ছেলেকে যে থাকতে দেয়া হয় না মায়ের আঁচলের নিচে আর বাবার বুকের কাছে, স্থাতে মনে হতে পারে যে মেয়েটিকে আদর করছে। সবাই, অনাদর করছে ছেলেটিকে; মেয়েটি সকলের চোখের মণি। কিন্তু আসলে চোখের মণি ছেলেটিই। তার সাথে যে আপাতরূঢ় আচরণ করা হয়, তার কারণ তার জন্যে সামনে পড়ে আছে অসামান্য সব ব্যাপার, যা ওই আদরের থেকে অনেক মহৎ, যার ভাগ মেয়ে কখনো পাবে না। ছেলেবেলা থেকেই ছেলের কাছে প্রত্যাশা করা করা হয়। বড়ো বড়ো কাজ, কেননা সে উৎকৃষ্ট মেয়ের থেকে। সে পিতৃতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, পিতৃতন্ত্র তারই হাতে অৰ্পণ করবে সভ্যতা। সে ছেলে, তাকে করতে হবে বিশ্বের কাজ; তাই সে হবে ভিন্ন, তাকে হ’তে হবে সাহসী, হাতে হবে পুরুষ। সে সাগর পেরিয়ে যাবে, আকাশ ভেদ ক’রে ছুটবে; সে ভোগ করবে বসুন্ধরা। সে পুরুষ, তাকে হয়ে উঠতে হবে পুরুষ। তার পুরুষত্ত্বের একটি প্রতীকও সমাজ খুঁজে পায় তার শরীরে, সেটি শিশ্ন। বালক তার শিশ্নকে সহজাত মহৎ মনে করে না, ওই প্রত্যঙ্গটির যে রয়েছে প্রতীকী ব্যঞ্জনা তাও সে জানে না; কিন্তু চারপাশের আচরণ থেকে সে বুঝতে পারে ওটির গুরুত্ব। বড়োরা তার শিশ্নটিকে নানা ডাকনামে ডাকে, ওটিকে বলে সোনা নুনু ধন, ওটিকেই ক’রে তোলে একটি ব্যক্তি। শিক্ষিত সমাজে শিশ্নের মহিমা কমেছে, কিন্তু চাষীসমাজে এর মহিমা এখনো অপ্ৰতিহত। শিশ্নটি বড়ো হয়ে একাধিক দায়িত্ব পালন করবে, কিন্তু শৈশবে এর দায়িত্ব প্রস্রাবের। মেয়ের শিশ্ন নেই, রয়েছে দুটি রন্ধ, যা সে দেখতে পায় না। সে দাঁড়িয়ে প্রস্রাব করতে পারে না। এটা এক অসুবিধা। মুসলমানদের অবশ্য পুরুষনারী উভয়েরই জন্যে বিধান রয়েছে বসে প্রস্রাব করার; তবে দাঁড়িয়ে প্রস্রাবের রয়েছে বিশেষ সুবিধা। বালিকা সে-সুবিধা নিতে পারে না। বালকের শিশ্ন তাকে ক’রে তোলে বিশিষ্ট।
বালিকার যৌনপ্রত্যঙ্গগুলো মা, বা অন্য কারো চোখে মর্যাদা পায় না। সে তার প্রত্যঙ্গগুলো দেখতে পায় না, তাকে বলা হয় ওগুলো লুকিয়ে রাখতে; তার মনে এমন বোধ সৃষ্টি ক’রে দেয়া হয় যে, ওগুলো লজ্জার বিষয়, ওগুলো নিষিদ্ধ, ওগুলোর কথা যতো ভুলে থাকা যায় ততোই ভালো, যেনো ওগুলো নেই। তার প্রত্যঙ্গগুলো যে আড়ালে থাকে, সে যে দেখতে পায় না। ওগুলো, এতে বালিকা কোনো অভাব বোধ করে না। তবে সে বুঝতে পারে তার অবস্থান ছেলের অবস্থানের থেকে অনেক ভিন্ন, অনেক নিম্ন। পরিবার, সমাজ, সভ্যতা বালিকার বিরুদ্ধে ও বালকের পক্ষে এমনভাবে অবিরাম কাজ করতে থাকে যে সে অসহায় বোধ করে, এমনকি বোধ করে হীনমন্যতা। সবাই যাদের উপেক্ষার বিষয় মনে করে, তাদের পক্ষে হীনমন্যতাবোধ স্বাভাবিক যুগ যুগ ধরে নিজেদের হীন অবস্থান দেখে দেখে তারা নিজেরাই বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তারা আসলেই হীন। বালিকাও তা বোধ করতে পারে, বালিকাও তা বোধ করে। বালিকা বোধ করে সে নিকৃষ্ট