তা হলে শুধাবেন, তবে তুমি এ প্রবন্ধ লিখছ কেন? উত্তর অতি সরল। ফেল করা স্টুডেন্ট ভালো প্রাইভেট টুটর হয়! আমি গল্প বলার আর্টটা শেখার বিস্তর কস্ত করে ফেল মেরেছি বলে এখন এর ট্রটরি লাইনে আমিই সম্রাট।
***
কিন্তু এ আর্ট এখন মৃতপ্রায়; কারণটা বুঝিয়ে বলি।
পূর্বেই নিবেদন করেছি, গল্পের কাঁচা-পাকা কিছুই নেই, মোকা-মাফিক বলতে পারা, এবং বলার ধরনের ওপর ওই জিনিস সম্পূর্ণ নির্ভর করে।
এ তত্ত্বটি সবচেয়ে ভালো করে জানেন, বিশ্ব-গল্পকথক-সম্প্রদায় (ওয়ার্ল্ড স্টরি-টেলারস্ ফেডারেশন)। মার্কিন মুলুকে প্রতি বৎসর এদের অধিবেশন হয় এবং পৃথিবীর সর্বকোণ থেকে ডাঙর ডাঙর সদস্যরা সেখানে জমায়েত হন। এরা বিলক্ষণ জানেন, গল্প মোকা-মাফিক এবং কায়দা-মাফিক বলতে হয়। চীনের ম্যান্ডারিন সদস্য যে-গল্পটি বলতে যাচ্ছেন সেটি হয়তো সবচেয়ে ভালো বলতে পারেন বঙ্গে-ইন-কঙ্গোর লুসাবুবু। ওদিকে পৃথিবীর তাবৎ সরেস গল্পই এঁরা জানেন। কী হবে, চীনার কাঁচাভাষায় পাকা দাড়িওয়ালা ওই গল্পই তিনশো তেষট্টি বারের মতো শুনে। অতএব এরা একজোটে বসে পৃথিবীর সবকটি সুন্দর সুন্দর গল্প জড়ো করে তাতে নম্বর বসিয়ে দিয়েছেন। যেমন মনে করুন, কুষ্টির সেই পানিপড়ার বদলে শরবত পড়ার গল্পটার নম্বর ১৯৮।
এখন সে অধিবেশনে গল্প বলার পরিস্থিতিটা কী রূপ?
যেমন মনে করুন, কথার কথা বলছি, সদস্যরা অধিবেশনের শুরু শুরু কর্মভার সমাধান করে ব্যানকুয়েট খেতে বসেছেন। ব্যানকুয়েট বললুম বটে, আসলে অতি সস্তা লাঞ্চ লাঞ্ছনাও বলতে পারেন, একদম দা ঠাকুরের পাইস হোটেল মেলের। এক মেম্বর ডালে পেলেন মরা মাছি। অমনি তাঁর মনে পড়ে গেল, সেই বুড়ির এক পয়সার তেলে মরা মাছি, কিংবা পানি না পড়ে শরবত পড়বে নাকি গল্প। তিনি তখন গল্পটি না বলে শুধু গম্ভীর কণ্ঠে বললেন নম্বর ১৯৮!
সঙ্গে সঙ্গেই হো হো অট্টহাস্য। একজন কাত হয়ে পাশের জনের পাঁজরে খোঁচা দিয়ে বার বার বলছেন, শুনলে? শুনলে? কীরকম একখানা খাসগল্প ছাড়লে! আরেকজনের পেটে খিল ধরে গিয়েছে তাকে ম্যাসাজ করতে শুরু করেছেন আরেক সদস্য।
***
অতএব নিবেদন, এসব গল্প শিখে আর লাভ কী? এদেশেও কালে বিশ্বগল্পকথক সম্প্রদায়ের ব্রাঞ্চ-আপিস বসবে, সব গল্পের কপালে কপালে নম্বর পড়বে, আপনি আমি কোনওকিছু বলার পূর্বেই কেউ-না-কেউ নম্বর হেঁকে যাবে। তার পর নিলাম। ৯৮ নম্বর বলতে না বলতেই এসোসিয়েশন অব আইডিয়াজে কারও মনে পড়ে যাবে অন্য গল্প– তিনি হাঁকবেন ২৭২। তার পর ৩১৮– আর সঙ্গে সঙ্গে হাসির হররা, রগড়ের গড়িয়াহাট আপনি আমি তখন কোথায়?
