‘নারী ভ্রূণের রূপতত্ত্বের প্রাথম্য আমাদের বাধ্য করে লিঙ্গভিন্নতার প্রকৃতি সম্পর্কে দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত ধারণা উল্টে দিতে; ভ্রূণতাত্ত্বিকভাবে বলা যায় যে শিশ্ন হচ্ছে অতিশায়িত ভগাঙ্কুর, অণ্ডকোষ উদ্ভূত হয় বৃহ্দোষ্ঠ থেকে, আদি লিবিডো নারীধর্মী ইত্যাদি।… সমস্ত স্তন্যপায়ীর জন্যে আধুনিক ভূণবিজ্ঞান দাবি করে হাওয়া-থেকে-উদ্ভূত-আদম পুরাণ।‘
নারীপুরুষের যৌনপ্রত্যঙ্গগুলো বিকশিত অবস্থায় খুবই ভিন্ন দেখায়, তবে ওগুলো অভিন্ন আদিম প্রত্যঙ্গের বিভিন্ন বিকাশ। আদি গোনাডের একটিই রূপ, এর কোনো লিঙ্গভেদ নেই। এর দুটি অংশ : আভ্যন্তর ভাগ বা মেডুলা; এবং বহির্ভাগ বা কর্টেক্স। Y থাকলে সপ্তম-অষ্টম সপ্তাহে মেডুলা বেড়ে হয়ে ওঠে অণ্ডকোষ, কর্টেক্সটি পড়ে থাকে অদৃশ্য চিহ্নরূপে। যদি Y না থাকে, তাহলে কটেক্স বারো সপ্তাহে বেড়ে হয়ে ওঠে ডিম্বাশয়, মেডুলা নিজেকে গুটিয়ে নেয়। ভ্রণের সপ্তম সপ্তাহে তার থাকে পুরুষ [ওলফীয় নালি] ও স্ত্রী [ম্যুলারীয় নালি] উভয় ধরনেরই আদি জননেন্দ্ৰিয় নালি। পুরুষের বেলা ওলফীয় নালি বেড়ে সৃষ্টি হয় ভাস ডেফেরেন বা শুক্রনালি, শুক্রথলে, ও বীর্যনিৰ্গম নালি। নারীর বেলা মুলারীয় নালি বেড়ে সৃষ্টি হয় জরায়ু, ফ্যালোপীয় নালি বা ডিম্বনালি, ও যোনির ওপরের অংশ। যখন পুরুষের বিকাশ ঘটে তখন মুলারীয় নালি অদৃশ্য চিহ্নের মতো পড়ে থাকে; যখন নারীর বিকাশ ঘটে তখন ওলকীয় নালি পড়ে থাকে অদৃশ্য চিহ্নের মতো। প্রতিটি পুরুষ তার দেহে বয় নারীর পরিত্যক্ত আদি যৌনপ্রত্যঙ্গ, প্রতিটি নারী বয় পুরুষের পরিত্যক্ত আদিযৌনপ্রত্যঙ্গ। নারীপুরুষের বাহ্যিক যৌনপ্রত্যঙ্গগুলোও বিকশিত হয় একই আদি প্রত্যঙ্গ থেকে; আদি একই রূপেরই ঘটে দু-রূপ বিকাশ। ভ্রূণের আট সপ্তাহ বয়স হওয়ার আগে এগুলোর কোনো ভিন্নতা থাকে না, এগুলোর সমান সম্ভাবনা থাকে নারীর বা পুরুষের যৌনাঙ্গরূপে বিকাশের। এ-সময়ে এটি হচ্ছে জননেন্দ্ৰিয় খাজের কিছু ওপরে অবস্থিত একটি যৌনকন্দ বা গুটিকা। খাজটির দু-পাশে থাকে মূত্রনালীয় ভাজ, তার পাশে থাকে৷ ঔষ্ঠ্যঅণ্ডকোষীয় স্ফীতি। নারীর বেলা কন্দটি হয়ে ওঠে ভগাঙ্কুর, মূত্রনালীয় ভাজটি ক্ষুদ্রোষ্ঠ, ঔষ্ঠ্য অণ্ডকোষীয় স্ফীতি হয় বৃহ্দোষ্ঠ। পুরুষের বেলা কন্দটি হয় শিশ্ন ও শিশ্নের শীর্ষ, মূত্রনালীয় ভাজ মূত্ররান্ধের চারপাশে মিশে যায়, ঔষ্ঠ্য অণ্ডকোষীয় স্ফীতি হয় অণ্ডকোষ। তাই নারীপুরুষের যৌনপ্রত্যঙ্গগুলো বা নারীপুরুষ হচ্ছে এক অভিন্ন আদিরূপের দু-রকম উৎসারণ।
