স্বাতন্ত্রের নজির দেই। সমবেত সাহিত্যিকদের অধিকাংশ আমার প্রতিবাদ করেন। আমার কথাকে তারা অবিভাজ্য বাংলা কৃষ্টি-সাহিত্যকে দ্বিখণ্ডিত করার ষড়যন্ত্র আখ্যা দেন। জবাবে আমি বলি ইমার্সনের মত পণ্ডিত ব্যক্তির কথা বুঝিতে মার্কিনবাসীর পঞ্চাশ বছর লাগিয়াছিল, আমার মত অপণ্ডিত ব্যক্তির কথা বুঝিতে আপনাদের একশ বছর লাগিলেও আমি তাতে বিস্মিত হইব না। পাঠকদের সুবিধার জন্য আমি এখানে মার্কিন জাতির সেই সংগ্রামী উদ্বর্তনের কথাটারই পুনরুল্লেখ করিতেছি।
মার্কিনীরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করে ১৭৭৬ সালে। কিন্তু ভাষিক ও সাহিত্যিক স্বাধীনতা লাভ করিতে তাদের আরো দেড়শ বছর লাগিয়াছিল। এ সব ব্যাপারে স্বকীয়তার আবশ্যকতা উপলব্ধি করিতেই তাদের প্রায় একশ বছর লাগিয়াছিল। একবার জাতীয় স্তরে সে উপলব্ধি ঘটিয়া গেলে প্রয়োগের স্তরে আর বেশি সময় লাগে না। মার্কিনীদেরও লাগে নাই। মাত্র পঞ্চাশ বছরেই মার্কিন জাতি জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইংরাজ জাতির থনে পৃথক স্বতন্ত্র-স্বাধীন-স্বকীয় ব্যক্তিত্ব হাসিল করিয়া ফেলে। উপলব্ধির মুদ্দতটা যেমন ছিল দীর্ঘ, প্রসেসটাও ছিল তেমনি কণ্টকাকীর্ণ। রাজনৈতিক সিভিল ওয়ারের মতই এটাও ছিল কৃষ্টিক-সাহিত্যিক সিভিল ওয়ার। রাজনৈতিক যুদ্ধে জিতার চেয়ে কৃষ্টিক যুদ্ধে জিতা আরো বেশি কঠিন। রাজনীতিক পরাধীনতাটা দৈহিক ও দৃশ্যমান। কিন্তু কৃষ্টিক পরাধীনতাটা মানসিক ও অদৃশ্য। দীর্ঘদিনের পরাধীনতা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যেমন অভ্যাসে পরিণত হয় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ততটা হয় না। কৃষ্টিক-ভাষিক-সাহিত্যিক পরাধীনতাটা যেমন একটা এলিটিমের পোশাকি ভব্যতায় পরিণত হইতে পারে, রাজনৈতিক পরাধীনতা তেমন হইতে পারে না। ফলে রাজনীতিক চেতনার বিস্ফোরণটা যত সহজে গণভিত্তিক হইতে পারে কৃষ্টিক চেতনাটা তেমন গণভিত্তিক হইতে পারে না। এই কারণে আমাদের দেশের বর্তমান লেখক-সাহিত্যিকরা কলিকাতার ভাষা কৃষ্টির মোকাবিলায় যেমন হীনম্মন্যতায় ভুগিতেছেন, পুরা উনিশ শতকের মার্কিন সাহিত্যিকরা তেমনি হীনম্মন্যতায় ভুগিতেছিলেন লন্ডনের ভাষা সাহিত্যের মোকাবিলায়। আমাদের লেখক-সাহিত্যিকরা বর্তমানে যেমন আমাদের নিজস্ব ভাষার বাক-রীতি ও উচ্চারণ-ভঙ্গিতে কলিকাতা শান্তিনিকেতনের বাক-রীতির মোকাবিলায় হেয় ভালগার ও অভব্য মনে করেন, ঐ যুগের মার্কিন লেখক-সাহিত্যিকরাও তেমনি লন্ডন-অক্সফোর্ডের বাক-রীতি ও উচ্চারণ-ভঙ্গির মোকাবিলায় মার্কিনী বাক-রীতি ও উচ্চারণ ভঙ্গিকে ভালগার ও অসভ্য মনে করিতেন।
