আর সে যুগে সম্রাজ্ঞীদের ভিতর ধনে-ঐশ্বর্যে খ্যাতি-প্রতিপত্তিতে নিঃসন্দেহে সর্বাগ্রগণ্যা না হলেও যাকে ইয়োরোপের রাজন্যবর্গ রাজপরিবার সর্বাপেক্ষা সম্ভমের চক্ষে দেখতেন সেই জারিনা? তিনি তো কৃতজ্ঞতার প্রতিদানস্বরূপ রাসপুতিনের পদপ্রান্তে কী যে রাখবেন তার সন্ধানই পাচ্ছেন না, কারণ সাধারণজনের মতো ভবন-যানবাহন রজতকাঞ্চনে তার লোভ ছিল না– তাঁর আসক্তি কিসে তার পুনরুল্লেখ নিষ্প্রয়োজন– ওদিকে জারিনা আবার জাতমিস্টিক, অলৌকিক ক্রিয়াকর্মে তিনি বিশ্বাস করেন এবং যাদের এসব মিরাকল দেখাবার শক্তি আছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন তাঁদের কাছে তিনি তাঁর দেহ-মন-আত্মা সর্বস্ব নিয়ে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ করতে প্রস্তুত।
জিতেন্দ্রিয় পরোপকারী সাধুসজ্জনদেরই-না কত প্রকারে কুৎসা রটে দু হাজার বৎসর হয়ে গেল এখনও খ্রিস্টবৈরীরা বলে, তিনি নাকি অসচ্চরিত্রা যুবতীদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন ও মদ্যপানে তাঁর আসক্তি ছিল ঈষৎ মাত্রাধিক– সেস্থলে রাসপুতিন! যিনি কি না তাঁর কামানল নির্বাপিত করার চেষ্টা তো করেনই না, তদুপরি ওই বিশেষ রিপুর চরিতার্থ তাকে তুলে ধরেছেন সর্বোচ্চ ধর্মের পর্যায়ে এবং ফলে শিষ্যশিষ্যাগণসহ বহুবিধ অনাচারে লিপ্ত হন– এসব অর্জি ‘সেটারনেলিয়া’র উল্লেখ আমরা পূর্বেই করেছি– তাঁর পূর্ববর্তী মফঃস্বল জীবনের তুলনায় রাজধানীতে তার বর্তমান কেলেঙ্কারির বিবরণ তথা পল্লবিত জনরব চতুর্দিকে যে অধিকতর ছড়িয়ে পড়বে তাতে আর কী সন্দেহ! কিন্তু ক্রমে ক্রমে মোক্ষমতর মারাত্মক কলঙ্ককাহিনী রটতে আরম্ভ করল চতুর্দিকে; এসব দলবদ্ধভাবে কৃত দুষ্কর্মের ‘অর্জি’ এখন নাকি রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে এবং সেখানে তো সবকিছুই নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়– পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সম্ৰান্ততম ডিউক ডাচেস, অর্থাৎ সম্রাটের নিকটতম আত্মীয়-আত্মীয়ারাও নাকি এইসব অনাচারে অংশ নিচ্ছেন। এবং সর্বশেষে যে কলঙ্ককাহিনী পেত্রোগ্রাদে জন্মলাভ করে সর্ব রুশের সর্ব সমাজের উচ্চতম থেকে অধস্তন। শ্রেণি পর্যন্ত প্রচারিত হয়ে আপামর জনসাধারণকে দিল রূঢ়তম পদাঘাত সেটি আর কিছু নয়, স্বয়ং জারিনা তার দেহ সমর্পণ করেছেন রাসপুতিনকে। অন্যান্য সম্ভ্রান্ত মহিলাদের তো কথাই নেই।
গ্রান্ড ডিউক ইউসুপফের দুটি মোকদ্দমাই ছিল এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে। এইসব কলঙ্ককাহিনীর সঙ্গে তাঁর স্ত্রীকে জড়িয়ে প্রথমে ফিল্ম তৈরি করা হয়েছে, পরে টেলিভিশনে দেখানো হয়েছে, অথচ তাঁর মতে, তাঁর সতী-সাধ্বী স্ত্রী পূর্বোল্লিখিত পাপানুষ্ঠানের সঙ্গে মোটেই বিজড়িত ছিলেন না। সে কথা পরে হবে।