নারীপুরুষের মধ্যে ভিন্নতার থেকে অভিন্নতাই বেশি, তবে ভিন্নতা নেই এমন নয়। ওই ভিন্নতা এমন নয় যে শরীর বা লিঙ্গই হয়ে উঠবে তাদের নিয়তি, একজন করবে আধিপত্য আরেকজন থাকবে অধীন। বাস্তবে পুরুষতন্ত্র নারীপুরুষের জৈব লিঙ্গের থেকে সাংস্কৃতিক লিঙ্গকেই ক’রে তুলেছে প্রধান। ইংরেজিতে দুটি শব্দ আছে : সেক্স ও জেন্ডার, বাঙলায় শুধুই লিঙ্গ। সেক্স জৈব লিঙ্গ, জেন্ডার হচ্ছে বিশেষ লিঙ্গের জন্যে বিশেষ সাংস্কৃতিক বিধান। স্ত্রীলিঙ্গ মানুষকে নারী, আর পুংলিঙ্গ মানুষকে পুরুষ হিশেবে গড়ে তোলা সামাজিক সাংস্কৃতিক ব্যাপার, লৈঙ্গিক রাজনীতি। সামাজিক লিঙ্গের সাথে যে জৈব লিঙ্গের সম্পর্ক নেই, তা প্রমাণিত হয় লিঙ্গদুর্ঘটনাগ্রস্তদের আচরণে। জন্ম নেয় অনেক শিশু, যারা জৈব বা মানবিক ভুলের জন্যে বিন্যস্ত হয় ভিন্ন লিঙ্গশ্রেণীতে, এবং লালিতপালিত হয় তার নতুন লিঙ্গপরিচয়ে। কোনো শিশু জৈবিকভাবে পুংলিঙ্গের, কিন্তু তার শিশ্নটি জৈব বিপর্যয়ের ফলে ঠিক মতো গড়ে ওঠে নি, বা কোনো দুর্ঘটনায় সে হারিয়ে ফেলেছে শিশ্ন, তাকে পালন করা হয়েছে মেয়েরূপে; বা কোনো জৈবিক স্ত্রীলিঙ্গ কিন্তু বিশেষ সিনড্রোমগ্ৰস্ত মেয়েদের কাউকে লালন করা হয়েছে ছেলেরূপে, কাউকে মেয়েরূপে; তখন দেখা গেছে তারা আচরণ করে তাদের নতুন লিঙ্গ অনুসারে। এদের আচরণে বোঝা যায় জৈবিক লিঙ্গের সাথে সাংস্কৃতিক লিঙ্গের বিশেষ সম্পর্ক নেই। দ্বিতীয় বছব থেকে পাঁচ বা ছ-বছর পর্যন্ত শিশুকে যে-লিঙ্গ অনুসারে লালন করা হয়, সে আয়ত্ত করে সে-লিঙ্গেরই আচরণ, তার জৈবিক লিঙ্গ যাই হোক। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বালিকাদেরই বিশেষভাবে দীক্ষা দেয়া হয় সাংস্কৃতিক লিঙ্গে, তারা হয়ে ওঠে নারী, তাদের স্বভাব হয়ে ওঠে নারীধর্মী। এর সাথে জৈব লিঙ্গের সম্পর্ক নেই। দ্য বোভোয়ার (১৯৪৯, ২৯৫) বলেছেন :
‘কেউ নারীরূপে জন্ম নেয় না, বরং হয়ে ওঠে নারী; সমাজে যে-নারী দেখা যায, কোনো জৈব, মনস্তাত্ত্বিক, বা আর্থনীতিক ভাগ্য তার রূপ স্থির করে না: সমগ্র সভ্যতাই উৎপাদন করে পুরুষ ও খোজাব মাঝামাঝি এ-প্ৰাণীটিকে, যাকে বলা হয় নারী।’
