.
৬. জটিলতা বৃদ্ধি
এটা ত গেল লেখ্য বাংলা ভাষার সমস্যা। এর পরেও গোদের উপর একটা বিষফোঁড়া দেখা দিল। আঠার শতকের শেষ দিককার মার্কিন ও ফরাসি বিপ্লব ও বিশ শতকের গোড়ার রুশ বিপ্লবের ফলে ইউরোপ ও আমেরিকায় ভাষা ও সাহিত্য একটা গণমুখী মোড় গ্রহণ করিল প্রবল স্রোতের বেগেই। খুব স্বাভাবিক কারণেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এটা প্রতিফলিত হইল। কলিকাতা-কেন্দ্রিক বাংলাতে স্বভাবতই এই গণমুখিতা পশ্চিম বাংলায়। কেন্দ্রীভূত হইল। কলিকাতা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের আঞ্চলিক কথ্য ভাষা সাহিত্যের ভাষার মর্যাদা লাভ করিয়া ইতিপূর্বে বাংলায় যেটা ছিল শুধু হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক স্বাতন্ত্র্য, তার সাথে যোগ হইল পশ্চিম ও পূর্ব বাংলার আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র। এই ডাবল সমস্যার সমাধান স্পষ্টত দুঃসাধ্য ছিল। এমনি সময়ে ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক পাকিস্তান দাবি উঠিল। হিন্দুরা স্বভাবতই প্রবল বিরোধিতা করিল। পরিণামে হিন্দুদের দাবিতে বাংলা পশ্চিম ও পূর্ব বাংলায় বিভক্ত হইয়া গেল। কলিকাতাসহ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হইল। দুইশ বছরের কলিকাতার হিন্টারল্যান্ড পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হইল। ঢাকা পূর্ব-পাকিস্তানের রাজধানী হইল। আগে ছিল যেটা ভাষা-সাহিত্যের ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক ও আঞ্চলিক স্বাতন্ত্রের প্রশ্ন, সেটাই হইয়া গেল দুই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জাতীয় স্বকীয়তার প্রশ্ন।
.
৭. আমার উভয়সংকট
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিটা আমাকে যতটা আঘাতিত ও বিভ্রান্ত করিল, আমার জানা কাউকে বা আমার বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীদের ততটা আঘাতিত ও বিভ্রান্ত করিয়াছে বলিয়া মনে হইল না। আমার এই একাকিত্ব ও অনন্য সাধারণত্বের কারণ খুঁজিবার অনেক চেষ্ট করিয়াছি। দেশভাগের আগের প্রায় দশ-পনের বছর ও দেশভাগের পরের পঁচিশ বছর একুনে আমার সাহিত্যিক জীবনের এই চল্লিশটি বছর এই গবেষণায় না হোক, ধ্যান ধারণা ও চিন্তা-ভাবনায় কাটিয়াছে। আমি কোনও অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী নই। তবু আমার এই একাকিত্বের কারণ কী? এর একমাত্র উত্তর, আমার বিবেচনায়, এই যে বাংলার রাজনীতি ও সাহিত্যের উভয় ক্ষেত্রেই আমার বিশেষ একাকিত্ব বরাবরই ছিল। রাজনীতিতে আমি বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী ও কংগ্রেসি ছিলাম আন্তরিকতার সাথেই। কিন্তু সেখানেও আমি গণমুখী, ভাষান্তরে ও কার্যান্তরে, কৃষক-প্রজা কংগ্রেসি ছিলাম। রাজনীতিতে আমার বাঙ্গালী জাতীয়তা ছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের প্যাটার্নের। এ জাতীয়তাবাদে বাঙ্গালী হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের অর্থ ছিল রাজনৈতিক ফেডারেশন, কৃষ্টিক ফিউশন ছিল না। ব্যবহারিক রাজনীতিতে এটা সম্ভব ও বাস্তব ছিল। কিন্তু সাহিত্য-ক্ষেত্রে এটা সম্ভব ছিল না। কারণ রাজনীতিতে মেজরিটি আধিপত্য, সাহিত্যে মাইনরিটির রাজত্ব। দেশবন্ধুর জাতীয়তাবাদ যখন বাঙ্গালী হিন্দুরা গ্রহণ করিল না তখনই বহুজাতিক উপমহাদেশ ইন্ডিয়ার সঙ্গে সঙ্গে একজাতিক বেঙ্গলও ভাগ হইয়া গেল। বহু জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসি মুসলিম পাকিস্তান দাবির সমর্থন করিয়াছেন। বহু জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসি হিন্দু বেঙ্গল পার্টিশন-সমর্থন করিয়াছেন। এটা তাঁদের পক্ষে কঠিন ছিল। রাজনৈতিক পরিবেশ ও স্বাধিকার-বোধই জাতীয় চেতনায় বিবর্তন ঘটাইয়া এ কাজ সহজ করিয়া দেয়। কিন্তু কংগ্রেসি মুসলিম সাহিত্যিকের পক্ষে এটা তত সহজ ছিল