নারী কেনো দাসী হয়েছে, তাও ব্যাখ্যা করেছেন রোকেযা; তাঁর ব্যাখ্যা অনেকটা এঙ্গেলসের (১৮৮৪) ব্যাখ্যার কাছাকাছি। এঙ্গেলস দেখিয়েছেন ব্যক্তিমালিকানা ও পরিবারের উৎপত্তিই নারীর পুরুষাধীনতার মূলে; এবং রোকেয়া (রোর, ১৭) বলেছেন :
‘পুবাকালে যখন সভ্যতা ছিল না, সমাজবন্ধন ছিল না, তখন আমাদের অবস্থা এরূপ ছিল না। কোন অজ্ঞাত কারণবশতঃ মানবজাতিব এক অংশ (নর) যেমন নানা বিষয়ে উন্নতি করিতে লাগিল, অপর অংশ (নারী) তাহার সঙ্গে সঙ্গে সেরূপ উন্নতি করিতে পাবিল না বলিয়া পুরুষের সহচরী বা সহধর্মিণী না হইয়া দাসী হইয়া পড়িল।‘
তিনি বিশ্বাস করেন যখন সমাজবন্ধন ছিলো না, তখন মুক্ত স্বায়ত্তশাসিত ছিলো নারী। সমাজবন্ধনের মূলেই রয়েছে পরিবার, তাই পরিবারই যে নারীর দাসীত্বের মূল কারণ, তা অস্পষ্ট থাকে নি তার কাছে। পরিবারে পুরুষ হয়েছে প্ৰভু, নারী দাসী। তিনি অবশ্য প্রশ্ন করেছেন, ‘আমাদের এ বিশ্বব্যাপী অধঃপতনের কারণ কেহ বলিতে পারেন কি? সম্ভবত সুযোগের অভাব ইহার প্রধান কারণ। স্ত্রীজাতি সুবিধা না পইয়া সংসারের সকল প্রকার কার্য হইতে অবসর লইয়াছে’ (রোর, ১৭)। সুযোগটা যে নারীকে দেয় নি। পুরুষ, তাও তিনি জানিয়েছেন। যুগ যুগ ধরে দাসত্বের কুপ্রভাব পড়ে দাসদের স্বভাবের ওপর, নারীর ওপরেও পড়েছে; রোকেয়া তাও দেখিয়েছেন চমৎকার ও বিস্তৃতভাবে। ওলস্টোনক্র্যাফটের ভিডিকেশন-এর চতুর্থ পরিচ্ছেদের নাম ‘Observations on the State of Degradation to which Woman is Reduced by Various Causes’: নানা কারণে নারীর যে-অবনতি ঘটেছে, সে-সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ’। রোকেয়ার প্রবন্ধটির নাম ‘আমাদের/স্ত্রীজাতির অবনতি’ বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ওলস্টোনক্র্যাফটু দেখিয়েছেন নারীকে বন্দী করার পর তার মানসিক শক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট ক’রে ফেলা হয়েছে, নারীকে শেখানো হয়েছে তুচ্ছ রূপ, বিনোদন, ভাবাবেগ প্রভৃতিতে মেতে থাকতে, আর তারাও বোধ করেছে ‘নিকৃষ্টতায় মহিমান্বিত’! রোকেয়াও বলেছেন একই কথা : ‘আমাদের মন পর্যন্ত দাস (enslaved) হইয়া গিয়াছে’ (রোর, ১৭)। ওলস্টোনক্র্যাফটু রূপচর্চা, অলঙ্কার, বিনোদন, উপন্যাস পড়া, শারীরিক ও মানসিক বলহীনতাকে আক্রমণ করেছেন। প্রবলভাবে, রোকেয়াও তাই করেছেন। রোকেয়া বলেছেন, ‘সৌন্দর্যবর্ধনের চেষ্টাও কি মানসিক দুর্বলতা নহে* (রোর, ২১)? তিনি প্রশ্ন করেছেন, ‘আমরা শারীরিক বল, মানসিক সাহস, সব কাহার চরণে উৎসর্গ করিয়াছি (রোর, ২৪)? ওলস্টোনক্র্যাফটের মতোই বলেছেন, ‘শরীর যেমন জড়পিণ্ড, মন ততোধিক জড়’ (রোর, ২৫); বলেছেন, আমাদের শয়ন-কক্ষে যেমন সূর্যালোক প্রবেশ করে না, তদুপ মনোকক্ষেও জ্ঞানের আলোক প্রবেশ করিতে পায় না’ (রোর, ২৬); বহুকাল হইতে নারী-হৃদয়ের উচ্চ বৃত্তিগুলো অঙ্কুরে বিনষ্ট হওয়ায়, নারীর অন্তর, বাহির, মস্তিষ্ক, হৃদয় সবই “দাসী” হইয়া পড়িয়াছে’ (রোর, ১৮)।
