নারীপুরুষের ডিম্বাণু আর শুক্রাণুতে x ক্রোমোসোমের পরিমাণ অনেক বেশি, তাই মেয়েই বেশি জন্ম নেয়ার সম্ভাবনা, জন্মও নেয় বেশি; কিন্তু মেয়ে পৃথিবীতে স্বাগত নয়। পৃথিবীর নানা অগ্রগতি সত্ত্বেও পৃথিবী এখনো আদিম, তার আদিমতার একটি হচ্ছে মেয়ে নিয়ে বিব্রত বোধ করা। গরিব প্রথাগত পরিবারেই শুধু নয়, আধুনিক পরিবারেও পুত্ৰ ঐশ্বরিক ব্যাপার। আধুনিক পিতামাতা, যারা একটি সন্তানই যথেষ্ট শ্লোগানে দীক্ষিত, তারাও একটি ছেলের জন্যে একের পর এক মেয়ে জন্ম দিয়ে চলে, এবং একটি ছেলে জন্ম দিতে না পারার শোক সারাজীবনে ভুলতে পারে না। ‘পুত্র’ শব্দের মূল অর্থ ‘পূত-নরক-ত্ৰাতা’, যে পিতার মুখাগ্নি ক’রে পিতাকে উদ্ধার করে ওই ভয়ঙ্কর নরক থেকে; তাই পুত্রের জন্যে হিন্দুর ব্যাকুলতার শেষ নেই। পুত্র হচ্ছে ‘নন্দন’, যে আনন্দ দেয় চিত্তে। সংস্কৃত ব্যাকরণবিদ তাঁর সূত্ররচনার সাফল্যকে তুলনা করেন পুত্রলাভের সাথে; বলেন, সূত্র থেকে একটি মাত্রা কমাতে পারলে তিনি পান পুত্ৰ লাভের আনন্দ। হিন্দুশাস্ত্রে পুত্রের জন্যে বাতিল ক’রে দেয়া হয়েছে নারীর সতীত্বের ধারণা : স্বামী যদি পুত্র জন্ম দিতে না পারে তবে পুত্র উৎপাদনের জন্যে বিধান রয়েছে পুত্রবীর্যবান পুরুষ নিয়োগের! মন্ত্র তো রয়েছে সম্ভবত অসংখ্য। মেয়ে তার বিপরীত; মেয়ে অস্বাগত অযাচিত। মার্কিন নারীমুক্তি আন্দোলনের বিখ্যাত নেত্রী লুসি স্টোনের জন্মের সময় তার মা চিৎকার ক’রে উঠেছিলো, ‘হায়! আমি দুঃখিত। এটি মেয়ে। মেয়েমানুষের জীবন কী কষ্টকর।’ ঔপন্যাসিক অনুরূপা দেবী পরে আনন্দ দিয়েছিলেন অনেককে, কিন্তু তাঁর জন্মের সময় সকলের বুক থেকে যে-দীর্ঘশ্বাস বেরিয়েছিলো, তা তিনি মুছে ফেলতে পারেন নি জীবন ও মন থেকে। তিনি বলেছেন, ‘আমি পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হয়ে কাহারও আনন্দ বর্ধন করতে সমর্থ হইনি। বরং সকলকারই আশাপ্রণোদিত চিত্তে হতাশা এবং নিরানন্দই এনে দিয়েছিলাম।‘ কারণ সবাই আকুল প্ৰতীক্ষায় ছিলো পুত্রের জন্যে, ‘গড়ের বাদ্য’ও প্রস্তুত ছিলো; কিন্তু ‘গড়ের বাদ্যি’ ছেড়ে একটি শাকও বাজল না, যদিও পুত্রসন্তানের শুভাগমন কল্পনায় সেটা আঁতুড় ঘরের দোরগোড়াতেই এনে রাখা হয়েছিলা’ [দি চিত্রা (১৯৮৪, ৩০-৩১)] ভার্জিনিয়া উলফ শেক্সপিয়রের বোনের কথা বলেছেন; এভাবেই পৃথিবীতে আসে শেক্সপিয়রের বোনেরা। বাঙলায় নারীদের মধ্যে যিনি প্রথম আত্মজীবনী লিখেছেন, সে-রাসাসুন্দরী বলেছেন, মেয়েমানুষের জন্ম নিছা। সে স্ত্রীলিঙ্গ, তবে তার লিঙ্গে এমন কোনো নির্দেশ নেই যে সে হয়ে উঠবে ‘নারী’ : পুরুষের বিপরীত, পরাধীন পর্যুদস্ত পরনির্ভর। তার জন্মের পর পুরুষের সভ্যতা তাকে শাসন করে তাকে বানিয়ে তোলে নারী, তাকে নানা তুচ্ছ পুরস্কার দিয়ে তাকে গ’ড়ে তোলে এমন বস্তুরূপে, যার নাম নারী। সে বেড়ে ওঠে বালিকারূপে; তার ভেতরে চলতে