পুরুষতন্ত্রের তৈরি এক ঐশী ভাবাদর্শ স্বামী, যা পুরুষকে উত্তীর্ণ করেছে নারীর বিধাতার স্তরে। হিন্দু নারীরা স্বামীকে পুজো করে, হিন্দু নারীর জন্যে স্বামী ছাড়া আর কোনো প্ৰভু নেই; মুসলমান নারীর বেহেস্তও স্বামীর পদতলে, এবং হাদিসে আছেআল্লা ছাড়া আর কাউকে সেজদা করার বিধান যদি থাকতো, তাহলে নারীকে নির্দেশ দেযা হতো স্বামীকে সেজদা করার। বাঙলায় ‘স্বামী’ শব্দ ও ধারণাটি এখন অশ্লীল হয়ে উঠেছে, এটা এখন পরিহার্য শব্দগুলোর একটি; রোকেয়া অনেক আগেই বাতিল করেছিলেন ‘স্বামী’ ধারণাটি। এটিকে বাতিল করার অর্থ হচ্ছে পুরুষতন্ত্রের একটি বড়ো মন্দিব ধ্বংস করা। রোকেয়া বলেছেন, ‘তাঁহারা ভূস্বামী, গৃহস্বামী প্রভৃতি হইতে হইতে ক্ৰমে আমাদের স্বামী হইয়া উঠিলেন। আর আমরা ক্রমশঃ তাঁহাদের গৃহপালিত পশুপক্ষীর অন্তর্গত অথবা মূল্যবান সম্পত্তি বিশেষ হই। পড়িয়াছি (রোর, ১৮-১৯)! তিনি দাবি করেছেন নারী দাসীত্ব করে, তবে পুরুষও প্রেমবশত একধরনের দাসত্ব করে, কিন্তু পুরুষকে ‘দাস’ বলা হয় না। তিনি প্রশ্ন করেছেন, সমাজ তবু বিবাহিত পুরুষকে ‘প্রেম-দাস’ না বলিয়া স্বামী বলে কেন’ (রোর, পাদটীকা, ১৯)? ‘স্বামী’ তাঁর কাছে অত্যন্ত আপত্তিকর শব্দ; প্রশ্ন করেছেন, শ্ৰীমতীগণ জীবনের চিরসঙ্গী শ্ৰীমানদিগকে ‘স্বামী’ ভাববেন কেন’ (রোর, ৪৩)? তিনি এ-শব্দটি বাতিল ক’রে প্রস্তাব করেছেন একটি নতুন শব্দ : ‘আশা করি এখন ‘স্বামী’ স্থলে ‘অর্ধাঙ্গ’ শব্দ প্রচলিত হইবে’ (রোর, ৪৪)।
রোকেয়া প্রথাগত ছকবাধা নারীভাবমূর্তি বা ‘স্টেরিঅটাইপ স্বীকার করেন নি; তিনি ওই ভাবমূর্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়ে তা বর্জন করেছেন। নারী হবে সীতা বা রহিমা, হবে মর্ষকামিতার উদাহরণ, পুরুষতন্ত্র তৈরি করেছে এমন ধারণা; তিনি তা বাতিল করেছেন। রোকেয়া বলেছেন, ‘এ দেশের গ্রন্থকারেরা নারী চরিত্রকে নানা গুণ ভূষায় সজ্জিত করেন বটে; বেশীর ভাগে অবলা হৃদয়ের সহিষ্ণুতা বর্ণনা করা হয় (কারণ রমণী পাষাণ প্ৰায় সহিষ্ণু না হইলে তাহার প্রতি অত্যাচারের সুবিধা হইত না যে!)’ (‘ডেলিশিয়া-হত্য’, রোর, ১৫৫)। পুরুষতন্ত্র নারীকে ক’রে তুলেছে মর্ষকামিতার উদাহরণ, সে-নারীই পুরুষতন্ত্রের প্রশংসিত যে সহ্য করে অসহ্য পীড়ন; কিন্তু রোকেয়া তা মানেন নি। তিনি (রোর, ৩৬-৩৭) বলেছেন :
‘নারীকে শিক্ষা দিবার জন্য গুরুলোকে সীতা দেবীকে আদর্শরূপে দেখাইয়া থাকেন।… পুতুলের সঙ্গে কোন বালকের যে-সম্বন্ধ, সীতার সঙ্গে রামের সম্বন্ধও প্রায় সেইরূপ।… রামচন্দ্ৰ ‘স্বামিত্বের’ ষোল আনা পরিচয় দিয়াছেন!! আর সীতা?–কেবল প্ৰভু রামের সহিত বনযাত্রার ইচ্ছা প্ৰকাশ কবিয়া দেখাইয়াছেন যে, তাহারও ইচ্ছা প্ৰকাশের শক্তি আছে।‘
