ইসলাম নারীকে কিছু আর্থ সুবিধা দেয়, যা অন্য কোনো ধর্ম দেয় না। বিয়ের চুক্তির ফলে স্ত্রী স্বামীর কাছে থেকে পায় দেনমোহর ; কিছু টাকা বা সম্পত্তির লিখিত প্রতিশ্রুতি। ওই দেনমোহর শুধু কাবিনে লেখা থাকে, স্ত্রী তা সাধারণত পায় না, এমনকি বিচ্ছেদ হ’লেও দেনমোহর সাধারণত আদায় করতে পারে না। দেনমোহর পরিমাণে হয় খুবই কম ; হানাফি আইনে কমপক্ষে ১০ দিরহাম, মালিকি আইনে কমপক্ষে ৩ দিরহাম, আর হাদিস অনুসারে কমপক্ষে ১টি লোহার আংটি! বিয়ে স্ত্রীকে খোরপোষের অধিকার দেয়; স্ত্রীটির ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর। ভরণপোষণের অধিকারের জন্যে স্ত্রীকে থাকতে হবে স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত, মেনে চলতে হবে স্বামীর নির্দেশ। স্বামী যেখানে থাকবে বা যেখানে থাকার জন্যে স্ত্রীকে নির্দেশ দেবে, সেখানেই থাকতে হবে স্ত্রীকে; স্ত্রী তা অমান্য করলে ভরণপোষণের অধিকারী হবে না। ইসলামে কন্যা পিতার সম্পত্তির ও স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়ে থাকে; কিন্তু তাদের অংশ খুবই কম। পিতার সম্পত্তিতে কন্যার উত্তরাধিকার রয়েছে। পিতা যদি শুধুই একটি কন্যা রেখে মারা যায়, তবে সে পায় পিতার সম্পত্তির ১/২; আর ভাই থাকলে বোনের অংশ ভাইয়ের অংশের ১/২। স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তির কতোটা পায়? সামান্য। স্বামী কিন্তু পায় স্ত্রীর সম্পত্তির একটি বড়ো অংশ। স্ত্রী কোনো সন্তান না রেখে মারা গেলে স্বামী তার সম্পত্তির ১/২ পায়, কিন্তু স্বামী কোনো সন্তান না রেখে মারা গেলে স্ত্রী পায় স্বামীর সম্পত্তির ১/২; আর সন্তান রেখে গেলে পায় স্বামীর সম্পত্তির ১/৮। তাই কন্যা বা স্ত্রী অর্থাৎ নারী আর্থিকভাবেও প্রতারিত, যদিও অর্থের প্রয়োজন তারই বেশি।
শরিয়া নারীকে কিছু আর্থ ও সম্পত্তির অধিকার দিয়ে কেড়ে নিয়েছে তার অন্যান্য অধিকার। মুসলমান পুরুষ বিয়ে করতে পারে ঐশীগ্রন্থে বিশ্বাসী যে-কোনো ধর্মের নারী; অগ্নি বা মূর্তিপূজারিণীও বিয়ে করতে পারে, কিন্তু মুসলমান নারী অমুসলমান বিয়ে করার অধিকারী নয়। তবে শরিয়া আইনে নারীর প্রধান সংকট হচ্ছে স্বামীর বহুবিবাহের ও স্বেচ্ছাচারী তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার। তালাক মুসলমান নারীর জীবনে সবচেয়ে ভয়ংকর শব্দ, ওই বজ্র যে-কোনো সময় নীলাকাশ থেকে তার মাথায় এসে ফাটতে পারে। মুসলমান পুরুষ চারটি বৈধ বিয়ে করতে পারে, পঞ্চম একটিও করতে পারে। পঞ্চম বিয়ে করলে বিয়েটি বাতিল হয় না, শুধু তার দরকার পড়ে আগের একটি স্ত্রীকে এক-দুই-তিন ক’রে তালাক দেয়া। মুসলমান পুরুষের জন্যে তার চারটি স্ত্রী সম্ভোগই শুধু বৈধ নয়, সে তার ক্রীতদাসীদের সাথেও সঙ্গম করার অধিকারী। মোহাম্মদ ইবনে সাদ এল তবকত এল কোবরা-য় (১৯৭০) ক্রীতদাসী সম্ভোগের একটি আকর্ষণীয় ঘটনা বর্ণনা করেছেন [দ্র নওঅল (১৯৮০, ১৯৭)]।
