প্রবন্ধ সুচিন্তিত, সুযৌক্তিক ও সুলিখিত হবে বটে, কিন্তু সাহিত্য হওয়া জরুরি নয়। কেননা প্রবন্ধ হচ্ছে চিন্তার ও যুক্তির প্রসূন-গরজের সৃষ্টি। তাই সমকালীন সমাজজীবনের ও জীবিকার যে- কোনো বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ রচিত হতে পারে এবং হয়ও। জ্ঞানগর্ভ ও নৈতিক-তাত্ত্বিক প্রবন্ধই কেবল দীর্ঘায়ুর দাবীদার। অবশ্য জ্ঞান পূর্ণসাপেক্ষ আর নীতিচেতনা এবং তত্ত্ববোধও আপেক্ষিক এবং সে কারণে পরিবর্তনশীল। যেমন চুরি করা অপরাধ; তার শাস্তি হস্ত কর্তন। কিন্তু আজকের মানববাদীর চোখে বুভুক্ষুর ভাতচুরি নিঃস্বর পয়সা চুরি–অপরাধ হতে পারে না। অভাবজাত চুরি অপরাধ নয়, স্বভাবজাত চৌর্যই অপরাধ। কাজেই হস্ত কর্তন করতে হবে ঘুসখোর পদস্থকর্মচারীর, গরিব চোরের নয়। অর্থাৎ যে-অভাবের ও যে-বেকারত্বের কারণে মানুষ চৌর্যবৃত্তি গ্রহণ করে, সমাজ-পরিবেশে সেই আর্থিক অসাচ্ছল্যের অনুপস্থিতির পরও যদি কেউ চোর হয়, তাহলেই হস্ত কর্তন ন্যায়সিদ্ধ। অন্যথায় তা হবে অমানুষিক অযৌক্তিক বর্বরতা। আবার ভূগর্ভ সমুদ্র আকাশ নক্ষত্র চন্দ্র জল বায়ু নীতি রাষ্ট্র প্রভৃতি সম্পর্কিত পূর্বজ্ঞানের তথ্যগত অপূর্ণতাই এ সম্বন্ধীয় পূর্ববর্তী রচনাকে পরিত্যাজ্য করে। অতএব কোনো বিষয়ক প্রবন্ধই স্থায়ী সাহিত্যের মর্যাদা পাবে না। অবশ্য কালান্তরে মানুষের ভাষা, ভঙ্গি ও চেতনা বদলায় বলে সৃজনশীল সাহিত্যও অবিনশ্বর হয় না। যদি সাহিত্যগুণও থাকে তাহলেও বক্তব্যের সাময়িকতা তাকে স্বল্পায়ু করবে। শিল্পগুণের ও বক্তব্যের চিরন্তনত্বের সহ-স্থিতি সুদুর্লভ মহামুহূর্তের দান। তেমন প্রবন্ধ অবশ্যই স্থায়ী সাহিত্য।
জিজ্ঞাসা
০১.
জিজ্ঞাসা জৈবিক বৃত্তি কিনা জানিনে, কিন্তু মানবিক যে তাতে সন্দেহ নেই। বলতে গেলে বিশেষ অর্থে ওটাই মানুষের RATIONALITY-র ভিত্তি, প্রাণিজগতে মানুষের Differentia. কেননা জিজ্ঞাসা থেকেই জ্ঞানের উদয়, চিন্তার উদ্ভব, অনুশীলন তথা বিকাশ। জিজ্ঞাসাই মানুষের সংস্কৃতি সভ্যতা বিকাশের মূল প্রেরণা। জিজ্ঞাসার অশেষ আকুতিই চিন্তা ও কর্মে প্রবর্তনা দেয়। এই জিজ্ঞাসাই কল্পনাজগতের উপর মানুষের আধিপত্যের কারণ এবং বিজ্ঞান-দর্শন-সাহিত্য-শিল্পাদি কলার জন্মদাতা। এক কথায় মানুষের যা-কিছু স্বকীয় তা জিজ্ঞাসার দান।
কার্যকারণ জানবার ইচ্ছাই জিজ্ঞাসা। কার্যের কারণ আবিষ্কারের কৌতূহল মানুষের স্বাভাবিক বৃত্তি। বলা চলে যে-কোনো ঘটনার পশ্চাতে অন্তত যেমন-তেমন একটা কারণ অনুমান করতে না পারলে বা না করে সে স্বস্তিবোধ করে না। যেমন পৃথিবী কখনো কখনো কেঁপে ওঠে নড়ে ওঠে। কিন্তু কেন? ভেবে ভেবে সে বের করল পৃথিবীটা সহস্রমুণ্ড নাগের মাথায় কিংবা গরুর শৃঙ্গে স্থাপিত। ভার যখন অসহ্য হয়ে ওঠে তখন নাগ বদলায় মাথা, গরু বদলায় শিঙ। এই স্থানান্তরের সময় কেঁপে ওঠে পৃথিবী, নড়ে ওঠে বিশ্বসংসার। এদের অসাবধানতার কিংবা বিরক্তির ফলে প্রলয়কাণ্ড ঘটে যায় কখনো কখনো। আরো পরে বিজ্ঞ মানুষ বুঝল ওরা ধর্মের অনুগত ও ধর্মের দাস। পাপাসক্ত মানুষের পাপের ভারই ওদের বিরক্তির কারণ।
