আমি মতি ভাইকে বললাম, তা মতি ভাই, তোমার পরী কি পরে আর আসছিল?
মতি ভাই বেশ নরম সুরে বললেন, না। আর আইব কিয়েল্লাই। হেতির আর আমারে দিয়া কাম কী কও?
কোনো চিঠিপত্রও কখনো পাঠায়নি?
এবারও মতি ভাই না-সূচক উত্তর দিলেন। এরপর বললেন, তোমাদের কি আদা চা-ই দিমু?
আমি বললাম, তা-ই দাও। ডেভিডের দিকে ফিরে বললাম, ডেভিড, তুমিও কি আদা চা-ই খাবে?
ডেভিড আমেরিকান ইংরেজিতে বলল, হোয়্যাট ডাজ ইট মিন বাই আদা চা?
ডেভিডের ইংরেজি শুনে মতি ভাই আমাকে বলল, কেডা এই লোক?
আমাদের বন্ধু।
কই থাহে?
আমেরিকা। বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছে।
মতি ভাই ও বলে আবার চা বানানোয় মন দিল। সাজিদ ডেভিডকে আদা চায়ের ব্যাপারে বুঝিয়ে বলার পরে ডেভিডও আদা চা খাওয়ার ব্যাপারে রাজি হয়ে গেল। ডেভিড বলল, সাজিদ, এবার বুঝিয়ে বলো কেন খ্রিষ্টানরা ভুল দিনে ক্রিসমাস। ডে পালন করে।
সাজিদ গলা খাঁকারি দিল হালকা করে। বলল, সারপ্রাইজিং টুথ কী জানো ডেভিড? এই ক্রিসমাস ডের সাথে ক্রিশ্চিয়ানিটির আসলে কোনো সম্পর্কই নেই।
সাজিদের এই কথা শুনে ডেভিড আর আমি দুজনেই চমকে উঠলাম। বলে কী ও! ক্রিসমাস ডের সাথে নাকি খ্রিষ্টানদের কোনো সম্পর্ক নেই! চোখেমুখে বিস্ময় নিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী বলছিস এসব তুই? ক্রিসমাস ডের সাথে ক্রিশ্চিয়ানিটির সম্পর্ক নেই মানে? তাহলে ক্রিশ্চিয়ানিটির মধ্যে ক্রিসমাস ডে এলো কোথেকে?
সাজিদ মুচকি হেসে বলল, সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। ক্রিশ্চিয়ানিটির মধ্যে এই উৎসব ঢুকল কী করে! আরও অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, ক্রিশ্চিয়ানিটির মধ্যে এই ক্রিসমাস ডে তথা পঁচিশে ডিসেম্বরে উৎসব পালনের রীতিটি এসেছে প্যাগানদের কাছ থেকে।
এবার আমি আর ডেভিড দুজনেই হাঁ করে রইলাম। কারও মুখে কোনো কথা নেই যেন। সাজিদ আবার বলতে শুরু করল, এই ইতিহাস অনেক পুরোনো। যিশুর জন্মের আগে ইউরোপে রাজত্ব কত প্যাগানরা। এই প্যাগানরা তখন স্যাটারন্যালিয়া নামক একটি উৎসব পালন করত। দেবতা স্যাটার্ন এর পূজোই এই উৎসবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। দেবতা স্যাটার্ন ছিল ফসলের দেবতা। ফসল কাটার মৌসুম শেষে যখন সবার ঘরে ঘরে খাবার এবং ফসল মজুদ হয়ে যেত, তখনই এই উৎসব পালন করা হতো বলে জানা যায়। ডিসেম্বরের সতেরো তারিখে এই স্যাটারন্যালিয়া উৎসব পালন করা হতো।
মতি ভাই আমাদের দিকে চা এগিয়ে দিল। আমরা সন্তর্পণে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে সাজিদের কথার দিকে মনোযোগ দিলাম।
প্যাগানদের মধ্যে আরেকটি প্রধান উৎসবের প্রচলন ছিল। সেটি হলো দেবতা মিথ্রাসের জন্মদিন। এটিকে মিথ্রাইজম বলা হয়। মিগ্রাস ছিল আলোর প্রতীক। যিশুর জন্মের দুই হাজার বছর আগ থেকে এই দেবতা মিথ্রাসের পুজোর প্রচলন ছিল প্যাগানদের মধ্যে। জানা যায়, এই মিথ্রাস দেবতার জন্মদিন ছিল পঁচিশে ডিসেম্বর। তাই, প্যাগানরা ডিসেম্বরের পঁচিশ তারিখ এই মিথ্রাসের জন্মদিন পালন করত। প্যাগানরা এই উৎসবকে বলত Dies Natalis Solis Invicti. এর মানে হলো The Birthday of Unconquerable Sun.