কোরান-এ আছে :
বিয়ে করবে নারীদের মধ্যে যাদের তোমাদের ভালো লাগে, দুই তিন, অথবা চার, আর যদি আশংকা করো যে সুবিচার করতে পারবে ন তবে একজনকে, অথবা তোমাদের অধিকাবভুক্ত দাসীকে [সুরা নিসা : ৩]।
হাদিসে আছে [দ্ৰ নুর মোহাম্মদ (১৯৮৭, ২৪৬)] :
হজরত জাবের (রাঃ) বলেন : এক ব্যক্তি রজুলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু অলাইহে ওয়া ছাল্লাম-এর নিকট আসিয়া বলিল : হুজুর, আমার একটি দাসী আছে; সে আমাদের খেদমত কবে। আমি তাহাকে উপভোগ করি অথচ তাহার গর্ভধারণ করাকে আমি পছন্দ করি না। হুজুর বলিলেন : ইচ্ছা থাকিলে ‘আজল’ করিতে পার।
হজরত আবু ছায়ীদ খুদরী (রাঃ) বলেন : আমরা রাজুলুল্লাহর (ছঃ) সাথে বনি মুস্তালিক যুদ্ধে বাহির হইলাম এবং তথায় আমরা বহু যুদ্ধবন্দী লাভ করিলাম। এ সময় আমাদের নারী সঙ্গমেব আকাঙ্খা জাগিল এবং নারীবিহীন থাকা আমাদের পক্ষে কষ্টকর হইয়া পড়িল কিন্তু আমরা (যুদ্ধবন্দিনীদের সাথে) ‘আজল’ করাকেই পছন্দ করিলাম;…আমরা তাঁহাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করিলাম। তিনি বলিলেন : না করিলেও তোমাদের কোনো ক্ষতি হইবে না।
শরিয়া আইনে প্রতিটি নারীর ভাগে পড়ে একচতুর্থাংশ স্বামী, যদিও এ-ধর্মের বিশ্বাস হচ্ছে যে নারীর কাম অত্যন্ত প্ৰবল। মিলেট (১৯৬৯, ১১৯) হিশেবে ক’রে দেখিয়েছেন এক স্বামীর চারটি স্ত্রী থাকলে স্বামী ও প্রতিটি স্ত্রীর সঙ্গমসুযোগের অনুপাত হয় ১:১৬, প্রতিটি নারী যেখানে পায় তার স্বামীর যৌনপ্রতিভার সিকিভাগ, সেখানে স্বামীটি ভোগ করে চারটি স্ত্রীর প্রবল কাম। তবু আরবি চেতনায় নারী হচ্ছে ফিৎনা, যার কাম এলোমেলো ক’রে দিতে পারে সমাজ। বলা হয় চারটি বিয়ে সে-পুরুষই করার অধিকারী, যে সমান আচরণ করতে পারবে স্ত্রীদের সাথে। সমান আচরণ নারীকে সম্মানিত করে না, শুধু জানিয়ে দেয় তারা পুরুষের সম্ভোগের সামগ্ৰী। ওই সাম্য চুক্তিবদ্ধ দাসীদের বা শয্যাসঙ্গিনীদের মধ্যে মৌখিক বা চুক্তির সাম্য; কিন্তু কামে আর আবেগে সাম্য কখনোই সম্ভব নয়।
