একদিন জিদ নিৰ্ভয়ে যেচে গিয়ে ওয়াইলডের সঙ্গে দেখা করেছিলেন লোকনিন্দার পরোয়া না করে, এবং আশ্চর্য তাই নিয়ে তিনি বিন্দুমাত্র গর্ব করেন নি এবং আরো যখন অন্যায় আচরণ করলেন তখনও সেটা লুকোলেন না। শুধু তাই নয়, পাঠক যাতে অতি নির্মমভাবেই তাঁর মাথায় ঘোল ঢালতে পারে তাই কোনো প্রকারের অজুহাত বা আত্মনিন্দাও পেশ করলেন না।
কি উপন্যাস, কি ছোট গল্প, কি জুর্নাল, সর্বত্রই জিদ। এই আশ্চর্য সাধুতা দেখিয়েছেন।*
——-
* Andre Gide : Oscar Wilde. In memoriam, Paris, Mercure de France.
জয়হে ভারতভাগ্যবিধাতা
ম্যাট্রিক পাশের লিস্টে নাম দেখে। যেমন ইয়া আল্লা’ বলে ছেলে-ছোকরার লম্ফ দিয়ে ওঠে আমাদের অখণ্ড স্বরাজলাভের আনন্দোল্লাস তার সঙ্গে তুলনীয়। এমন কি, ম্যাট্রিকেও যদি পাঠকের মন সন্তুষ্ট না হয় তাহলে বি.এ. এম.এ. পি.এইচ. ডি. ডি. লিট যা খুশি বলতে পারেন তাতেও কোনো আপত্তি নেই। শুধু তাই নয়-এ স্বাধীনতা পাশের আনন্দ অন্য সব পাশের চেয়ে অনেক, অনেক বেশি। কারণ অন্য যে-কোনো পরীক্ষায় দু-একজনের ইয়ারবক্সী ফেল মারেনই মারেন— নিতান্ত পরশ্ৰীকান্তর এবং বিয়-সন্তোষী ব্যক্তি ভিন্ন অন্য কারোরই কোনো পরীক্ষা পাশ নিরঙ্কুশ আনন্দদায়ক হয় না—এ-পরীক্ষায় কিন্তু সবাই পাশ, সবাই রাজা। চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী আজ স্বাধীন হলেন, আপনিও হলেন, আমিও হলুম!
কিন্তু প্রশ্ন অতঃ কিম? অবশ্য বলতে পারেন। পরীক্ষা পাশ করে জ্ঞানার্জন হল এবং জ্ঞানার্জন স্বয়ংসম্পূর্ণ, আপন মহিমায় স্বপ্রতিষ্ঠিত। এর পর কিছু না করলেও কোনো আপত্তি নেই। এটা একটা উত্তর বটে কিন্তু কোনো জিনিস একদম কোনো কাজে লাগল না। এ-কথাটা ভেবে কেমন যেন সুখ পাওয়া যায় না। প্রবাদ আছে, ইট ইজ বেটার টু ব্রেক দি হার্ট ইন লাভ দেন ডু নাথিং উইথ ইট’–স্বাধীনতাটা কোনো কাজে লাগাব না একথা ভেবে মন কেমন যেন সুখ পায় না; বাসনা হয়, দেখাই যাক না, রাজনৈতিক স্বরাজের মই চড়ে আরো পাঁচ রকমের স্বরাজ হস্তগত হয় কি না; এ লোভ সকলেরই থাকবে সে-কথা হলপ করে বলা যায় না, কিন্তু অন্ততপক্ষে এ তত্ত্বটা স্বীকার করে নিতে হবে যে, পাশের পর লেখা-পড়া বন্ধ করে দিলে জ্ঞান যে রকম কপূরের মতো বিনা কারণেই উবে যেতে থাকে, স্বাধীনতাটাকেও তেমনি চালু না রাখলে ক্ৰমে ক্ৰমে সেও তার রূপ বদলাতে থাকে। স্বাধীনতা লাভের পরমুহূর্তেই যদি বেধড়ক ধর-পাকড় আরম্ভ করে দেন, মনে মনে ভাবেন পাঁচটা লোকের স্বাধীনতা কেড়ে নিলেই পাঁচশ লোকের স্বাধীনতার বাঁচা তো হয়ে যাবে। কিংবা যদি ব্যক্তি-স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে কালোবাজারীদের ল্যাম্পপোস্টে না ঝোলান। তবে শেষ পর্যন্ত আমাদের স্বরাজ লাভটা ঠিক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে আগেভাগে হলফ করে কিছু বলা যায় না।
হিটলারের পূর্বেও জর্মনি স্বাধীন ছিল কিন্তু জর্মনিকে সর্বাঙ্গসুন্দর স্বাধীনতা দিলেন হিটলার। লেনিনের পূর্বে রাশার জনসাধারণ স্বাধীনতার স্বাদ পায় নি, লেনিন এক ধাক্কায় গোটা দেশটাকে অনেকখানি এগিয়ে দিলেন। এখন আবার স্তালিন দেশটাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে এসেছেন যে এর পর কি হয় না হয় বলা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনিও হিটলারের গতি লাভ করবেন নাকি?