তিনি সীতার এক প্রতিরূপ তৈরি করেছেন পদ্মরাগ-এ, যার নাম সিদ্দিকা। রামায়ণ-এ রাম ত্যাগ করেছিলো সীতাকে, পদ্মরাগ-এ নেয়া হয় তার প্রতিশোধ : সিদিকা ত্যাগ করে স্বামীকে। সমগ্ৰ নারীসমাজের পক্ষে প্ৰতিশোধ নেয়ার জন্যে কয়েক হাজার বছরের প্রস্তুতি নেয় একটি নারী, তাকে সৃষ্টি করেন রোকেয়া, তার নাম সিদ্দিকা। রোকেয়ার পদ্মরাগ, অসাধারণ উপন্যাস নয়, কিন্তু এতেই ঘটে এক অসাধারণ ঘটনা : এই প্রথম পূর্বদেশের এক নারী পরিত্যাগ করে পুরুষকে, তার স্বামীকে। সিদ্দিকা বলেছে (রোর, ৪৫৩) :
‘আমি যদি উপেক্ষা লাঞ্ছনার কথা ভুলিয়া গিয়া সংসারের নিকট ধরা দিই, তাহা হইলে ভবিষ্যতে এই আদর্শ দেখাইয়া দিদিমা ঠাকুমাগণ উদীয়মানা তেজস্বিনী রমণীদের বলিবেন, ‘আর রােখ তোমার পণ ও তেজ- ঐ দেখ না, এতখানি বিড়ম্বনাব পরে জয়নব আবার স্বামী-সেবাই জীবনের সার করিয়াছিল।’ আর পুরুষ-সমাজ সগৰ্বে বলিবেন, ‘নারা যতই উচ্চশিক্ষিতা, উন্নতমনা, তেজস্বিনী, মহীয়সী, গবীয়সী হউক না কেন,- ঘুরিয়া ফিৱিযা আবাব আমাদের পদতলে পড়িবেই পড়িবে!’ আমি সমাজকে দেখাইতে চাই, একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী-জন্মের চরম লক্ষ্য নহে; সংসারধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে। পক্ষান্তরে আমার এই আত্মত্যাগ। ভবিষ্যতে নারীজাতির কল্যাণের কারণ হইবে বলিয়া আশা করি।‘
সিদ্দিকা পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তার অতীতের, বর্তমানের, ভবিষ্যতের সমস্ত সমস্ত নারীর পক্ষে। সে দেখিয়েছে ‘একমাত্র বিবাহিত জীবনই নারী-জন্মের চরম লক্ষ্য নহেঃ সংসারধর্মই জীবনের সারধর্ম নহে।’ পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এমন স্পষ্ট উচ্চারণ ও পদক্ষেপ সমগ্র বাঙলা সাহিত্যে দুর্লভ; সিদ্দিকা শুধু মনে করিয়ে দেয় ইবসেনের নোরাকে। লতিফ জানতে চেয়েছে, ‘সিদ্দিকী, স্পষ্ট বল, তুমি আমার গৃহিণী হইবে কি না?’ সিদিক বলেছে, ‘না। তুমি তোমার পথ দেখ, আমি আমার পথ দেখি’ (রোর, ৪৫৯)। সিদিক নিষ্ঠুর নয়, সে যেমন বিবাহবিচ্ছেদ চায় নি, তেমনই চায় নি। স্বামীর পায়ের নিচে বেহেস্তও। সিদ্দিকা হয়ে উঠেছে বিশ্বপুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীতন্ত্রের কণ্ঠস্বর, এবং সে শুধু কথা বলে নি, বাস্তবায়িত করেছে নিজের লক্ষ্য। সমগ্ৰ নারীজাতির দায়ভার সে তুলে নিয়েছে নিজের কাঁধে। রোকেয়া কোনো মধুর মোহ জাগিয়ে রাখতে চান নি, পাঠকের মনে এমন কোনো রোম্যানটিক ভাববিলাস লালনের সুযোগ রাখেন নি যে পরে কোনো দিন মিলন ঘটবে সিদ্দিকা আর লতিফের। উপন্যাসের শেষবাক্য দুটি যেমন মানবিকতায় কোমল, তেমনই বিদ্রোহে নির্মম; লতীফ সিদ্দিকার হাত ধরিয়া গাড়ী হইতে নামাইলেন। এই তাহদের শেষ দেখা’ (‘রোর, ৪৬৮)। সিদ্দিকা নোরার থেকেও কঠোর।