যাইহোক, তখন ইউরোপে আস্তে আস্তে ক্রিশ্চিয়ানিটি প্রবেশ করছিল মাত্র। কিছু কিছু প্যাগান প্যাগানিজম ছেড়ে খ্রিষ্টধর্মে চলে আসা শুরু করে। তখন কনস্ট্যানটাইন নামের একজন রোমান, যিনি প্যাগানধর্মের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত, তিনি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করার পরে তিনি প্যাগানদের মধ্যে খ্রিষ্টান চার্চের ব্যাপক প্রচারণা শুরু করে দেন; কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, প্যাগানিজম ছেড়ে তিনি খ্রিষ্টধর্মে আসলেও প্যাগানদের রীতি-নীতিকে মন থেকে ছুড়ে ফেলতে পারেননি। তখন থেকে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন ক্রিশ্চিয়ানিটি এবং প্যাগানিজমের মধ্যে একটি মেলবন্ধন তৈরি করতে। পরে তিনিই দেবতা স্যাটার্ন এবং দেবতা মিথ্রাসের জন্মদিনকে যিশুর জন্মদিন বলে প্রচার করতে লাগলেন, যাতে একই দিনে প্যাগানরা এবং খ্রিষ্টানরা উৎসব পালন করতে পারে।
আমাদের বিস্ময়ের রেশ এখনো কাটেনি। বললাম, তো, কনস্ট্যানটাইন নামের ভদ্রলোক যে, প্যাগান উৎসবকে যিশুর জন্মদিন বলে চালিয়ে দিল, খ্রিষ্টান পাদ্রীরা আপত্তি করল না কেন?
সাজিদ বলল, গুড পয়েন্ট। কনস্ট্যানটাইন যখন প্যাগান এই উৎসবগুলো যিশুর জন্মদিন বলে চালিয়ে দিল, তখন খ্রিষ্টান পাদ্রীরা কয়েকটি কারণে আপত্তি করেনি। প্রথমত, তাদের নিজেদের কাছেও যিশুর সঠিক জন্মদিনের কোনো প্রমাণ নেই। কারণ, বাইবেলে এটি সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছুই বলা নেই। দ্বিতীয়ত, এই পাত্রীরা চাচ্ছিলেন যে, ওই সময়ে ক্রিশ্চিয়ানিটি যেন সর্বত্র ছড়িয়ে যায়। এমতাবস্থায়, যদি প্যাগানদের বোঝানো যায় যে, দেখো, আমরাও কিন্তু তোমাদের মতো পঁচিশে ডিসেম্বরে আমাদের ঈশ্বরের জন্মদিন পালন করি। তোমাদের ঈশ্বর আর আমাদের ঈশ্বর, সে তো একই। আসো, তোমরাও খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করো।
ডেভিড এতক্ষণ পর কথা বলে উঠল। সে বলল, সাজিদ, তুমি বলতে চাচ্ছ যে, প্যাগানদের খ্রিষ্টধর্মে ভিড়ানোর জন্যে চার্চের পাদ্রীরা প্যাগান দেবতার জন্মদিনকে যিশুর জন্মদিন হিশেবে মেনে নিয়েছে?
একদম তা-ই, বলল সাজিদ।
কিন্তু ক্রিসমাস ডেতে প্র্যাকটিস হওয়া রিয়ালগুলো তাহলে কীভাবে এলো?
