আহসান হতাশ ভঙ্গিতে পুরো বিষয়টা শোনার জন্য প্রস্তুত হল। এই বিরক্তিকর মানুষটার কাছ থেকে ছাড়া পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না।
শওকত সাহেব বললেন, ‘তোমাদের ডারউইনের থিউরি বলে, পাখি এসেছে সরীসৃপ থেকে।
তুমি এখন একটা সাপ ও ময়ূর পাশাপাশি রাখো। চিন্তা কর যে, ময়ূরের পূর্বপুরুষ সাপ, যে সাপ এখন ময়ূরের প্রিয় খাদ্য। বলো, তোমার কিছু বলার আছে?’
-‘এই মুহূর্তে কিছু বলার নেই চাচা।’
-‘মনে মনে ১০ এর উপরে ৯৫০ টা শুন্য বসাও।
এই বিশাল প্রায় অসীম সংখ্যা দিয়ে ১ কে ভাগ কর। কি পাবে জানো? শূন্য। এটা হল এটমে এটমে ধাক্কাধাক্কি করে ডিএনএ অণু তৈরীর সম্ভাবনা। মিলার নামে কোন সায়েন্টিস্ট এর নাম শুনেছো? ছাগল টাইপ সায়েন্টিস্ট।
-‘চাচা শুনিনি।’
-‘ঐ ছাগলটা ১৯৫০ সনে একটা এক্সপেরিমেন্ট করে অন্য ছাগল সাইন্টিস্টদের মধ্যে হইচই ফেলে দিয়েছিল। ছাগলটা করেছে কি, ল্যাবরেটরীতে আদি পৃথিবীর আবহাওয়ার তৈরি করে ঘনঘন ইলেকট্রিক কারেন্ট পাস করেছে। কিছু প্রোটিন অনু তৈরি করে বলেছে- এভাবেই পৃথিবীতে প্রাণের শুরু। প্রান সৃষ্টিতে সৃষ্টিকর্তার কোন প্রয়োজন নেই। এখন সেই ছাগল মিলারকে নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে হাসাহাসি। Life ম্যাগাজিনে কি লেখা হয়েছিল পড়ে শোনাই।’
-‘চাচা, আরেকদিন শুনি? জটিল কিছু শোনার জন্য আমি এ মুহূর্তে মানসিক ভাবে তৈরি না।’
-‘জটিল কিছু বলছিনা। জলবত তরলং। মন দিয়ে শোনো।’
শওকত সাহেব পড়তে শুরু করলেন। আহসান হতাশ চোখে জানালার দিকে তাকিয়ে রইল…
–এইটুকু পড়ে আমি বেশ আনন্দ পেলাম। লেখক হুমায়ুন আহাম্মেদ এখানে ব্যাটা ডারউইনকে একহাত নিলেন। শওকত সাহেবের মত আমিও কোনোভাবেই মানতে পারিনি যে, আমাদের পূর্বপুরুষ বানর। ভাবতেই ঘেন্না লাগে !
–বইটি নিয়ে আমি সাজিদের কাছে গেলাম। এসে দেখি সে ব্যাগপত্র গোছানো শুরু করেছে। সে বলল, ‘চল, বাসায় যাব।’
আমি তাকে হাতের বইটি দেখিয়ে বললাম, -‘এই বইটা পড়েছিস? মজার একটি কাহিনী আছে। হয়েছে কি জানিস……..’
আমার মুখ থেকে কথা কেড়ে নিয়ে সাজিদ বললো, – ‘শওকত সাহেব নামের এক ভদ্রলোক আহসান নামের একটি ছেলের সামনে ডারউইনের গুষ্টি উদ্ধার করছে, তাই তো?’
আমি অবাক হলাম। বললাম, – ‘হ্যাঁ। কিন্তু আমি এ ব্যাপারে বলবো কি করে বুঝলি?’