তার ভাইয়ের থেকে। ভাইয়ের শিশ্ন আছে, তাকে ভালোটা খেতে দেয়া হয়, তার দাবি পূরণ করা হয় দ্রুত। বালিকা দেখে তার দাবি মেটে না, সে খাবার বেলা পায় মাছের বাজে টুকরোটি, মুড়ো খাওয়ার স্বপ্ন তার স্বপ্লই থেকে যায়। তাই তার জগতে পারে, এবং জাগে হীনমন্যতাবোধ। ফ্রয়েড বালিকার হীনমন্যতা দেখেছেন; তিনি মনোবিজ্ঞানী হিশেবে উৎকৃষ্ট হতে পারেন, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানী হিশেবে খুবই নিকৃষ্ট। তিনি বলেছেন খোজাগূঢ়ৈষার কথা, বালিকার শিশ্নাভাবের কথা, শিশ্নাসূয়াগ্ৰস্ততার কথা। তিনি বলেছেন বালিকা ঈর্ষা করে বালকের শিশ্নকে, কেননা তার শিশ্ন নেই; বালিকা শিশ্নের অভাবে ভোগে হীনমন্যতায়। ফ্রয়েডের তথ্য নির্ভুল, তত্ত্ব সম্পূর্ণ ভুল।
বালিকা শিশ্নকে ঈর্ষা করে না, ঈৰ্ষা করে শিশ্নের অধিকারীকে। একটি শিশ্ন থাকলে অশেষ অধিকার, না থাকলে অধিকার নেই। শিশুবয়সে সামনের দিকে লেজের মতো ঝুলে থাকা শিশুটিকে বরং হাস্যকর আর খাপছাড়া ব’লেই মনে হয়। ওটি দেখে যে ঘেন্না জন্মে, তা নয়; আবার ওটি দেখার সাথে সাথে যে ওটির মহত্ত্বের কাছে অবনত হয়ে পড়তে হয়, এমনও নয়। ফ্রয়েড মনে করেছেন, আর তার অনুসারীরা রটিয়েছেন, যে বালিকা বালকের শিশ্ন দেখার সাথেসাথেই লাভ করে দিব্যদৃষ্টি, তখনই বুঝে ফেলে যে তার নেই শিশ্ন, এবং সাথে সাথে আক্রান্ত হয় হীনমন্যতায়। তারা ভুল বুঝেছেন বালিকার মনস্তত্ত্ব। একটি প্রত্যঙ্গ দেখেই হীনমন্যতার আবেগ জাগে না, এর জন্যে থাকা দরকার নিজের অবস্থা নিয়ে অসন্তোষ। বালিকা দেখে দেখে বড়ো হয় যে অনেক কিছুই তার প্রাপ্য নয়, আর ছেলের প্রাপ্য সব কিছু তখন সে ঈর্ষা করে বালককে, পুরুষকে, তার শিশ্নটিকে নয়। বালিকা শিশ্নের ঈর্ষায় কাতর নয়, তবে একটি শিশ্নের অভাব তার জীবনে নিয়তির মতো কাজ করে। বোভোয়ারের মতে বালক তার শিশ্নে অনুভব করে নিজের ব্যক্তিত্ব, কিন্তু বালিকা তার কোনো প্ৰত্যঙ্গে ব্যক্তিত্ত্বের আশ্বাস পায় না। ছেলে খেলতে পারে তার শিশ্ন নিয়ে, মেয়ে নিজের যৌনপ্রত্যঙ্গ নিয়ে খেলতে পারে না। খেলার জন্যে সে পায় পুতুল। পুতুল বস্তু, বালিকা ওই বস্তুর সাথে নিজেকে বোধ করে অভিন্ন। বালিকা পুতুল সাজায়, তাকে নিয়ে খেলে, তাকে আদর করে, যেমন আদর সে নিজে চায়। সে নিজেকে মনে করে পুতুল। বালক যখন ব্যক্তি হয়ে ওঠে, তখন বালিকা হয়ে ওঠে পুতুল। সে চারপাশে দেখে নারীদের, বালিকা শেখে রূপের মূল্য, নিজে হয়ে উঠতে গায় রূপসী। সাজগোজ হয় তার প্রিয়, আয়নায় সে দেখে নিজেকে, অন্যরা যখন তাকে সুন্দর বলে সে সুখ পায়। সে হয়ে উঠতে চায় পরী বা রাজকন্যা। সে তখন থেকে আর নিজের জন্যে বাঁচে না, বাঁচে অন্যের জন্যে। যে-রূপের জন্যে তার ব্যাকুলতার শেষ নেই, সে-রূপও তার নিজের জন্যে নয়, যেমন তার জীব ও নিজের জন্যে নয়। বালিকা নারী হয়ে উঠতে থাকে, আর হারাতে থাকে স্বায়ত্তশাসন।
