খৎনার অব্যবহিত ফল প্রবল রক্তক্ষরণ, জীবাণুসংক্রমণ, মূত্ররন্ধ ফেড়ে যাওয়া, মূত্রথলে ও পায়ুদ্বার বিক্ষত হওয়া। যোনি অঞ্চল শেলাই ক’রে দেয়ার ফলে অনেক বালিকা পরে ঠিক মতো হাঁটতে পারে না। খৎনার পর যদি বালিকা বেঁচে থাকে, সে বিকলাঙ্গ হয়ে পড়ে; সারাজীবনের জন্যে তার কাম ক্ষুধা মিটে যায়। সুদানে মেয়েদের খৎনা চলে মেয়েদের সারজীবন ধ’রে, মেয়েদের যোনি সেখানে নিরন্তর কাটাছেড়া ও শেলাইয়ের বস্তু। সুদানে বালিকার খৎনায় গভীর ক’রে কেটে ফেলা হয় ভগাঙ্কুর, বৃহদোষ্ঠ, ক্ষুদ্রোষ্ঠ, বলা যায় কামিয়ে ফেলা হয় ওই আপত্তিকর জিনিশগুলো; তারপর মেষের অন্ত্র দিয়ে শেলাই ক’রে দেয়া হয় যোনিরন্ধ, একটু ফাক রাখা হয় যাতে চুইয়ে বেরোতে পারে ঋতুস্রাব, আর প্রস্রাবের জন্যে খোলা রাখা হয় মূত্ররন্ধটি। বিয়ের সময় যোনির শেলাই একটু কেটে ফাঁক করা হয় রন্ধটি, যাতে শিশ্ন ঢুকতে পারে। সন্তান প্রসবের সময় শেলাই আরো কাটা হয় যোনি প্রসারিত করার জন্যে। প্রসবের পর আবার শেলাই ক’রে দেয়া হয় রন্ধ। নারী তালাক পেলে বা বিধবা হ’লে শেলাই ক’রে বন্ধ ক’রে দেয়া হয় যোনি, এবং আবার বিয়ে হ’লে আবার কেটে ফাক করা হয় রন্ধ। এভাবে চলতে থাকে নারীর রন্ধ কাটাকাটি জোড়াতালি। খৎনার ফলে সঙ্গম ও প্রসব হয়ে ওঠে বিপজ্জনক, আর মনে যে-ক্ষতটি জন্ম নেয় তা নারীর জীবনকে ঢেকে ফেলে দুঃস্বপ্নে। খৎনা হওয়া নারীর জন্যে বিবাহ ভয়ংকর। সোমালিয়ার একটি বাসর রাত এমন : স্বামী প্ৰথমে নতুন বউকে পিটোয় চাবুক দিয়ে, তারপর ছুরি দিয়ে যোনির শেলাই কেটে ‘খোলে তাকে। খোলার পর তিন দিন ধরে চালাতে থাকে অবিরাম সঙ্গম! কেনো স্বামীকে এতো পরিশ্রম করতে হয়? তার কারণ [দ্র মাইলস (১৯৮৮, ৮৯)] :
‘তাকে এ-‘শ্ৰম’ করতে হয় একটি ‘প্ৰবেশ পথ’ তৈরি করার জন্যে, যাতে ক্ষতটি আবার জোড়া লেগে না যায়।…বাসর রাতের ভোরে স্বামী তার ছুরিটি কাধে ঝুলিয়ে সারা এলাকা ঘুরে আসে, সবাই প্রশংসার চোখে তাকায় তার দিকে। সে-সময় বউটি বিছানায় শুয়ে থাকে, নড়াচড়া করে না, লক্ষ্য রাখে যাতে তার ক্ষতটি খোলা থাকে।‘
নওঅল (১৯৮০, ৭-১১) বর্ণনা করেছেন তার নিজের খৎনার বিভীষিকা, যাতে শোনা যায় নৃশংস পিতৃতন্ত্রের আক্রমণে সমস্ত আরব বালিকার চিৎকার। ছ-বছরের নওঅল রাতে আধো ঘুমে আধো জাগরণে শুয়ে ছিলো নিজের বিছানায়। হঠাৎ সে অনুভব করে তার চাদরের নিচে ঢুকছে একটি শক্ত রোমশ হাত। হাতটি তাকে ধরে শক্ত ক’রে: আরেকটি হাত চেপে ধরে তার মুখ। সে চিৎকার ক’রে উঠতে চায়, কিন্তু পারে না। তারা তাকে গোশলখানায় নিয়ে যায়। সে দেখতে পায় নি। তারা কজন ছিলো, বা তারা পুরুষ না নারী। তারা লোহার মতো শক্ত ক’রে ধরে তার হাত, বাহু, দু-উরু। সে একটুও নড়তে চড়তে পারে না। সে শুনতে পায় ছুরি শানানোর শব্দ, তার মনে পড়ে যায় ঈদের দিনে মেষ জবাইয়ের দৃশ্য। তার রক্ত হিম হয়ে আসে, হৃৎপিণ্ড থেমে যায়। সে বোধ করে তারা তার পেটের নিচে দু-উরুর মাঝে কী যেনো খুঁজছে। একটু পরে সে বুঝতে পারে তারা তার দু-উরু যতোটা সম্ভব ফাক ক’রে ধরেছে। তার মনে হয় এই একটি ধারালো ছুরি কেটে ফেলবে তার গলা, কিন্তু সে অনুভব করে যে ছুরিটি নেমে আসে তার দু-উরুর মাঝখানে, এবং সেখান থেকে কেটে ফেলে এক টুকরো মাংস ৷ তার মনে হয় তার শরীরে আগুন ধ’রে গেছে, সে চিৎকার ক’রে ওঠে, কিন্তু কোনো শব্দ হয় না। সে দেখতে পায় রক্তে