আমি এতক্ষণ আপ্রাণ চেষ্টা দিয়ে রুশ রাজনীতি এড়িয়ে গিয়েছি কিন্তু এখন থেকে আর সেটা সম্ভবপর হবে না, কারণ এই সময়েই কুটরাজনৈতিক ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ হলধর-সন্তান রাসপুতিন হিস্যে নিতে আরম্ভ করেছেন দেশবিদেশের গুরুত্বপূর্ণ কঠিন কঠিন সঙ্কটসমস্যায়। ইতোমধ্যে যেসব সরল ধর্মযাজকগণ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন তাঁরা ধীরে ধীরে বিশ্বস্ততম সূত্রে তাঁর ‘কীর্তিকলাপে’র সম্পূর্ণ বিবরণ অবগত হয়ে তার সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেছেন। কিন্তু স্বয়ং জারিনা এবং রাশার ‘পোপ’ হোলি সিনড যতক্ষণ তাঁর সম্মোহন-ক্ষমতায় অর্ধচেতন ততক্ষণ তাকে তো মুহূর্তের তরে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। পাঠক, স্মরণ করুন সেই সুপ্রাচীন আরবি প্রবাদ : কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে, কিন্তু কাফেলা (ক্যারাভান) চলে এগিয়ে। রাসপুতিন এই কুকুরগুলোর ঘেউ ঘেউকে থোড়াই পরোয়া করেন।
কিন্তু রাসপুতিন কী করে এরকম নির্বিকারচিত্তে উপেক্ষা করলেন রুশ দেশের জনগণের রাজনৈতিক নবজাগরণকে! জার দ্বিতীয় নিকোলাস যত-না রক্ষণশীল সম্রাটের সার্বভৌমিকতু সম্বন্ধে সচেতন ছিলেন, তার চেয়ে শতগুণ স্থবির জড়ভরত ছিলেন তাঁর আমির-ওমরাহ। ওদিকে রুশ-সিংহ যখন সদম্ভে মূষিক জাপানের সঙ্গে সংগ্রাম করতে গিয়ে তার কাছে অপ্রত্যাশিতভাবে নির্মমরূপে পরাজিত হল, তখন আর ‘হোলি’ রাশার অন্তঃসারশূন্যতা গোপন রাখা সম্ভব হল না। জনমত নির্ভয়কণ্ঠে জারের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্বায়ত্তশাসন দাবি করল। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে যে বত্সর রাসপুতিন সন্ন্যাস গ্রহণ করেছেন, ঠিক সেই বৎসরেই জার প্রথম বিধানসভা (এরই নাম পূর্বোল্লিখিত ‘ডুমা’) নির্মাণের অনুমতি দিলেন। সে এক সত্যকার সার্কাস- নইলে তার কোনও সম্মানিত সদস্য সেখানে অস্ত্রোপচার দ্বারা ইহুদিকুলকে শিখণ্ডীরূপে পরিণত করার প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ গাম্ভীর্যমণ্ডিত পদ্ধতিতে পেশ করতে পারেন?
কিন্তু ‘ডুমা’ প্রতিষ্ঠান বন্ধ্যা হয়ে রইল কি না রইল সে তত্ত্ব রাসপুতিন-জীবনকে স্পর্শ করতে পারেনি যতদিন-না রাজপ্রাসাদচক্রের দু-একজন ধুরন্ধর অতিশয় রক্ষণশীল রাজনৈতিক মনস্থির করলেন যে, রাসপুতিনকে দিয়ে তারা এমন সব রাজকর্মচারী নিযুক্ত করিয়ে নেবেন, যারা ডুমার প্রতি পদক্ষেপের পথে লৌহপ্রাচীরবৎ দণ্ডায়মান হয়ে থাকবে। কূটনীতিতে আনাড়ি রাসপুতিনের হাত দিয়ে তামাক খাওয়াটা কিছুমাত্র দুঃসাধ্য হল না, কিন্তু এসব অপদার্থ নিয়োগের পশ্চাতে কে, সে তথ্যটিও গোপন রইল না। বস্তুত স্বয়ং রাসপুতিন প্রত্যেক পার্টিতে জালা জালা মদ আর প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সুমিষ্ট কেখণ্ড (তাঁর জন্য বিশেষ করে কেকে তিন ডবল চিনি দেওয়া হত– এ বাবদে হিটলারের সঙ্গে তার সম্পূর্ণ মিল) চাষাড়ে পদ্ধতিতে প্রচুর শব্দ আর বিরাট আস্যব্যাদানসহ চিবুতে চিবুতে দম্ভ করতেন, ‘এই যে দেখছ স্কার্ফখানা, এটি আপন হাতে বুনেছেন স্বয়ং জারিনা’, (কিংবা হয়তো তাঁর আদরের ডাকনাম সোহাগভরে উল্লেখ করতেন– আমার যেন মনে পড়ছে, তাই), কিংবা ‘জানো হে, ভরনাভাকে পাঠালুম তবলস্কের বিশপ করে।’ প্রভু রাসপুতিনের অন্ধভক্ত, অত্যধিক মদ্যপানবশত অর্ধমত্ত শিষ্যেরাও নাকি দ্বিতীয় সংবাদটি শুনে অচৈতন্য হবার উপক্রম! কারণ প্রভুর নিত্যসঙ্গী ওই ভরনাভা যে একেবারে আকাট নিরক্ষর! সে হবে বিশপ!
