আমাদের যাত্রাগান, কবির লড়াই সবই খোলামেলায়। এ যুগের প্রধান আমোদ ফুটবল ও ক্রিকেট খেলাতে। নিতান্ত সিনেমাটা ঘরের ভিতর। কিন্তু সিনেমাও চেষ্টা করে সেটা ভুলিয়ে দিতে। ঘড়ি ঘড়ি মাঠ-ময়দান, নদী পুকুর, পাহাড়-সমুদ্র দেখায় বলে খানিকক্ষণ পরেই ভুলে যাই যে, ঘরের ভিতর বন্ধ রয়েছি। তবুও পাছে অন্য কোনও খোলামেলার আমাদের সন্ধান পেয়ে আমরা পালিয়ে যাই তাই সিনেমাওলারা ওটাকে অ্যারকন্ডিশন করে মাঠ-রক-বৈঠকখানার চেয়েও আরামদায়ক করে রাখে। কারণ ইয়োরোপে যে মুহূর্তে ঘরে বসে টেলিভিশনের সাহায্যে সিনেমার আনন্দ পাওয়া গেল সঙ্গে সঙ্গে গ্রাহকের অভাবে আট থেকে দশ আনা পরিমাণ সিনেমা উঠে গেল।
আমাদের দেশের মেয়েরা হুট করে রাস্তায় বেরুতে পারে না, সিনেমা চায়ের দোকানে যেতে পারে না, তাই রেডিয়োটা ওদের কাছে এক বিধিদত্ত সওগাত। কর্তা-বাচ্চারা আপিস ইস্কুল চলে যাওয়ার পর তাঁরা নেয়ে খেয়ে চুল ঝুলিয়ে দিয়ে মুচড়ে দেন রেডিয়োর কানটা (পাশের বাড়ির রেডিয়োটা যে গাৰ্গা করে আপনার বিরক্তির উৎপাদন করে তার প্রধান কারণ ও-বাড়ির বউমা এ-ঘর ও-ঘর যেখানেই কাজ করুন না কেন, সেটা যাতে করে সর্বত্রই শুনতে পান তার জন্য ওটাকে চড়া সুরে বেঁধে রেখেছেন), মহিলা-মহল তো আছেই, তার পর সিংহল বেতারের বিস্তর ফিলিগানা যেগুলো বউমা, দিদিমণি সিনেমাতে একবার শুনেছিলেন, তখন বার বার শুনে শুনে কষ্ঠস্থ করতে চান।
পুরুষরা এদেশে যদিও-বা বেতার শোনে তবে সেটা খেয়ে-দেয়ে খবরটা শোনার জন্যে। এবং তার পরই আকাশবাণী আরম্ভ করে দেয় উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় কালোয়াতি সঙ্গীত। ওসবে কার, মশাই, ইনট্রেন্ট কিংবা হয়তো তখন ইংরেজিতে টক শুনলেন, মন্ত্রীমশাই বক্তৃতা দিচ্ছেন, জাপানের ড্রাই-ফার্মিং কিংবা জানজিবারের কোপারেটিভ সিসটেম সম্বন্ধে।
মেয়েরাই যে আকাশবাণী– অন্তত কলকাতা কেন্দ্রের মালিক সেকথা যদি বিশ্বাস করতে রাজি না হন তবে আমি আর একটি মোক্ষম প্রমাণ কাগজে কলমে পেশ করতে পারি।
বেতার-জগৎ পাক্ষিক পত্রিকাখানির বিজ্ঞাপনগুলো মন দিয়ে পড়লে দেখতে পাবেন তাতে আছে, গয়না, প্রসাধদ্রব্য, ভেজিটেবল ওয়েল, শাড়ি, কাপড়-কাঁচা সাবান। টাইয়ের বিজ্ঞাপন একটি আছে সেখানে এক তরুণী টাইটি পরিয়ে দিচ্ছেন তার প্রিয়জনকে, অর্থাৎ বিজ্ঞাপনটি মেয়েদের জন্যই। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক কথা–বইয়ের বিজ্ঞাপনটি প্রায় নেই। এবং দেশ পত্রিকাতে সেই জিনিসেরই ছয়লাপ। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, বেতার জগৎ মেয়েদের কাগজ, আর দেশ প্রধানত পুরুষের কাগজ।