হ্যাঁ, অবশ্য, যতদিন-না ব্রাঞ্চ-আপিস কায়েম হয় ততদিন অবশ্য এইসব টুটা-ফুটা গল্প দিয়ে ত্রি-লেগেড রেস রান করতে পারেন। কিংবা দুষ্ট ছেলেকে শাসন করার জন্য গুরুমশাই যেরকম বলতেন, যতক্ষণ বেত না আসে ততক্ষণ কানমলা চলুক।
বাই দি উয়ে– এ গল্পটাও কাজে লাগে। নেমন্তন্ন বাড়িতে চপ-কাটলেট না-আসা পর্যন্ত লুচি দিয়ে ছোলার ডাল খেতে খেতে বলতে পারেন,
যতক্ষণ বেত না আসে ততক্ষণ কানমলা চলুক।
.
শের্শে লা ফাম (Cherchez la femme)
খুন, রাহাজানি, চুরি, ডাকাতি যাই হোক না কেন, এ ফরাসি হাকিম বিচারের সময় অসহিষ্ণু হয়ে বার বার শুধোতেন, মেয়েটা কোথায়? শের্শে লা ফা– মেয়েটাকে খোজো! তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, দুনিয়ার কুল্লে খুন-খারাবির পিছনে কোনও না কোনও রমণী ঘাপটি মেরে বসে আছে। আসামি, ফরিয়াদি, সাক্ষী, কোনও না কোনওরূপে তাকে আদালতে সশরীরে উপস্থিত (হাবেয়াস্ কর্ণস) না করা পর্যন্ত মোকদ্দমার কোনও সুরাহা হবে না। অতএব, শের্শে লা ফাম– মেয়েটাকে খোজো। একবার ইনশিওরেন্স মোকদ্দমা ছিল কোনও চিমনি-পরিদর্শককে নিয়ে। একশো ফুট উঁচু থেকে সে পড়ে যায়। তার খেসারতি মঞ্জুর হয়ে গেলে উকিল শুধোলেন, কই, হুজুর এ মোকদ্দমায় আপনার শের্শে লা ফাম তো খাটল না? হুজুর দমবার পাত্র নয়। সোল্লাসে বললেন, খোজো, পাবে। হবি তো হ–তাই! তালাশিতে বেরল, সিঁড়ি দিয়ে উঠবার সময় সে হঠাৎ নিচের দিকে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়েছিল এক সুন্দরীর দিকে পড়ে মরল পা হড়কে!
***
আকাশবাণী সম্বন্ধে নানাপ্রকারের ফরিয়াদ প্রায়ই শোনা যায়। আল্লার দুনিয়া সম্বন্ধেই যখন হামেহাল নালিশ লেগেই আছে তখন এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।
গুণীজ্ঞানীরা বলেন প্রাচ্যের মানুষ অন্তর্মুখী প্রতীচ্যের বহির্মুখী। এতবড় তত্ত্বকথার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনও কথা বলার হক আমার নেই। তবে একটা জিনিস আমি স্বচক্ষে লক্ষ করেছি– গরমের দেশের লোক বারান্দা রক তেঁতুলতলায় দিন কাটায় আর পশ্চিমের লোক বাড়ির ভেতর।
আমরা আপিস-আদালত কলেজ-কারখানা থেকে বেরিয়েই একটুখানি হাওয়া খেতে গা-টা জুড়িয়ে নিতে চাই। ইভনিং ওয়ক মর্নিং ওয়ক সমাসগুলো ইংরেজি ভাষাতে সত্যই চালু আছে কি না, কিংবা ইংরেজ এদেশে এসে নির্মাণ করেছে, জানিনে, কিন্তু ও দুটোর রেওয়াজ শীতের দেশে যে বেশি নেই সে-কথা বিলক্ষণ জানি। আমরা তাই ময়দানে, গঙ্গার পারে হাওয়া-টাওয়া খেয়ে বাড়ি ফিরি। নিতান্ত শীতকালের কয়েকটি দিন ছাড়া কখনও ঘরের ভিতর ঢুকতে চাইনে। রকে বসে রাস্তায় লোকজনের আনাগোনা দেখি। পক্ষান্তরে শীতের দেশের লোক ছুটি পাওয়ামাত্রই ছুট দেয় বাড়ির দিকে। আপিসে-দপ্তরে আগুনের ব্যবস্থা উত্তম নয়– ওদিকে গৃহিণী বসবার ঘরে গনগনে আগুন জ্বালিয়ে রেখেছেন। পড়িমরি হয়ে বাড়ি পৌঁছেই সে পা দুটি আগুনের দিকে বাড়িয়ে বসে যায় আরাম-চেয়ারে, খুলে দেয় রেডিও। আমাদের রকে রেডিও থাকে না, বৈঠকখানাতেও কমই– কারণ বাড়ির মেয়ে-ছেলেরা ওটা নিয়ে হরবকতই নাড়াচাড়া করে। তাই ওটা থাকে অন্দরমহলেই।