থাকে অবিরাম ভাঙাগড়া, তার বাইরে চলে পুরুষতন্ত্রের হাতুড়ির আঘাতে নিরন্তর ধ্বংস ও নির্মাণ। যে-নারী চারপাশে দেখতে পাই, তা এক বিকৃত জিনিশ; তা সামাজিক ভাঙাগড়ার অস্বাভাবিক পরিণতি। কোনো নারীকে স্বভাব অনুসারে বাড়তে দেয় না পিতৃতন্ত্র। জন্মসূত্রে সে স্ত্রীলিঙ্গ; কিন্তু পিতৃতন্ত্রের হাতুড়ির ঘায়ে সে হয়ে ওঠে এমন এক লিঙ্গ, যাকে বোভোয়ার (১৯৪৯, ২৯৫) বলেছেন ‘পুরুষ আর খোজার মাঝামাঝি লিঙ্গ’।
পিতৃতান্ত্রিক সমোজসভ্যতা বিচিত্র ধরনের পুলিশবাহিনীর সমষ্টি; গায়ের জোরে টিকে থাকতে হ’লে পুলিশ ছাড়া উপায় নেই। পিতামাতা পরিবার পুলিশ, শোয়ার ঘর রান্নাঘর পুলিশ, রাস্তা পুলিশ, বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয় বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ, মসজিদ মন্দির গীর্জা সিনেগগ প্যাগোডা পুলিশ, সবাই পুরুষতন্ত্রের পুলিশ। এসব বাহিনীর প্রহরার মধ্যে বন্দী বালিকা বেড়ে ওঠে নারী হয়ে। এসব সংস্থা তাকে শুধু ভয় দেখায় না, তাকে পুরস্কারের লোভও দেখায়; তাকে ভয় দেখায় যাতে সে পুরুষের মতো বেড়ে উঠতে না চায়, তাকে পুরস্কারের লোভ দেখায় যাতে সে বেড়ে ওঠে। পুরুষতন্ত্রের আদর্শ নারীকাঠামো অনুসারে। একে বলা হয় বলীয়ানকরণ বা রিইনফোর্সমেন্ট। এসব সংস্থা তার সামনে উপস্থিত রাখে অনুকরণীয় আদর্শকাঠামো, নিজেকে ঢেলে তৈরি হ’তে নির্দেশ দেয় ওই কাঠামোর আদলে। এর নাম আদর্শকাঠামো অনুকরণ বা মডেলিং। বালকের জন্যেও রাখে আদর্শকাঠামো অনুকরণের ব্যবস্থা, তবে তার আদর্শকাঠামো বিপরীত। বালিকার অনুকরণের আদর্শ মা ও চারপাশের দীক্ষিত নারীরা; তাই বালিকা হয়ে ওঠে নারী। বালকবালিকা জন্মের পরই বুঝে ওঠে না যে তারা পুরুষ বা নারী, লিঙ্গ তাদের কাছে গুরুত্বের ব্যাপার নয়। শুরুতে তারা নিজেদের মধ্যে কোনো পার্থক্যই করে না। তাদের চোখে তারা এক, তাদের জগত এক; তারা, বালিকা আর বালক, উভয়েই বিশ্বকে উপলব্ধি করে হাত দিয়ে, পা দিয়ে, চোখ কান নাসিকা দিয়ে। পৃথিবীতে এসেই তারা শিশ্ন বা যোনি দিয়ে পৃথিবীকে পরখ করে না। তারা ছোটোবেলা বাড়ে একই রকমে, একই রকমে মায়ের স্তন চোষে, জড়িয়ে ধরে একই রকমে, তারা আদর উপভোগ আর ঈর্ষা বোধ করে একই রকমে। বারো বছর বয়স পর্যন্ত বালকবালিকার দেহে থাকে সমান শক্তি, মনোবেলও থাকে একই পরিমাণে। তবে তিন বছর বয়স থেকে, বিশেষ ক’রে বয়ঃসন্ধি থেকে বালিকার আচরণে দেখা দিতে পাকে নারীত্ব। আগে এ-নারীত্বের অভিব্যক্তি ঘটতো অত্যন্ত সমারোহের সাথে, এখন তার প্রকাশ অনেক ক’মে গেছে। ওই নারীত্ব দেখে বিস্মিত আর মুগ্ধ হয়ে পড়তো পুরুষতন্ত্র, তারা মনে করতো বালিকার মধ্যে ঘুমিয়ে আছে এক নারী, যে জেগে উঠতে শুরু করেছে। বিদ্যাসাগর (১৯৮৭, ৪১৮] ‘প্ৰভাবতীসম্ভাষণ’-এ প্ৰভাবতী নামের একটি বালিকার নারী আদর্শ অনুকরণের উল্লেখযোগ্য বিবরণ দিয়েছেন :
