তবে সেইসব পুথিপত্রে প্রাচীন বাংলা কাব্যের যে সম্পদ
আচ্ছা, ওখানকার আবহাওয়া কি স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল? বঙ্কিমবাবুর দৃষ্টি কড়িকাঠের দিকে নিবদ্ধ।
বর্ষাকালটাই যা একটু খারাপ। অন্য সময় তো খুবই ভাল। আপনার কপালকুণ্ডলা উপন্যাসে আপনি কাপালিকের যে চরিত্র এঁকেছেন—
কড়িকাঠের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেই বঙ্কিমবাবু বলে উঠলেন— ওখানে ধান চালের অবস্থা এখন কি রকম?
দীনেশবাবু বেশ একটু দমে গেলেও ওঁকে সাহিত্যের আলোচনায়-নামাবার চেষ্টা ছাড়লেন না। বললেন—ধান চাল ওখানে প্রচুর। আপনি বিষবৃক্ষ উপন্যাসে আমাদের সমাজে নারীর প্রেম সম্পর্কে যে সমস্যা তুলে ধরেছেন তার একটি সুন্দর সমাধান পাই বৈষ্ণব সাহিত্যে। চণ্ডীদাস এক জায়গায় বলেছেন–
খুব জরুরী জ্ঞাতব্য বিষয় এতক্ষণ জানা হয় নি অবিলম্বে জেনে নেওয়া দরকার—এমনি একটা ব্যস্ততা চোখে মুখে এনে দীনেশবাবুর কথা থামিয়ে বলে উঠলেন-দর কত বললেন না তো।
বেশ একটু ঘাবড়ে গিয়ে দীনেশবাবু বললেন—কিসের দর?
কেন, ওই ধানচালের?
এবার দীনেশবাবু সত্যি সত্যিই একেবারে কুঁকড়ে গেলেন। যতবার উনি সাহিত্য সম্বন্ধে আলাপ করতে চেষ্টা করেন, ততবারই বঙ্কিমবাবু সে-কথা এড়িয়ে গিয়ে শুধু ধানচাল, লোকসংখ্যা ইত্যাদি সম্বন্ধে প্রশ্ন করতে লাগলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের রচনা থেকে যে সব লাইন আলোচনা প্রসঙ্গে উদ্ধৃতি দিয়ে ইমপ্রেস করবেন বলে কণ্ঠস্থ করে এসেছিলেন সেগুলি একে একে মনে পড়তে লাগল। —ধীরে, রজনী ধীরে, অন্ধ অথচ কুঞ্চিত, বিকলা অথচ শীর্ণা, দূরাগত রাগিণীর ন্যায়, অবিকশিত কুসুম সুরভির ন্যায় রজনী ধীরে ধীরে জলে নামিতেছে। আবার মনে পড়ল সেই বিখ্যাত উক্তি—শোনন ওসমান, আবার বলি, এই বন্দী আমার প্রাণেশ্বর। কপালকুণ্ডলায় বঙ্কিমচন্দ্র যেখানে কাপালিকের বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন—অগ্নিদেব যাহার পা দুখানিকে কাষ্ঠভ্রমে চিবাইতে আরম্ভ করিয়াছিলেন, কিছুমাত্র রস না পাইয়া অর্ধদগ্ধ অবস্থায় ফেলিয়া গিয়াছেন। আবার মনে পড়ল—নির্জন সমুদ্রতীরে কপালকুণ্ডলার বীণাকণ্ঠ ধ্বনি—পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ?
শুধু কি তাই? গয়টের ফাউস্ট আর শিলারের এপিসাইকিন থেকে যে-সব কবিতার অনর্গল উদ্ধৃতি দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রকে নিজের বিক্রম দেখাবেন বলে গত চারদিন আহার-নিদ্রা ত্যাগ করে এত পরিশ্রম করলেন, সে সবই কি ব্যর্থ হবে? হতাশায় ক্ষোভে দুঃখে দীনেশবাবুর চোখ ছলছল করে উঠল। মুখে একটা বজ্রকঠিন গাম্ভীর্য এনে বঙ্কিমবাবু তখনও জানালার বাইরে নিম গাছটার কচি পাতার দিকে চেয়ে আছেন।
শেষ চেষ্টার সঙ্কল্প নিয়ে দীনেশবাবু প্রশ্ন করলেন-চণ্ডীদাস, বিদ্যাপতি ও গোবিন্দ দাসের মধ্যে আপনি কাকে গীতি-কবিতার শ্রেষ্ঠ কবি বলে মনে করেন?
বঙ্কিমবাবু জানালার বাইরে দৃষ্টিনিবদ্ধ রেখেই বললেন–দুধ?