রোকেয়া ভিন্ডিকেশন পড়েন নি ব’লেই মনে হয়, পড়লে নারীর অধিকার সম্পর্কে হয়তো সম্পূর্ণ বইই লিখতেন; কিন্তু কেনো মিল ওলস্টোনক্র্যাফটের সাথে তাঁর? এর এক চমৎকার উত্তর অন্য প্রসঙ্গে তিনি নিজেই দিয়েছেন : ‘বঙ্গদেশ, পাঞ্জাব, ডেকান (হায়দরাবাদ), বোম্বাই, ইংলন্ড- সৰ্ব্বত্র হইতে একই ভাবের উচ্ছাস উখিত হয় কেন? …ইহার কারণ সম্ভবতঃ ব্রিটীশ সাম্রাজ্যের অবলাবৃন্দের আধ্যাত্মিক একতা’ (মতিচুর, নিবেদন)! এ যে প্রচণ্ড পরিহাস- ব্রিটীশ সাম্রাজ্যের অবলাবৃন্দের আধ্যাত্মিক একতা’- এটাও পুরুষতন্ত্রকেই পরিহাস। তিনি জানেন এটা আধ্যাত্মিক নয় সম্পূর্ণ বাস্তবের একতা, নারীর দাসীত্ব বিশ্বজনীন ব্যাপার। অলঙ্কারের যে-ব্যাখ্যা রোকেয়া (রোর, ১৯-২০) দিয়েছেন, তা নারীকে দাসী থেকে পশুর স্তরে নামিয়ে দিয়েছে :
‘আমাদের অতিপ্রিয় অলঙ্কারগুলি-এগুলি দাসত্বের নিদর্শন বিশেষ! এখন ইহা সৌন্দর্যবর্ধনের আশায় ব্যবহার করা হয় বটে; কিন্তু অনেক মান্যগণ্য ব্যক্তির মতে অলঙ্কার দাসত্ত্বের নিদর্শন (originally hadges of slavery) ছিল। তাই দেখা যায় কারাগারে বন্দীগণ পায় লৌহনির্মিত বেড়ী পরে, আমরা (আদরের জিনিস বলিয়া) স্বর্ণরৌপ্যের বেড়ী অর্থাৎ ‘মল’ পারি। উহাদের হাতকড়ি লৌহ-নির্মিত, আমাদেব হাতকড়ি স্বর্ণ বা রৌপ্য-নির্মিত চুড়িা কুকুরের গলে যে গলাবন্ধ (চমথ-ড়মফফটব্য) দেখি, উহারই অনুকরণে বোধ হয় আমাদের জড়োয় চিক নির্মিত হইয়াছো…গো-স্বামী বলদের নাসিকা বিদ্ধ করিয়া ‘নাকাদড়ী’ পরায়, এদেশে আমাদের স্বামী আমাদের ‘নোলক’ পরাইয়াছেন!! ঐ নোলক হইতেছে ‘স্বামী’ব অস্তিত্বের (সধবার) নিদর্শন!’
নারী শুধু দাসীই নয়, তারও নিম্নস্তরের; তিনি বলেছেন, ‘আমি আজ ২২ বৎসর হইতে ভারতের সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট জীবের জন্য রোদন করিতেছি’ (রোর, ২৭৭)। তিনি দেখিয়েছেন নারী আসলে নিরাশ্রয়, কেননা তার নিজের বলে কিছু নেই; এমনকি নিজের ওপরও নেই নারীর নিজের অধিকার। নারীর সবখানেই থাকে পরাশ্ৰিত; যখন আমরা রাজকন্যা, রাজবধুরূপে প্রাসাদে থাকি, তখনও প্রভু-গৃহে থাকি। যখন… গোশালায় গিয়া আশ্রয় লই,-তখনও অভিভাবকের বাটিতে থাকি।.গৃহ বলিতে আমাদের একটিও পর্ণকুটীর নাই। প্ৰাণী-জগতের কোন জন্তুই আমাদের মত নিরাশ্রয় { নহে। সকলেরই গৃহ আছে- নাই কেবল আমাদের’ (‘গৃহ’, রোর, ৭৪)। মনে পড়ে উলফের এ রুম অফ ও অ্যান্স জেট্রন-এর কথা। পুরুষতন্ত্রকে আক্রমণের জন্যে তিনি নারীর অবস্থানটিকে শনাক্ত ক’রে নিয়েছেন, এবং নারীর বিকৃত স্বভাবের পরিচয় দিয়েছেন।
