অতৃপ্তি ও কৌতূহল এবং শোনা-কথায় সন্দেহ ও অনাস্থাই জিজ্ঞাসার জনক। এজন্যে উদ্যমশীলতার প্রয়োজন। আবার সে-উদ্যম আসে নতুন আকাঙ্ক্ষা আর বিরুদ্ধ শক্তির প্রতিরোধ প্রয়োজন, সুখবাঞ্ছ ও জীবনস্বপ্ন থেকে। যে বাহীন, স্বপ্নহীন তার পক্ষে জিজ্ঞাসা জিইয়ে রাখা ও জবাব খোঁজার প্রয়াসী হওয়া অসম্ভব। তাই সে প্রশ্নহীন, গতানুগতিকতায় সে অভ্যস্ত ও নিশ্চিন্ত এবং বিশ্বাসে আশ্বস্ত। এরা বদ্ধজীব, এদের মন-আত্মা বন্ধক রয়েছে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া আজন্ম লালিত বিশ্বাস-সংস্কারে। এরা পুরোনো ধর্মে, জীর্ণসমাজে, হৃতউপযোগ আদর্শে ও বাড় বৈচিত্র্যহীন জীবনযাত্রায় স্বস্তি খোঁজে পরমনির্ভরতায়। এগুলোকে বিপদে-সম্পদে জীবনের নিরাপদ আশ্রয় বলেই তারা জানে। দুর্বল ও জিজ্ঞাসাহীন মনের প্রশ্রয়ে বিশ্বাস-সংস্কার বুনোলতা কিংবা অশ্বথ-শিকড়ের মতো মানুষের মন-বুদ্ধি-আত্মাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে জীনতা আনে জীবনে, এমন মানুষ কেবলই প্রাণী–নিয়তিবাদী পোষমানা প্রাণী, তার না আছে জিজ্ঞাসা, না আছে বিদ্রোহ করবার মতো মন। সব মানুষে জিজ্ঞাসার তীব্রতা নেই বটে, কিন্তু সব মানুষই ভোগলি ও আরামপ্রিয়। উদ্যমহীন মানুষ সুখের ও ভোগের স্বপ্ন দেখে এবং তারা যে-কোনো স্বপ্নের বাস্তবায়ন চায় কৃত্রিম ও অলৌকিক উপায়ে। তাই সে দৈব-নির্ভর, কল্পনাপ্রিয় এবং নিষ্ক্রিয়। সে আধিদৈবিক কিংবা আধ্যাত্মিক শক্তিবলে সাধের ও স্বপ্নের ভোগ্যবস্তু হাতের মুঠোয় পেতে অভিলাষী। এক্ষেত্রেও সে পরনির্ভরশীল এবং পরসম্পদজীবী।
কেননা সে দৈবশক্তি অর্জনে কিংবা অধ্যাত্মবিদ্যায় ও সাধনায় সিদ্ধিলাভে প্রয়াসী নয়। সে পীর-ফকির, সাধু-সন্ন্যাসীর অনুগ্রহ, তুকতাক, দারুটোনা, তাবিজ-কবচ অথবা ঝাড়-ফুঁকের বদৌলতে ও কেরামতিপ্রভাবে বাঞ্ছসিদ্ধি কামনা করে। এই নিষ্ক্রিয় দলের জীবন-স্বপ্ন মানুষকে করেছে কল্পনাবিলাসী-ভূত-প্রেত-দেও-দানব-গন্ধর্ব-পরী অঙ্গরা তাদেরই কল্পনোক সহচর। মন্ত্রবলে আকাশে উড়তে কিংবা পাতালে প্রবেশ করতে, নদ-নদী উল্লম্বনে অথবা মরু-কান্তার উত্তরণে বাধা নেই কোথাও সেই কল্পনা ও বাসনার জগতে। রূপকথা, উপকথা, ধর্মকথা, পুরাণকথা প্রভৃতি এদেরই সৃষ্টি।
