আমি আবার হাসলাম । আমার হাতে স্যারের লিখে দেওয়া কাগজটি তখনো ধরা ছিল । আমি সেটা স্যারকে দেখিয়ে বললাম,’স্যার, এই কাগজে কারা কারা ফাস্ট ক্লাশ পাবে, আর কারা কারা সেকেন্ড ক্লাশ পাবে, তাদের নাম লেখা আছে । তাহলে এই কাগজের ভিত্তিতেই রেজাল্ট দিয়ে দিন । বাড়তি করে পরিক্ষা নিচ্ছেন কেন ?’
স্যার বললেন,’পরিক্ষা না নিলে হয়তো এই বলে অভিযোগ করতে পারে যে, – স্যার আমাকে ইচ্ছা করেই সেকেন্ড ক্লাশ দিয়েছে । পরিক্ষা দিলে হয়তো আমি ঠিকই ফাস্ট ক্লাশ পেতাম । ‘
আমি বললাম,’একদম তাই স্যার । স্রষ্টাও এজন্যই পরিক্ষা নিচ্ছেন, যাতে কেউ বলতে না পারে – দুনিয়ায় পরিক্ষার ব্যাবস্থা থাকলে আমি অবশ্যই আজকে জান্নাতে থাকতাম । স্রষ্টা ইচ্ছা করেই আমাকে জাহান্নামে পাঠিয়েছে । ‘
ক্লাশের সবাই হাত তালি দিতে শুরু করলো । স্যার বললেন,’সাজিদ, আই হ্যাভ এ লাস্ট কোয়েশ্চান । ‘
-‘ডেফিনেইটলি, স্যার । ‘ আমি বললাম ।
-‘আচ্ছা, যে মানুষ পুরো জীবনে খারাপ কাজ বেশি করে, সে অন্তত কিছু না কিছু ভালো কাজ তো করে, তাই না ?’
-‘জি স্যার’
-‘তাহলে, এই ভালো কাজগুলোর জন্য হলেও তো তার জান্নাতে যাওয়া দরকার, তাই না ?’
আমি বললাম,’স্যার, পানি কিভাবে তৈরি হয় ?’
স্যার আবার অবাক হলেন । হয়তো বলতে যাচ্ছিলেন যে, এই প্রশ্নটাও আউট অফ কনট্যাক্সট, কিন্তু কি ভেবে যেন চুপসে গেলেন । বললেন,’দুই ভাগ হাইড্রোজেন আর এক ভাগ অক্সিজেনের সংমিশ্রণে । ‘
আমি বললাম,’আপনি এক ভাগ হাইড্রোজেন আর এক ভাগ অক্সিজেন দিয়ে পানি তৈরি করতে পারবেন ?’
-‘কখনোই না । ‘
-‘ঠিক সেভাবে, এক ভাগ ভালো কাজ আর এক ভাগ মন্দ কাজে জান্নাত পাওয়া যায় না । জান্নাত পেতে হলে হয় তিন ভাগই ভালো কাজ হতে হবে, নতুবা দুই ভাগ ভালো কাজ, এক ভাগ মন্দ কাজ হতে হবে । অর্থাৎ, ভালো কাজের পাল্লা ভারী হওয়া আবশ্যক । ‘
সেদিন আর কোন প্রশ্ন স্যার আমাকে করেন নি ।
-এক নিঃশ্বাসে পুরোটা পড়ে ফেললাম । কোথাও একটু থমিনি । পড়া শেষে যেই মাত্র সাজিদের ডায়েরিটা বন্ধ করতে যাবো, অমনি দেখলাম, পেছন থেকে সাজিদ এসে আমার কান মলে ধরেছে । সে বলল,’তুই তো সাংঘাতিক লেভেলের চোর । ‘
আমি হেসে বললাম, -‘হা হা হা । স্যারকে তো ভালো জব্দ করেছিস ব্যাটা । ‘
কথাটা সে কানে নিলো বলে মনে হল না । নিজের সম্পর্কে কোন কমপ্লিমেন্টই সে আমলে নেয় না । গামছায় মুখ মুছতে মুছতে সে খাটের উপর শুয়ে পড়লো ।
আমি তার কাঁধে হাত রাখলাম । বললাম,’সাজিদ,………..’