ইয়োরোপের উচ্চতম শিক্ষিত লোকেরা বেতার শোনেন এবং তাদের চাপে বিবিসিকে একটি হাইব্রাও– উন্নাসিক– থার্ড প্রোগ্মম আরম্ভ করতে হল। কলকাতা আকাশবাণীর সবচেয়ে পপুলার প্রোগ্রাম– ড্রামা। সে সময় বেতারযন্ত্রের চতুর্দিকে কারা ভিড় জমায় পাঠক সেটি লক্ষ করে দেখবেন। আমার নিজের ব্যক্তিগত দৃঢ় বিশ্বাস আকাশবাণী কলকাতা যদি প্রতিদিন একঘন্টাব্যাপী ড্রামা চালায় এবং তাতে যথাপরিমিত রোদন, আক্রোশ, হুঙ্কার এবং ন্যাকামি থাকে) তবে লাইসেন্সের সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে।
এটা আমি কিছু মস্করা করে বলছিনে। আমার মূল বক্তব্য এই, যখন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মেয়েরা কলকাতার রেডিয়ো-কেন্দ্র দখল করে নিয়েছেন (এবং তারা মোটামুটি সন্তুষ্টই আছেন, কারণ খবরের কাগজে কোনও নিন্দাসূচক চিঠি তাঁদের তরফ থেকে আমি বড় একটা দেখিনি) আর পুরুষরা ওই জিনিসটে অবহেলা করে যাচ্ছেন (যারা ওস্তাদি গাওনা গান তাঁদের চেলাচামুণ্ডা এবং শ্রোতৃসংখ্যা এতই কম যে অনুরোধের আসরে ওস্তাদি গান গাইবার অনুরোধ আসে অতিশয়, সাতিশয় কালে-কম্মিনে) তখন কেন বৃথা হাবি-জাবি নানা প্রোগ্রাম দিয়ে রুচি মার্জিত করা, অর্ধলুপ্ত ধামার ধ্রুপদ পুনর্জীবিত করার চেষ্টা, স্বরাজ লাভের পর জেলে কত গ্রেন কুইনিন দেওয়ার ফলে কত পার্সেন্ট ম্যালেরিয়া রুগী কমল সেইটি সাড়ম্বরে শোনানো, ফাইভ-ইয়ার প্ল্যান–কম্যুনিটিপ্রজেক্ট ড্রাইফার্মিং-ইন জানজিবার (কিংবা জাপানও হতে পারে, আমার মনে নেই) শোনানোর
তাই বলে কি কলকাতা বেতারকেন্দ্র শুধু রান্নার রেসিপি আর স্যাঁতসেঁতে নাটক শোনাবে? আদপেই না। এবং সেইটে নিবেদন করার জন্যই আমি এতক্ষণ অবতরণিকা করছিলুম।
এদেশের মেয়েরা শিক্ষায় পুরুষদের বেমানানসই পিছনে। সাহিত্য সঙ্গীত নাট্যে তাদের রুচি সম্বন্ধে অনেকেই অনেকরকম অপ্রিয় মন্তব্য করে থাকেন– এমনকি মেয়েরাও। কিন্তু একটা কথা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করব না– মেয়েরা আত্মোন্নতি চায় না।
তাই আমার বক্তব্য, ওই মহিলা-মহল ব্যাপারটি ব্যাপকতর করুন। বেলাদি ইন্দিরাদি উত্তম ব্রডকাস্টার, কিন্তু প্ল্যান করুন কী করে দেশের সবচেয়ে গুণী-জ্ঞানীকে স্ত্রী এবং পুরুষ দুই-ই– এ কাজে লাগানো যায়। অবকাশরঞ্জন আনন্দদানকে আস্তে আস্তে উচ্চতর পর্যায়ে তোলা, শিক্ষার প্রসার, সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণ, বৃহত্তর জগতের সঙ্গে পরিচয় দান ইত্যাদি তাবৎ ব্যাপার, অনেকখানি সময় নিয়ে–এমনকি বেতারের বারো আনা সময় নিয়ে ধীরে ধীরে উচ্চতর পর্যায়ে তুলুন, এবং সর্বক্ষণ ওই মেয়েদের চোখের সামনে রেখে। পাঠক এবং শ্রোতা যোগাড় করা বড় কঠিন। এস্থলে যখন পেয়ে গেছেন তখন এই বেতারের মাধ্যমে দিন না একটা আপ্রাণ চেষ্টা এঁদের আরও আনন্দ দিতে– এদের নারীত্ব মনুষ্যত্ব সফলতর পূর্ণতম করতে। জাপানি চাষ শুনিয়ে পুরুষকে তো পাচ্ছেনই না, শেষটায় মেয়েদের হারাবেন। ইতো ভ্রষ্ট ততো নষ্ট।