যারা উদ্যমশীল তারা জ্ঞান, বুদ্ধি ও আত্মপ্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসে বাস্তবক্ষেত্রে বাঞ্ছসিদ্ধির উপায় উদ্ভাবনে। তারা আকাশে উড়বার যন্ত্র, পাতালের খবর জানার কৌশল, সাগরতলা দেখবার দৃষ্টি, রোগ নিরাময়ের নিদান, কর্মে সাফল্যের কল এবং অন্যান্য বাঞ্ছসিদ্ধির সামর্থ্য অর্জনে হয় ব্রতী। এই মানুষের দ্বারাই বৈষয়িক জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য দান সম্ভব হয়েছে। এরাই করেছে প্রয়োজনীয় সব বস্তু আবিষ্কার ও নির্মাণ। শস্য-উৎপাদন অথবা মৃতে প্রাণসঞ্চার থেকে আণবিক শক্তি সন্ধান কিংবা গ্রহলোকে গমন অবধি সবকিছুই উদ্যমশীল আত্মপ্রত্যয়ী মানুষের দান। এরাই মিটিয়েছে অলস মানুষের সুখ-স্বপ্ন ও সাধ।
আজ উদ্যমশীলতা ও আত্মপ্রত্যয় প্রতীচ্যের সম্পদ আর উদ্যমহীনতা ও দৈব নির্ভরতায় প্রাচ্য মানবের পরিচয়। প্রাচ্যে যা কল্পনা, পাশ্চাত্যে তা-ই বাস্তব; প্রাচ্যে যা আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্য, প্রতীচ্যে তা-ই যান্ত্রিক সম্পদ। এ পার্থক্যের মূলে রয়েছে প্রতীচ্য মানুষের শোনা-কথায় সন্দেহ ও অনাস্থা এবং কৌতূহল, জিজ্ঞাসা, আত্মবিশ্বাস, উদ্যম ও অবিরাম প্রয়াস; আর প্রাচ্য-মানবের প্রয়াসহীন প্রাপ্তি-লিপ্সা, আজন্ম লালিত বিশ্বাস- সংস্কারে নিষ্ঠা, প্রশ্নহীন প্রত্যয় এবং আত্মসামর্থ্যে অনাস্থা। জিজ্ঞাসার ও আকাক্ষার, আত্মপ্রত্যয়ের ও উদ্যমের মেলবন্ধন না হলে জীবনে ও জীবিকায়, মনে ও মানসে যে- জীর্ণতা আসে তা থেকে হাজার হাজার বছরেও যে ব্যক্তির বা সমাজের মুক্তি ঘটে না, তার সাক্ষ্য আফ্রো-এশিয়ায় অনুন্নত ও আরণ্য সমাজ।
অতৃপ্তি, কৌতূহল, অনবরত নতুন নতুন জিজ্ঞাসা ও উত্তর সন্ধানের অক্লান্ত উদ্যমই মানুষকে প্রগতি দান করে। সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ ও প্রসারের মূলে রয়েছে এ জিজ্ঞাসা ও উদ্যম। অতএব পুরানো-প্রীতি পরিহার করে নতুনের স্বপ্নে ও আকাঙ্ক্ষায় মন ও মননকে জাগিয়ে তুলতে না পারলে সন্ধানী ও সৃজনশীল হওয়া, সংস্কৃতি ও সভ্যতা সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না কারো পক্ষে।
গোড়াতেই বলেছি, জিজ্ঞাসা একটি মানবিক বৃত্তি। এর জাগর আছে, সুপ্তি আছে, মৃত্যু নেই। আমাদের জিজ্ঞাসাবৃত্তি অনেক অনেক কাল ধরে সুপ্ত। তাই আমরা আজ অনুকারক ও প্রতীচ্য-নির্ভর। আমাদের জিজ্ঞাসা-বৃত্তি উদ্দীপিত না করলে আমরা কখনো সুস্থ ও সুস্থ হয়ে স্বকীয়তার ঔজ্জ্বল্যে ও মহিমায় আত্মনির্ভর ও আত্মসম্মানসম্পন্ন মানুষ হয়ে উঠতে পারব না।