শরিয়ায় বিয়ে হচ্ছে পুরুষাধিপত্যের চুক্তি; পুরুষ ওই চুক্তি রদ করতে পারে স্বেচ্ছাচারিতার সাথে। ইসলামে বিবাহবিচ্ছেদ বা তালাক গেলাশ থেকে জল ঢালার থেকেও সহজ–স্বামীর জন্যে; আর স্ত্রীর জন্যে ফাঁসির রজ্জু খোলার মতোই কঠিন। অধিকাংশ মুসলমান রাষ্ট্রেই নারী জীবন কাটায় তালাকের খড়গের নিচে, যে-কোনো সময় ওই খড়গ নেমে আসতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে তালাক সাধারণ ঘটনা, সেখানে সম্পদশালীরা নিয়মিতভাবে তরুণী স্ত্রী গ্ৰহণ ক’রে বেহেশতের কিছুটা স্বাদ পেতে চায় ব’লে ব্যবহৃতাদের বাতিল না করলে চলে না। মুসলমানের এক সাথে চারটি স্ত্রী রাখার অধিকার রয়েছে, তবে তাতেও তার ক্ষুধা মিটতে নাও পারে; এবং সাধারণত মেটে না। ইসলামে স্বামীর পক্ষে তালাক দেয়া এতো সহজ ও সুবিধাজনক যে ওই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে তার পক্ষে একই সাথে অসংখ্য স্ত্রী রাখা সম্ভব; এবং আরব অঞ্চলে ধনীরা এ-সুবিধা নিয়ে থাকে। আরব অঞ্চলে ‘ইদ্দা’ নামক একটি বিধান রয়েছে। ওই বিধান অনুসারে স্বামী তিন মাসের জন্যে স্ত্রীকে তালাক দিতে পারে; এবং তারপর তাকে ফিরিয়ে আনতে পারে। এ-সময়ে স্বামীটি আরেকটি বিয়ে করতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে স্বামীটি ঘরে চারটি স্ত্রী রাখতে পারে, এবং আরো চারটি রাখতে পারে ‘ইদ্দা’ তালাকে বেঁধে। অর্থাৎ এ-সময়ে তার থাকে চারটি সক্রিয় স্ত্রী, আর চারটি ছুটিভোগরত স্ত্রী। এভাবে সে চারটিকে ঘরে ও চারটিকে তালাক-ছুটিতে রেখে সম্ভোগ করতে পারে অসংখ্য নারী। এ হচ্ছে ইসলামে নারীর মর্যাদা [দ্র নওঅল (১৯৮০, ২০৬)]। মুসলমান স্বামী কোনো কারণ না দেখিয়েই যে-কোনো সময় শুধু তিনবার ‘তালাক’ উচ্চারণ ক’রে স্ত্রীকে ছেড়ে দিতে পারে; তবে স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিতে পারে না। স্ত্রীর তালাক দেয়ার সহজাত স্বাধীন অধিকার নেই। তবে স্ত্রীও স্বামীকে তালাক দিতে পারে, যদি বিয়ের কর্কশ। কবিনে স্বামী তাকে সে-অধিকার দিয়ে থাকে! তালাক দেয়ার প্রভু হচ্ছে পুরুষ, সে কোনো কারণ না দেখিয়ে একের পর এক স্ত্রী তালাক দিতে পারে; আর নারীকে ওই অধিকার পেতে হয় প্রভুরই কাছে থেকে। স্ত্রী স্বামীকে তালাক দিলে দেনমোহরটুকুও সে পায় না, আর স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিলে স্ত্রী শুধু দেনমোহর ছাড়া স্বামীর সম্পত্তির একরাত্তিও পায় না, দেনমোহর আদায় করাই হয়ে ওঠে কঠিন কাজ। বাঙলাদেশে বহুবিবাহ ও তালাকরীতির কিছুটা পরিবর্তন ঘটেছে মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ (১৯৬১) গৃহীত হওয়ার পর। তবে এ-আইনও বহুবিবাহ নিষিদ্ধ করে নি, শুধু সামান্য নিয়ন্ত্রণের, এবং তালাকে পুরুষের স্বেচ্ছাচারিতা হ্রাসের চেষ্টা করেছে। নারী এখনো হয়ে আছে শরিয়ার শিকার।