না। বহু মুসলিম সাহিত্যিক পাকিস্তান দাবির সমর্থন করিয়াছেন। কিন্তু তাঁরা কংগ্রেসি জাতীয়তাবাদী ছিলেন না। পাকিস্তান দাবির সমর্থনের আগে তারা সক্রিয় রাজনীতি করিতেন না। মুসলিম-প্রধান একটা নয়া রাষ্ট্র গঠনের দাবিতে তারা অতি সহজেই সমর্থন করিতে পারিলেন। আমার পক্ষে সেটা সম্ভব ছিল না। কাজেই আমাকে চিন্তা-ভাবনা করিয়া পাকিস্তানি হইতে হইয়াছিল। তাতে তিন-চার বছর লাগিয়াছিল। গোড়াতে আমি আমার সম্পাদিত দৈনিক কৃষক-এ কষিয়া পাকিস্তান দাবির নিন্দা করিয়াছি। মুসলিম স্বার্থ সম্বন্ধে আমি সচেতন ও মুখর ছিলাম না, তা নয়। বরঞ্চ কংগ্রেসে আমি মুসলিম স্বার্থ রক্ষার দাবি সবল ভাষায় করিয়াছি। কিন্তু সে কারণে দেশভাগ করার আমি প্রয়োজন বোধ করি নাই। বরঞ্চ আমি মনে করিয়াছি, দেশভাগে মুসলমানদের লাভের চেয়ে ক্ষতিই হইবে বেশি। পরে আমি যখন পাকিস্তানবাদী হইলাম, তখন এমন সর্বাত্মক পাকিস্তানি হইলাম যে মুসলিম লীগ নেতাদের চেয়েও গোড়া পাকিস্তানি হইলাম। কারণ আমার পাকিস্তানি চিন্তার মধ্যে কৃষক-প্রজা অর্থনৈতিক অধিকারের এবং মুসলমানদের কৃষ্টি সাহিত্যিক স্বকীয়তার প্রবল অনুভূতি ছিল। এই দুইটা দাবির মধ্যে প্রথমটা যেমন স্কুল ও দৃশ্যমান ছিল, দ্বিতীয়টা তত স্কুল ও দৃশ্যমান ছিল না। সে জন্য মুসলিম ইন্টেলিজেনশিয়া সাধারণত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র সম্বন্ধে যতটা সচেতন ছিলেন, কৃষ্টি-সাহিত্যের ব্যাপারে তত সচেতন ছিলেন না।
.
৮. পাকিস্তান সংগ্রামে মুসলিম সাহিত্যের দ্বিধাবিভক্তি
অধিকন্তু এটা স্মরণীয় যে বাংলার অধিকাংশ প্রতিভাধর মুসলিম সাহিত্যিকরাই পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন। সেকালের সাহিত্যিকদের দৃষ্টি ছিল সাধারণত আসমানের দিকে মাটির দিকে নয়। পাকিস্তান দাবিকে তারা সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক দাবি মনে করিতেন। সাহিত্যে সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতার স্থান নাই বলিয়া তারা বিশ্বাস করিতেন। এর দুইটা কারণ ছিল। প্রথমত, কৃষ্টি-সাহিত্যকে তাঁরা ক্লাসের (উচ্চবর্ণের) সম্পদ ভাবিতেন, মাসের’ (জনগণের) সম্পদ ভাবিতেন না। দ্বিতীয়ত, তাদের এই আত্মবিশ্বাস ছিল যে হিন্দু-মুসলিম মিশ্রিত জাতীয়তার ক্ষেত্রে তারা আপন আপন প্রতিভাবলেই নিজেদের স্থান করিয়া লইতে পারিবেন। একটি মাত্র দৃষ্টান্তই যথেষ্ট। নজরুল ইসলাম তার মুসলিম-চৈতন্যে আকাশচুম্বী হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান দাবির তীব্র বিরোধিতা করিয়াছেন। সাহিত্য-ক্ষেত্রে হিন্দু প্রাধান্য তাঁর অসাধারণ যুগ-প্রবর্তক-প্রতিভাকে দাবাইয়া রাখিতে পারে নাই। এই অভিজ্ঞতার চূড়ায় বসিয়া তিনি বাঙ্গালী মুসলমানের প্রাণের প্রকাশ সোচ্চারে এবং সাফল্যজনকভাবেই করিয়াছেন। কিন্তু তাদের মুখের চিন্তা করা তখনও প্রয়োজন মনে করেন নাই। নিজের বিপুল আত্মবিশ্বাসের জোরে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের গোড়ার দিকে তার তীব্র বিরোধিতা করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু দেশভাগ হইয়া পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরেও তিনি সেই মতবাদে বিশ্বাসী থাকিতেন কি না, আজ তা বলা খুবই কঠিন। যতই কঠিন হোক, এটা অনুমান করা তত কঠিন নয় যে, তাঁর মুসলিম-চৈতন্যের তীব্রতা এবং মুসলিম ঐতিহ্যে আস্থার প্রাচুর্য তাঁকে শেষ পর্যন্ত ঢাকায় আনিত এবং এ দেশেরই কৃষ্টি-সাহিত্যের নবায়নের নেতৃত্ব গ্রহণে বাধ্য করিত। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে নাই। পাকিস্তান আন্দোলনের গোড়াতেই তিনি শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হন। আজ ত্রিশ বছর ধরিয়া তিনি সম্বিহারা হইয়াও বাঁচিয়া আছেন। দুই বছর আগে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ঢাকায় আনিয়া সুচিকিৎসার ব্যবস্থাদি করিয়াছেন।
