কোন রিয়ালগুলো?, জানতে চাইল সাজিদ।
এই ধরো, ক্রিসমাস ট্রি এর কথা। ক্রিসমাসের দিন একটি সবুজ গাছকে ঘিরে যে-সাজ-সজ্জা এবং আনন্দ-ফুর্তি হয়, সেটা।
সত্যি বলতে, এই রিচুয়ালগুলোও প্যাগানদের থেকে ধার করা। প্যাগানরা মনে করত সবুজ বৃক্ষ হলে প্রাণ তথা জীবনের প্রতীক। তাই তারা তাদের পুজো-উৎসবে তাদের ঘর এবং ঘরের আশপাশ এরকম সবুজ বৃক্ষ দিয়ে সাজিয়ে রাখত এবং পুজো করত। এমনকি সান্তা ক্লজ, যেটি ক্রিসমাস ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেটাও ধার করা জার্মান মিথোলজি থেকে। সান্তা ক্লজ যে ক্রিসমাসের আগের রাতে এসে বাচ্চাদের উপহার দিয়ে যায়, সেটি মিথোলজির দেবতা Odin এর কাহিনি থেকে আসা।
আমি বললাম, তা না-হয় বুঝলাম বাপু; কিন্তু যিশুর সময়কাল থেকেই যদি এই উৎসব পালন হয়ে থাকে তো এত যুক্তি-প্রমাণের তো কোনো দরকার নেই, তাই না?
রাইট, বলল ডেভিড। তার চোখেমুখে উজ্জ্বল আভা। যেন সে শক্ত কোনো ভিত্তি পেয়ে গেল পায়ের তলায়।
সাজিদ বলল, সরি টু সে, পৃথিবীর ইতিহাসে চতুর্থ শতাব্দীর আগে ক্রিসমাস ডে উদ্যাপনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এই কথাটি ক্রিশ্চিয়ান চার্চের অক্সফোর্ড ডিকশনারি এভাবে লিখেছে, Though speculation as to the time of the year of Christs birth dates from the early 3rd century…. the celebration of the anniversary does not appear to have been general till the later 4th century. ক্যাথলিক এনসাইক্লোপিডিয়া লিখেছে এরকম, Christmas was not among the earliest festivals of the Church খেয়াল করো, যিশুর জন্মের আরও তিনশো বছর পরে এসে হঠাৎ করে ক্রিসমাস ডে পালন করা শুরু হলো। এর আগে এরকম কোনো উৎসবের নাম-গন্ধও খ্রিষ্টানদের ইতিহাসে ছিল না। অদ্ভুত না ব্যাপারটি?
আমি আর ডেভিড দুজনেই চুপ করে রইলাম। আমাদের মনোযোগ বিচ্ছিন্ন হলো মতি ভাইয়ের কথায়। মতি ভাই বলল, কী ব্যাপার! আম্নেরা দেহি চা-টারে বরফ বানাইয়া ছাইড়লেন।
আমরা খেয়াল করলাম যে, আসলেই আমাদের তিনজনের চা-ই ঠান্ডা বরফ হয়ে আছে। ক্রিসমাসের প্রকৃত রহস্য শুনতে শুনতে ভুলেই গিয়েছি যে, হাতে চায়ের কাপ ধরে বসে আছি।
আমাদের ওই চা আর খাওয়া হলো না। চায়ের বিল পরিশোধ করে দিয়ে হাঁটা ধরলাম বাসার উদ্দেশ্যে। ডেভিডের মুখ একেবারে শুকনো হয়ে আছে। বেচারা কত শখ করে বাংলাদেশে ক্রিসমাস ডে পালন করতে এসেছিল। সাজিদ সবটায় জল ঢেলে দিল। আমি বললাম, তা ডেভিড, অ্যালেনদের বাসার ঠিকানা তো নিলে না এখনো। আগামীকাল তো তোমার সেখানে যাওয়ার কথা।
সে মুখ নিচু করে বলল, না আরিফ। আমি ক্রিসমাস ডেতে অ্যাটেন্ড করব না।
বেচারার শুকনো মুখ দেখে আমার খুব মায়া হলো। আমি সাজিদকে টেনে একপাশে নিয়ে গিয়ে বললাম, অ্যাই, আজকেই তোর এই ইতিহাস টানতে হলো কেন? বেচারা কত শখ করে সেই সুদূর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে ক্রিসমাস পালনের জন্যে এসেছে। তুই তো ওর সব আশায় জল ঢেলে দিলি।
সাজিদ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। বলল, বাইবেলে খুব সুন্দর একটি শ্লোক আছে। জানিস কী সেটা?
আমি বললাম, কী?
সাজিদ বলল, Let There Be Light, অর্থাৎ আলোকিত হতে দাও। বাইবেল বলছে, যেখানে অন্ধকার, অজ্ঞতা রয়েছে, সেখানে আলো দাও। আমিও তা-ই করলাম। অন্ধকারে আলো দিলাম।
ঠিক কী কারণে জানি না। শ্লোকটি আমারও বেশ পছন্দ হয়ে গেল। লেট দেয়ার বি লাইট…
ক্রিসমাস ডে সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে
১) McGowan, A. How December 25th Became Christmas, Bible History Daily
২) Stephen Nissenbaum, The Battle for Christmas : A Cultural History of Americas Most Cherished Holiday, New York: Vintage Books, 1997, p. 4.
৩) The two babylons by Alexander Hislops
৪) Golden Bough- Sir James Frazer
৫) Encyclopedia-Man, Myth & Magic by Richard Cavendis
১৪. কাবার ঐতিহাসিক সত্যতা
ডেভিডের খুব মন খারাপ। গতকাল সাজিদের কথাগুলো শোনার পর থেকেই সে কেমন যেন নির্জীব হয়ে আছে। সকাল থেকে বাংলায় সে একটি কথাও বলেনি। টুকটাক যা বলেছে তার সবটাই টান টান ইংরেজিতে।
পঁচিশে ডিসেম্বর হিশেবে আজ সরকারি ছুটির দিন। আমার একবার মনে হয়েছিল ডেভিড রাতের মধ্যেই সিদ্ধান্ত পাল্টাবে এবং সকালেই তার বন্ধু অ্যালেনদের সাথে ক্রিসমাস পার্টিতে জয়েন করবে; কিন্তু সকাল থেকেই তার মধ্যে তেমন কোনো লক্ষণ দেখতে পাচ্ছি না। সাদা চামড়ার এই ছেলেটিকে এরকম বিষণ্ণ চেহারায় দেখতে আমার একদমই ভালো লাগছে না। সাজিদ মনোযোগ দিয়ে কী যেন লিখছে। মন খারাপ নিয়ে ডেভিড ম্যাগাজিন পড়ছে, আর আমি হাত-পা গুটিয়ে বেডের ওপর বসে আছি। পুরো ঘরটি জুড়েই প্রচ্ছন্ন নীরবতা।
নীরবতা ভেঙে আমি বললাম, ডেভিড, তুমি কি অ্যালেনদের বাসায় সত্যিই যাচ্ছ না?
আমার কথা শুনে সে ম্যাগাজিন থেকে চোখ তুলে আমার দিকে তাকাল। যেন আমার এই প্রশ্নটি তার কাছে খুব অপ্রত্যাশিত। চশমার ফ্রেম ঠিক করতে করতে সে বলল, নো।
আমার কথা শুনে সাজিদ লেখা থামিয়ে দিল। সম্ভবত আমাদের আলোচনায় সেও অংশগ্রহণ করবে। আমি বললাম, তুমি যে যাচ্ছ না, সেটি অ্যালেনকে জানিয়েছ?