-‘হু’
-‘একটা কথা বলব ?’
-‘বল’
-‘জানিস, এক সময় যুবকেরা হিমু হতে চাইতো । হলুদ পাঞ্জাবী গায়ে দিয়ে, মরুভূমির গর্ত খুড়ে জ্যোৎস্না দেখার স্বপ্ন দেখত । দেখিস, এমন একদিন আসবে, যেদিন যুবকেরা সাজিদ হতে চাইবে । ঠিক তোর মতো । …’
এই বলে আমি সাজিদের দিকে তাকালাম । দেখলাম, ততক্ষনে সে ঘুমিয়ে পড়েছে । অঘোর ঘুম …………..
তাদের অন্তরে আল্লাহ মোহর মেরে দেন; সত্যিই কি তাই?
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীতে বসে বই পড়ছিলাম।
সজিদ পড়ছিল এন্থনি মাসকারেনহাস এর বই, -‘The legacy of blood’।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ওপর বিদেশী সাংবাদিকদের লেখা বই। সাজিদের অনেক দিনের ইচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের উপর একটা ডকুমেন্টারি তৈরি করবে। তাই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত বই আছে সব খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ছে সে।
আমি অবশ্য সাজিদকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য রয়ে গেছি। এসব বই পড়ার ব্যাপারে আমার যথেষ্ট অনিহা আছে। থার্ড পিরিয়ডে সাজিদ ফোন করে বলল ক্লাশ শেষে যেন ওর সাথে দেখা করি। দেখা করতে এসে আটকে গেছি। সোজা নিয়ে এলো লাইব্রেরীতে। মোটা মোটা বই গুলো নিয়ে সে বসে পড়েছে। খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছে আর গুরুত্বপূর্ণ লাইন গুলো ডায়েরিতে ঠুকে নিচ্ছে।
আমি আর কি করবো? সাজিদকে মুখের উপর ‘তুই বসে থাক’ বলে চলে আসা যাবেনা। তাহলেই হয়েছে।
আমি ঘুরে ঘুরে শেলফে সাজিয়ে রাখা বইগুলো দেখছি। হুমায়ূন আহাম্মেদের একটি বই হাতে নিলাম। বইটির নাম ‘দীঘির জলে কার ছায়া গো’।
হুমায়ূন আহমেদ নামের এই ভদ্রলোক বাংলাদেশে বেশ জনপ্রিয় লেখক। যদিও উনার তেমন বই আমি পড়ি নি, কিন্তু সাজিদের মুখে উনার বেশ প্রশংসা শুনি। উনার বেশ কিছু কাল জয়ী চরিত্র আছে। একবার নাকি উনার নাটকের একটি প্লট পাল্টানোর জন্য মানুষ মিছিল নিয়েও বেরিয়েছিল। বাব্বা কি সাংঘাতিক।
‘দীঘির জলে কার ছায়া গো’ নামের বইটি উল্টাতে লাগলাম। উল্টাতে উল্টাতে একটি জায়গায় আমার চোখ আটকে গেল। বিবর্তনবাদের জনক চার্লস ডারউইন এর ব্যাপারে কিছু একটা লেখা। পড়তে শুরু করলাম –
‘আহসানকে পেয়ে শওকত সাহেব আনন্দিত। তিনি নতুন একটা বই পড়ছেন।
বইয়ে বিবর্তনবাদের জনক ডারউইন সাহেবকে ধরাশায়ী করা হয়েছে। তার পূর্বপুরুষ বানর -এটা তিনি মেনে নিতেই পারতেন না। এখন সমস্যার সমাধান হয়েছে। তিনি আহসানের দিকে ঝুকে এসে বললেন, ‘তুমি ডারউইনবাদে বিশ্বাস করো?’
আহসান বলল, – ‘জ্বি চাচা, করি।’
-‘তোমার বিশ্বাস তুমি এখন যে কোন একটা ভালো ডাস্টবিন দেখে ফেলে আসতে পারো’
আহসান বলল, – ‘জি, আচ্ছা করি।’
-‘পুরো বিষয়টা না শুনেই জি আচ্ছা বলবে না। আগে পুরো বিষয়টা শোনো।’