দীনেশবাবু এবার হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। গীতি-কবিতার সঙ্গে দুধের কি সম্পর্ক।
প্রশ্নটা ধরতে পারছেন না মনে করেই বঙ্কিমবাবু ভোলা করে বললেন–ওখানকার দুধের দর এখন কত তা তো বললেন না।
বাঙালের রাগ কতক্ষণ আর দমিয়ে রাখা যায়। ফোঁস করে উঠলেন দীনেশবাবু। বললেন–দেখুন, আপনি বোধ হয় আমার পদ্মাপারের কথার টানে এবং চেহারা দেখে মনে করেছেন আমি একটি কৃষক যুবক; সুতরাং লাঙ্গল গরু চাষাবাদ ছাড়া আর কোন বিষয়ে আলোচনার আমি মোগ্য নই। আপনার ধারণা ভুল।
গম্ভীর হয়ে বঙ্কিমবাবু বললেন—আমার ধারণার কথা ছেড়ে দিন। আপনার ধারণা যাতে ভুল না হয় সেইজন্য আমি সাহিত্য নিয়ে আলোচনায় পারতপক্ষে নাবি নি।
অবাক হয়ে দীনেশবাবু বললেন–তার মানে?
মানে অতি সরল। বাইরে থেকে আপনাদের ধারণা আমি একজন মহাপণ্ডিত ব্যক্তি। ধারণাটা যাতে মিথ্যে না হয়, সেইজন্যই পণ্ডিতি আলোচনায় মুখ খুলি না। তাছাড়া আপনাদের উদ্দেশ্য ছিল আমাকে দেখবার, আমার সঙ্গে বসে সাহিত্য আলোচনার নয়।
–যদি সাহিত্য আলোচনার উদ্দেশ্যই জানতাম?
তাহলে বলে দিতাম বঙ্কিমবাবু বাড়ি নেই।
কী সাংঘাতিক কৃথা! দীনেশবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন বঙ্কিমবাবুর দিকে, আর বঙ্কিমবাবু জানলার বাইরে দূর আকাশের দিকে নির্বিকার দৃষ্টি মেলে স্থির হয়ে বসে আছেন। আর মতিলাল? তার অবস্থা না বলাই ভাল।
মিনিট খানেক অস্বস্তিকর নীরবতার পর দীনেশবাবু চেয়ার থেকে উঠে পড়ে বললেন–আমরা এখন চললাম। অযথা আপনার খানিকটা সময় নষ্ট করেছি, মার্জনা করবেন।
বিদায় নেবার সময় পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে গেলে বাধা দিয়ে বঙ্কিমবাবু বললেন–এসে ছিলেন শ্রদ্ধা জানাতে, ফিরে যাচ্ছেন অশ্রদ্ধা নিয়ে। সুতরাং পা ছুঁয়ে প্রণাম করে আর আমার অপরাধ বাড়াবেন না।
এমন বিফল সাক্ষাৎকার দীনেশবাবুর জীবনে আর কখনও ঘটে নি এবং কল্পনাও করতে পারেন নি। গ্রীষ্মকালের অপরাহ্নের পিচগলা রাস্তায় নেমে দীনেশবাবু হনহন করে হেঁটে চলেছেন, পিছনে রয়েছে মুষড়ে-পড়া মতিলাল।
২১. জগদীশ গুপ্তর কথা
আজ আমি আপনাদের কাছে এমন একজন লেখকের কথা বলতে বসেছি যিনি একদিকে রবীন্দ্র-প্রভাত-শরৎচন্দ্র ও অপর দিকে শৈলজা-প্রেমেন্দ্র অচিন্ত্যকুমারের মাঝখানে সেতু স্বরূপ বাংলার সাহিত্যাকাশে আবির্ভূত হয়ে চিরকালের জন্য বিদায় নিয়েছেন। আমি অসাধু সিদ্ধার্থ, রোমন্থন ইত্যাদি গ্রন্থের লেখক জগদীশ গুপ্তর কথাই বলছি। এর রচনার সঙ্গে আপনাদের পরিচয় অল্পবিস্তর থাকলেও থাকতে পারে, লেখকের সঙ্গে পরিচয় বোধ হয় নেই। থাকবার কথাও নয়। সাহিত্যের পীঠস্থান কলকাতা মহানগরী থেকে শত মাইল দূরে ক্ষুদ্র এক মফস্বল শহরে সাহিত্যের নিভৃত সাধনাই তিনি করে এসেছেন। নির্লজ্জ আত্মপ্রচারের যুগে সাহিত্যের সাধনায় এমন নিষ্কাম নিষ্ঠা সচরাচর দেখা যায় না। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে এই যে, লেখক হওয়ার কোন প্রবল তাড়না ওঁর মধ্যে ছিল না, সাহিত্যিক খ্যাতি লাভের বাসনা তো নয়-ই। তবু তাকে লেখক হতে হয়েছিল আকস্মিক কারণে। লেখক-হওয়াটা ওঁর জীবনে একটা অ্যাসিডেন্ট ছাড়া আর কিছুই নয়, সেই কাহিনীই আজ আপনাদের বলতে বসেছি।