সাজিদ ব্যাগ কাঁধে নিতে নিতে বলল, -‘এইটা ছাড়া এই বইটা আর তেমন বিশেষ কিছু নাই যেটা দেখাতে তুই এভাবে আমার কাছে ছুটে আসবি। তাই অনুমান করলাম।’
আমি আর কিছুই বললাম না। বইটি সেল্ফে রেখে দিয়েই হাঁটা ধরলাম।
সিঁড়ির কাছাকাছি আসতেই হঠাৎ বিপ্লবদার সাথে দেখা।
উনার সাথে শেষবার দেখা হয়েছিল উনার বাসায়। সেবার সাজেদার বিপ্লবদার মধ্যে কোয়ান্টাম ফিজিক্স নিয়ে যা বিতর্ক হয়েছিল দেখার মত। বিতর্কে বিপ্লব দা সাজিদের কাছে গো-হারা হেরে ছিল। সেটা ভাবতেই এখনো আমার পৈশাচিক আনন্দ হয়।
আমাদের দেখেই বিপ্লবদা হেসে দিলেন। কিছু কথাবার্তা বললেন।
এর মধ্যে হঠাৎ করে বৃষ্টি চলে এলো। আকাশে সূর্যি মামা তখনো বহাল তবিয়তে জ্বলজ্বল করছে। আর ওদিকে বৃষ্টি বিশাল বিশাল ফোঁটা। গ্রাম্য লোকজনের কাছে এই বৃষ্টির একটি মজার ব্যাখ্যা আছে। তারা বলে, শিয়ালের বিয়ে হলে এরকম বৃষ্টি হয়। রোদের মধ্যেই বৃষ্টি। শিয়াল প্রজাতির মধ্যে বিয়ের প্রচলন আছে কিনা কে জানে।
-বিপ্লব দা সহ আমরা ক্যান্টিনে ঢুকলাম। বৃষ্টি কমলে বেরুতে হবে।
সাজিদ তিন কাপ চা অর্ডার করল। এরপর বিপ্লব দা’র দিকে তাকিয়ে বলল, -‘দাদা ভাই চা খেতে অসুবিধা নেই তো?’
-‘না না, ইটস ওকে।’ বিপ্লব দা উত্তরে বললো।
এরপর আবার বিপ্লব দা বলল, ‘সাজিদ, তোমার সাথে একটি ব্যাপারে আলাপ করার ছিল।’
ততক্ষণে চা চলে এসেছে। বৃষ্টির মধ্যে গরম গরম ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুক দেবার ফ্লেভারটাই অন্যরকম। সাজিদ তার কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল, ‘হ্যাঁ দাদা, বলুন। কোন টপিক?’
বিপ্লব দা বলল, -‘ওই যে, তোমরা যে বইটাকে স্রষ্টার বানী বলো, সেটা নিয়ে। কোরআন’
সাজিদ বলল, -‘সমস্যা নেই, বলুন কি বলবেন?’
বিপ্লব দা বললেন, -‘কুরআনে একটা সূরা আছে। সূরাটার নাম বাকরা।’
সাজিদ বলল, -‘সূরাটার নাম বাকরা নয়, বাকারা। বাকারা অর্থ ‘গাভী’ ইংরেজিতে ‘The cow’…..
-‘ওই আর কি। এই সূরার ৬-৭ নাম্বার লাইনগুলো তুমি কি পড়েছ?’
-‘ পুরো কোরআনই আমরা মাসে কয়েকবার পড়ি। এটা মার্কস কিংবা প্লেটো’র রচনা নয় যে একবার পড়া হয়ে গেলেই শেলফে আজীবনের জন্য সাজিয়ে রাখব।’
বিপ্লবদা বললেন, ‘এই লাইনগুলোতে বলা হয়েছে-
“ Verily, those who disbelieve, it is the same to them whether you warn them or do not warn them, they will not believe .
Allah has set a seal on their hearts and on their hearings, and on their eyes there is a covering. Theirs will be a great torment” –Baqara 6-7..
এরপর বিপ্লব দা সেটার বাংলা অর্থ করে বললেন, –
“নিশ্চয়ই যারা অস্বীকার করে, তাদের আপনি সাবধান করুন আর না-ই করুন, তারা স্বীকার করবে না। আল্লাহ তাদের হৃদয়ে এবং তাদের কর্ণকুহরে মোহর মেরে দিয়েছেন; তাদের দৃষ্টির উপর আবরণ টেনে দিয়েছেন। তাদের জন্য আছে ভয়াবহ শাস্তি। ”