নারীর যৌনপ্রত্যঙ্গগুলো ঢাকা রহস্যে আর নিষেধে। নারীর শরীর যেনো আকর্ষণীয় রহস্যময় ভীতিকর দুর্গ, যার সংগঠন সে নিজে জানে না; জানাও নিষেধ। আজো মানুষের সবচেয়ে বড়ো ট্যাবো নারীর শরীর। তার একটি প্রত্যঙ্গ, স্তন, দৃষ্টিগ্রাহ্য; অধিকাংশ সংস্কৃতির পুরুষের চোখে ওটির আবেদন তীব্ৰ, যদিও আদিম সমাজের পুরুষের চোখে ওর কোনো আবেদন নেই। তবে নারীর অধিকাংশ যৌনপ্রত্যঙ্গ দেহাভ্যন্তর ও অদৃশ্য, আর যেগুলো বাহ্যিক সেগুলোও অন্তরালবর্তী। একটি নগ্ন নারীর দিকে তাকিয়ে থেকেও তার কোনো যৌনপ্রত্যঙ্গ দেখা যায় না, শুধু আভাসের ঢেউ উঠতে থাকে। বালক শিশুর শিশ্নটি বাইর থেকে দেখা যায়, ‘কী মিষ্টি’ বলে ওটি নিয়ে তার পিতামাতারা খেলাও করে, ওটিকে দেয় নানা প্রিয় ডাকনাম;–সোনা, নুনু, ধন; কিন্তু বালিকার বাহ্যিক যৌনপ্রত্যঙ্গগুলোকেও নিষিদ্ধ বস্তুর মতো ঢেকে রাখে সিন্দুকে। বালিকার যৌনপ্রত্যঙ্গের কোনটি কেমন, কোনটির কী নাম ও কী কাজ তা জানতে দেয়া হয় না বালিকাকে, জানতে চাইলে তাকে চুপ করিয়ে দেয়া হয়। যেনো ওগুলো অপার লজ্জার, ঘৃণার, অপরাধের, এমনকি পাপের। তাই নারী শৈশব থেকেই বিব্রত থাকে তার যৌনপ্রত্যঙ্গগুলো নিয়ে। ওগুলো তার লজ্জা, লজ্জাস্থান; ওগুলো দেখতে নেই, দেখাতে নেই, ছুতে নেই, ছুঁতে দিতে নেই, ওগুলোর নাম নিতে নেই। অনেক ভাষায় বাহ্যিক যৌনপ্রত্যঙ্গগুলোকে বলা হয় ‘লজ্জাস্থান’, এগুলোর চিকিৎসাশাস্ত্রীয় পরিভাষা হচ্ছে ‘পুডেনডাম’ অর্থাৎ লজ্জার বিষয়। প্রথাগত লজ্জা, ঘৃণা, পাপ আর অপরাধবোধের সাথে আরেকটি দুর্নাম জড়িত ক’রে দিয়েছেন ফ্রয়েড; তিনি নারীর যৌনপ্রত্যঙ্গগুলোতে দেখেছেন বিকলাঙ্গতা। নারীর শিশ্ন নেই, রয়েছে ভগাঙ্কুর; তাই নারী বোধ করে শিশ্নের অভাব, ভোগে খোজাগূঢ়ৈষায়, নিজেকে মনে করে বিকলাঙ্গ পুরুষ, এসব বাজে ধারণা তিনি যুক্ত ক’রে দিয়েছেন নারীর যৌনপ্রত্যঙ্গগুলোর সাথে। এসবের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। নারীর যৌনপ্রত্যঙ্গগুলো নারীর যৌনপ্রত্যঙ্গ, ওগুলো একশো ভাগ স্বাভাবিক; আর ওগুলো লজ্জা, অপরাধ, ঘৃণা বা পাপের ব্যাপার নয়। তবু কোনো নারী নিদ্বিধায় ছুঁতে পারে না তার প্রত্যঙ্গ, কেননা ওগুলো নিষিদ্ধ। প্রতিটি নারীর জানা উচিত তার আভ্যন্তর ও বাহ্যিক প্রত্যঙ্গগুলো, তবে শুধু অশিক্ষিত নারীরাই নয়, শিক্ষিত নারীরাও জানে না তাদের প্রত্যঙ্গগুলোকে ও সেগুলোর ক্রিয়াকলাপ। শৈশব থেকে তাদের বার বার দেখা দরকার নিজেদের প্রত্যঙ্গগুলো, বিশ্বাস করা দরকার যে ওগুলো কোনো নিষিদ্ধ বস্তু নয়। ওগুলো নিয়ে বিব্রত হয়ে থাকার জন্যে প্রকৃতি ওগুলো দেয় নি নারীকে।