কাজেই ধরে নেওয়া যেতে পারে, আমাদের চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবার কোনো উপায় নেই-কিছু একটা করতেই হবে। স্বাধীনতার ঘোড়া চড়ি আর নাই চড়ি সেটাকে অন্তত বাঁচিয়ে রাখার জন্য দানা-পানির খর্চা হবেই হবে।
আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেকখানি বিলিতি ছিল বলে আমাদের স্বরাজলোভও অনেকখানি বিলিতি কায়দায় হয়েছে। এখনও আমাদের লাটবেলাটরা বিলিতি কায়দায় লঞ্চ-ডিনার খাওয়ান, পেরটি দেখেন, সেলুট নেন, এডিসি ফেডিসি কত ঝামেলা, কত বখেড়া। তাই স্বাধীনতা নিয়ে কি করব কথাটা উঠলেই গুণীরা বলেন, ‘ইয়োরোপ কি বলছে, কান পেতে শোনো তো; তারপর বিবেচনা করে ভালো-মন্দ যা হয় একটা কিছু করব।’
ইয়োরোপ কি বলছে সে বিষয়ে কারো মনে কোনো ধোঁকা নেই। ইয়োরোপ বলছে, ‘হয় মার্কিন ইংরেজের ডিমোক্রেসি গ্রহণ করে তাদের দলে যোগ দাও, নয়। লালরক্ত মেখে রুশের সঙ্গে এক হয়ে যাও। এ ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই।’
ক্ষীণকণ্ঠে কেউ কেউ বলেন, ‘কেন? টিটো?’
উত্তরে শুনি অট্টহাস্য। টিটো ইংরেজ বন্দুক-কামান কেনা-বেচার সমঝওতাও নাকি হয়ে গিয়েছে কিংবা হব-হব করছে। টিটো মিয়ার তৃতীয় পন্থা’ তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার মতো তিন দিনও টিকল না। তাকেও আস্তে আস্তে মার্কিন-ইংরেজের আস্তিন পাকড়ে এগোতে হচ্ছে।
এর পর আর কোন সাহসে ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ডের কথা তুলি?
এবং তার চেয়েও মারাত্মক হয়ে দাঁড়িয়েছে ইয়োরোপীয় সাহিত্যিক, চিত্রকর, কবি, দার্শনিকদের নিরঙ্কুশ নৈরাশ্যবাদ। ইংরেজি, ফরাসি, জর্মন, ইতালি যে কোনো মাসিক খুললেই দেখতে পাবেন ইয়োরোপের চিন্তাশীল ব্যক্তিই মাথায় হাত দিয়ে বলেছেন, ‘কোনো পন্থাই তো দেখতে পাচ্ছি নে-মার্কিনের দেখানো পথ মনঃপূত হয় না, রুশের পথই বা ধরি কি প্রকারে? মার্কিন ইংরেজের ‘ডিমোক্রেসি’ এমনিতেই শোষণ-পহী, তার উপর আমরা যদি তাদের সঙ্গে যোগ দিয়ে কমুনিজমকে নির্মূল করে দি তাহলে এখনো তারা রুশ জুজুর ভয়ে যেটুকু সমঝে চলত, চাষামজুরকে দুমুঠো অন্ন দিত। তাও আর দেবে না। আর রুশের কলমা পড়ে যদি মার্কিন ইংরেজকে সাবড়ে দিই তাহলে স্তালিনকে ঠেকাবে কে? যুগ যুগ সঞ্চিত ইয়োরোপের তাবৎ সভ্যতা তাবৎ সংস্কৃতিকে তো তিনি ‘বুর্জেয়া’ বলে নাকচ করে দিয়েছেন, এমন কি তাঁরা আপনজন ভাৰ্গ, ভাভিলফ, কলৎসফ হয় ‘পেনশনে’ নয় নির্বাসনে কিংবা মাটির নীচে। স্তালিন যদি বিশ্বজয় করতে পারেন তবে এ-দুনিয়াতে বাইবেল-কুরান, বেদ-পুরাণ তো থাকবেনই না, প্লাতো-শেকসপীিয়র থাকবেন। কিনা তাই নিয়ে অনায়াসে জল্পনা-কল্পনা করা যেতে পারে। আণ্ডা-মাখনের ছয়লাফ হয়তো হবে, কিন্তু এই পৃথিবীর লোক প্লাতে শেকস্পীয়র পড়তে পাবে না। শুনে স্তালিনী কলম পড়তে কিছুতেই মন মানে না।’