ডুবে গেছে তার নিতম্ব। কারা তার ভগাঙ্গুর কেটেছে সে জানে না, তবে সে যখন তার মাকে দেখতে পায় পাশেই, তখন তার দুঃখের সীমা থাকে না। সে দেখে তার মা হেসে কথা বলছে। ওই লোকগুলোর সাথে, যারা কিছুক্ষণ আগে জবাই করেছে তাকে। তারা তাকে তার ঘরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়, এবং চেপে ধরে তার ছোটো বোনকে। বোনটি তার চেয়ে দু-বছরের ছোটো। সে না, না” ক’রে চিৎকার ক’রে ওঠে। সে দেখে ভয়ে তার বোনের মুখ নীল হয়ে গেছে, তার চোখে পড়ে বোনের চোখ, যাতে জমাট হয়ে আছে আতঙ্ক। তাদের দৃষ্টি বিনিময় হয়, যে-দৃষ্টিতে তারা বলতে চায় : ‘এখন আমরা জানি এটা কী। এখন আমরা জানি কোথায় আমাদের ট্র্যাজেডি। আমরা এক বিশেষ লিঙ্গের, স্ত্রীলিঙ্গের। পীড়ন ভোগ করাই আমাদের নিয়তি, আর আমাদের নিয়তি হচ্ছে যে ঠাণ্ডা নিমর্ম হাত ছিড়ে নেবে। আমাদের দেহেব একটি অংশ।‘ এ-নৃশংস অভিজ্ঞতার পর আর কোনো বালিকা কামের কথা ভাবতে পারে না; তার যোনিটি হয়ে ওঠে একটি স্পর্শকাতরতাহীন গর্ত, যাতে একদিন স্বামী খুঁজে পায় বহু স্বপিত বহু আকাঙ্খিত একটি পর্দা, কিন্তু সেটি কখনো কামসুখ বোধ করে না।
বালিকা যখন একটু বড়ো হয়, বড়ো হয় তার জগতটি; তখন সে চারপাশে দেখে পুরুষাধিপত্য। দেখে পৃথিবীটা পুরুষের। বালিকা এর বিরুদ্ধে যেতে পারে না, সে মেনে নেয় পুরুষাধিপত্য। বালকের শিশ্ন দেখতে পাওয়া নয়, পুরুষাধিপত্য দেখতে পাওয়াই তার জীবনের চরম সত্যেকে দেখতে পাওয়া। এটা তার নিজের সম্বন্ধে ধারণাই পাল্টে দেয়। সে এখন বুঝতে পাবে পিতাই বাড়ির প্রভু, সম্রাট, ঈশ্বর; মা তার মতোই তুচ্ছ। পরিবারে পিতাই সূর্য, তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয় সব কিছু। সে দেখতে পায় পিতার ইচ্ছেই সব, মায়ের ইচ্ছে কিছু নয়। যখন সে আরো ছোটো ছিলো, সে মনে করেছিলো সে হবে মায়ের মতো শক্তিমান, এখন দেখতে পায় মায়ের শক্তি নেই। সে চারপাশে দেখতে পায় পুরুষের মহিমা, শুনতে পায় পুরুষের বন্দনা। তার স্থান সেখানে নেই। সে সব কিছুতেই দেখে তার শোকাবহ নিয়তি। সে শুনতে পায় সব মহাপুরুষ পুরুষ, মহাপুরুষদের তালিকায কোনো নারী নেই; যারা রাজ্য জয় করেছে, মানুষকে ধর্মের পথে এনেছে, যারা সভ্যতা সৃষ্টি করেছে, তারা সবাই পুরুষ। কিছু কিছু নারীর কথাও শোনে বালিকা, তবে ওই নারীরা আকর্ষণীয় শুধু মর্মস্পশী মর্ষকামের জন্যে। ওই নারীরা শুধু ত্যাগ করেছে, দুঃখ ভোগ করেছে, পরিত্যক্ত হয়েছে, তারা স্মরণীয় হয়ে আছে পুরুষের পায়ে আত্মবিসর্জনের জন্যে। ধর্ম তাকে শোনায় ভয়ঙ্কর কথা, শোনায় পুরুষের পাজার থেকে জন্মেছে নারী। সে কি একথা বিশ্বাস করবে নাকি করবে না? তার মা তাকে বিশ্বাস করতে বলে, বাবা তাকে বিশ্বাস করতে বলে, সবাই বিশ্বাস করতে বলে; সে কী ক’রে করবে। অবিশ্বাস? সে দেখে ধর্ম তারই জন্যে, তার ভাই ধর্মের কথা সব মেনে চলে না, সে-জন্যে তার ভাইকে চাপ দেয়া হয় না; কিন্তু দেখে তার ওপর খুব বেশি চেপে বসছে ধর্ম। সে শোনে পতির পায়ের তলে নারীর বেহেস্ত। সে শুনতে পায় নারীই সমস্ত নষ্টের মূলে, দিকে দিকে সে শুনতে পায় তার লিঙ্গের নিন্দা। সে নাটকে চলচ্চিত্রে পাঠ্যপুস্তকে উপন্যাসে দেখে পুরুষাধিপত্যের জয়। সে ধোঝে সে বালিকা, সে নারী হয়ে উঠবে; সে কিছু উপভোগ করবে না, কিন্তু ভোগ করবে যন্ত্রণ। সে বোঝে পুরুষভোগ্য পৃথিবী!