এ অসাধ্য-দুঃসাধ্য কোনো সাধনা নয়। অভিপ্রায় সাংকল্পিক দৃঢ়তা পেলেই আমরা সফল হব। কেননা মানুষের সামর্থ্য হচ্ছে কচুগাছের মতোই, সে সুপ্তিতে অদৃশ্য হয় বটে কিন্তু জাগরে আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। প্রাণশক্তির অজস্রতায় সে দেহে পায় পুষ্টি ও লাবণ্য।
জাতির জীবনে এমনি নধর-কান্তি নিয়ে আসে জিজ্ঞাসা ও উদ্যম। তৃপ্তমন্য ও কাক্ষাহীন, নিরুদ্যম ও প্রশ্নহীন জাতিও মরে না, জীর্ণ জীবনের দুর্ভোগই তার নিয়তি হয়ে ঘাড়ে চাপে মাত্র। কার্য-কারণ সচেতন হলেই জাতির দুর্ভোগ ঘোচে। নতুন চেতনার প্রসাদ পেয়ে সে আবার প্রাণের পূর্ণতা অনুভব করে, ধন্য হয় নিজে, ধন্য করে তার প্রতিবেশকে।
জীবনের নিয়ামক
আদিকাল থেকে মানুষ দৈবশক্তির অস্তিত্বে আস্থা রেখেছে এবং নিজের ভাগ্যকে সে- শক্তির সঙ্গে করেছে যুক্ত। যে যত বেশি দুর্বল, অসহায় ও অসমর্থ; তার জীবনে দৈব-শক্তির প্রভাবও তত অধিক। জীবনে রয়েছে নানা প্রয়োজন, নানা অভাব এবং তা বাঞ্ছ বা আশা-আকাঙ্ক্ষা রূপে মনের কোণে জেগে থাকে। যা চাওয়া হয় তা পাওয়া যায় না। চাওয়া-পাওয়ার মধ্যেকার ব্যবধান ঘোচানো যখন সাধ্যাতীত বলে নিশ্চিত ধারণা জন্মায় অথচ প্রাপ্তির বা কোনোমতেই মন থেকে মুছে ফেলা যায় না, তখন বাঞ্ছর তীব্রতা মনের মধ্যে জাগায় একপ্রকার স্বপ্ন কিংবা কল্পনা –যা যুক্তি, বুদ্ধি অথবা দৃষ্টিগ্রাহ্য উপায়বোধের অতীত। কোনো অলৌকিক উপায়ে কোনো অদৃশ্য শক্তির সাহায্যে যদি আমার বাঞ্ছ সিদ্ধি হত –এমনি মানস অবস্থা থেকে দৈবশক্তির উদ্ভব। যেখানে সাধ্য-সামর্থ্যের শেষ, সেখান থেকেই কামনার উদ্ভব, আর এই কামনার আশ্রয়েই দৈবশক্তির উদ্ভব ও বিকাশ। অতএব সাধ্যাতীত লিপ্সর প্রশ্রয়ে কামনার জন্ম, এবং কামনা-পূর্তির সহায় হিসেবে অলৌকিক অদৃশ্য সত্তার আবির্ভাব ও স্থিতি। জীবনের মৌল বাঞ্ছ দুটো–আত্মরক্ষা ও আত্মপ্রসার, জীবনের নিরাপত্তা ও জীবিকার সংস্থান। দুটোর কোনোটাই নির্বিঘ্ন নয়। তাই অদৃশ্য শক্তির সহায়তা আবশ্যক। আদিম মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি ও কল্পনা ছিল কম; তাই সর্বপ্রাণবাদ, জাদুবিশ্বাস প্রভৃতি দিয়ে তার জীবনযাত্রার শুরু।