আকাশে চাঁদ-সূর্য কেবল ঘোরে না, রাহু-কেতুর গ্রাসেও পড়ে। হয় তারা কোনো প্রবল দুরাত্মার কবলে পড়ে দুঃখ পায়, অথবা স্বকৃত অন্যায়ের শাস্তি ভোগ করে। স্বর্গলোক নিশ্চয়ই পায়ের তলায় থাকার কথা নয়; কাজেই আকাশে তার স্থিতি। অবশ্য স্বর্গ মানেও আকাশ। রাত্রে নির্জন প্রান্তরে আগুনের শিখা থাকবে কেন; নিশ্চয়ই এ ভূতের চেরাগ–আলেয়া। শূন্যতা তো ব্যর্থতারই লক্ষণ। পূর্ণতা যেমন সাফল্যের প্রতীক। অতএব শূন্য ঘট কিংবা কলসি দেখার পরে অভিষ্ট সিদ্ধ না-হওয়ারই কথা। তেমনি হাঁচি, কাশি, টিকটিকি, ডিম, ঝাটা, হোঁচট ও পিছুডাকা দুর্লক্ষণ বলে পরিচিত। কেননা কারো কারো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এই কাকতালীয় ন্যায়ের যাথার্থ্য প্রমাণের নিশ্চয়ই সহায়কও ছিল। প্রয়োজনের তাগিদ ও বাঞ্ছর তীব্রতা মানুষকে গুরুত্ব চেতনা দেয়, তখন অভীষ্টে অসিদ্ধি, প্রয়াসে ব্যর্থতা ও কর্মে অসাফল্য, দৈবিক কারণ সন্ধানে প্রবর্তনা দেয় মানুষকে। তখন প্রকৃতি ও পরিবেষ্টনী, বস্তু ও প্রাণী তার সাফল্য-ব্যর্থতার দৈব প্রতীক হয়ে ওঠে। উদ্দেশ্যবিহীন যাত্রায় কিংবা গুরুত্বহীন কর্মে অর্থাৎ লাভক্ষতির ভয়-ভরসা যেখানে নেই, সেখানে মানুষ শুভাশুভ সম্বন্ধে কিংবা দৈবানুকূল্য বা বিরূপতা সম্বন্ধে সচেতন থাকে না। যেমন গ্লাস থেকে যদি পানি পড়ে যায় তখন মানুষ তাতে অশুভ কিছু দেখে না। কিন্তু বহুতে আনা পড়া-পানি পড়ে যাওয়া নিশ্চয়ই দুর্ভাগ্যজ্ঞাপক। কিংবা পয়সার জিনিস একবাটি দুধ পড়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে দুর্লক্ষণ। শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সব সন্ধিস্থলেই অসংখ্য রেখা রয়েছে কিন্তু কোনো রেখারই কোনো তাৎপর্য নেই–কোনো রেখাই নিয়তি প্রতীক নয়–কেবল হাতের তালুর রেখারই আছে গুরুত্ব।
এমনি করে মানুষ তার জীবনের ও ভুবনের সবকিছুর কার্যকারণ সম্বন্ধ আবিষ্কার করে হয়েছে আশ্বস্ত ও নিশ্চিত।
.
০২.
জিজ্ঞাসাবৃত্তি মানুষের স্বাভাবিক বৃত্তি হলেও, জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন মানুষ পরমুখাপেক্ষী, পরশ্রমনির্ভর ও পরান্নজীবী, এক্ষেত্রেও তেমনি সাধারণত তারা অবহেলাপরায়ণ। কৌতূহল নিবৃত্তির জন্যে তারা অপরের বুদ্ধি, চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। পরের মুখে শুনেই তারা সন্তুষ্ট। নিজেরা ভেবেচিন্তে বিচার-বিশ্লেষণ করে কিছু যে বের করবে সে-ধৈর্য ও অধ্যবসায় তাদের নেই। এ ব্যাপারে তারা আশুতোষ। প্রয়াসবিহীন প্রাপ্তিতেই তাদের আনন্দ ও সন্তোষ। এই আলস্য ও অবহেলা মানুষের পক্ষে শুভ হয়নি। মানুষের মন্থর অগ্রগতির এ-ই মূল কারণ। বস্তুত পূর্বোক্ত স্তরেই রয়ে গেছে পৃথিবীর পনেরো আনা মানুষ। তারা চিরকালের জন্যে নিশ্চিত হয়েছে তাদের জিজ্ঞসার আপাত যৌক্তিক জবাব পেয়ে ও আপাত রম্য সমাধান নিয়ে। এজন্যে আদিম আরণ্য জীবন যেমন সুলভ, তেমনি যান্ত্রিক জীবন-চিন্তাও সভ্য-শহুরে মানুষে দুর্লভ নয়। ফলে অধিকাংশ মানুষ রয়ে গেছে মানবিকতার শৈশবে-বাল্যে। এবং তাদের মনে নতুন করে জিজ্ঞাসা না জাগলে আর সে-জিজ্ঞাসার জবাব নিজেরা মন-বুদ্ধি-জ্ঞান দিয়ে সন্ধান না করলে তাদের–মানুষের বাল্যাবস্থা কখনো ঘুচবে না। যে-দেশে বা যে-গোত্রে জিজ্ঞাসু মানুষের সংখ্যা বেশি সে-দেশে ও সে-গোত্রের সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মননের বিকাশ ত্বরান্বিত হয়েছে।