নারীর শত্রুমিত্ৰ: রুশো, রাসকিন, রবীন্দ্রনাথ, এবং জন স্টুয়ার্ট মিল
পিতৃতন্ত্র সৃষ্টি করেছে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, সভ্যতা; তৈরি করেছে ধর্ম, দর্শন, আইন, সাহিত্য, বিজ্ঞান, শিল্পকলা; এবং পৃথিবী ভ’রে জন্ম দিয়েছে তার প্রাতঃস্মরণীয় পুরুষ প্রতিভাদের। ওই প্রতিভারা মনীষী, মানুষপ্ৰজাতির গৌরব; অমর তাঁরা। তাঁদের স্তবে মুখর মানুষ; পুরুষেরা মুখর, পুরুষের কাছে শুনে শিখে নারীরাও মুখর। পুরুষ নারীদের এমনভাবে ছাঁচে ফেলে নিজেদের উপযুক্ত ক’রে নিয়েছে যে নারীরা স্তব করে নিজেদের শত্ৰুদেরও। পুরুষ প্রতিভারা বিকাশ ঘটিয়েছেন সভ্যতার, মানুষপ্ৰজাতির অনন্ত সম্ভাবনার প্রতিমূর্তি তারা; তাদের ছাড়া মানুষের কয়েক হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস অন্ধকার। মহাকালের আলোকশিখা তারা; বাল্মীকি, ব্যাস, হোমার, সফোক্লিস, প্লাতো, আরিস্তাতল, দান্তে, শেক্সপিয়র, কনফুসিয়াস, রুশো, রবীন্দ্রনাথের মতো অজস্র শিখায় উজ্জ্বল সৌরলোক। ওই শিখার পুরুষের শিখা, ওই প্রতিভার পুরুষতন্ত্রের প্রতিনিধি, ওই মনীষীরা সবাই পুরুষতন্ত্রের পুরোহিত। তারা, প্রায়-সবাই, মানুষ বলতে বুঝেছেন নিজেদের লিঙ্গকে অর্থাৎ পুরুষকে; নারীকে মনে করেছেন। শুধুই নারী, মানুষ নয় বা বিকলাঙ্গ মানুষ। পুব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণে জন্মেছেন যতো মহাপুরুষ, তারা সবাই মগজ চূৰ্ণবিচূর্ণ ক’রে ভেবেছেন পুরুষের বিকাশ, প্রতিষ্ঠা ও মহিমার কথা, নারীকে করেছেন উপেক্ষা; আর যখন নারীর কথা ভেবেছেন, তখন তাৰে- দেখেছেন অবিকশিত মানুষরূপে, যার কোনো স্বায়ত্ত্বশাসিত অস্তিত্ব নেই। তাঁদের কাছে নারী হচ্ছে পুরুষের পাদটীকা। তাঁরা রচনা করে গেছেন বহু বাণী, ওই বাণী পৃথিবীকে এগিয়ে দিয়েছে এবং পেছনের দিকে টেনে ধরেছে; তাদের উদঘাটিত অনেক সত্য আলো দিয়েছে, আবার তাদের অজস্র মিথ্যা অন্ধকার ক’রে রেখেছে মানুষের চারপাশ। ওই অন্ধকার কেটে নতুন আলো সৃষ্টি করতে লাগছে দীর্ঘ সময়, ওই অন্ধকার রখনো কাটে নি। নারী সম্পর্কে তারা ছড়িয়েছেন অন্ধকার, রচনা করেছেন অভিনব অনন্ত কুসংস্কার; আর পুরুষতন্ত্র তাদের অন্ধকার ও কুসংস্কারে ঢেকে রেখেছে নারীকে। প্রাচীন থেকে আধুনিক কাল পর্যন্ত পুরুষতন্ত্রের মনীষীদের নারীবিষয়ক সমস্ত সিদ্ধান্ত ভুল ও প্রতিক্রিয়াশীল, এবং নারীদের জন্যে অশেষ ক্ষতিকর। নারীদের সম্পর্কে পুরুষরা বইয়ের পর বই লেখে, বিধানের পর বিধান দেয়। ভার্জিনিয়া উলফ (১৯২৯, ৪০-৪১) নারীদের সম্বোধন ক’রে বলেছেন :
