কিশোর বন্ধুটির কথার প্রতিবাদ করা আমার পক্ষে সম্ভব হত না। তিনি সত্যকথাই বলতেন, কবি-সাহিত্যিকের শ্রেষ্ঠতা স্বীকার না করে উপায় নেই। তাঁরাই জীবনের সুকুমার বৃত্তিগুলি বাঁচিয়ে রাখেন। গৃহনির্মাণে গৃহস্বামীর যে-স্থান, রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারেও কবি সাহিত্যিকদের সেই স্থান! গৃহস্বামীর ইচ্ছা, অভিরুচি, খেয়াল ও কল্পনার খোঁজ নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার গৃহের প্রান বা পরিকল্পনা তৈরি করেন; পরে ওভারশিয়ার, রাজমিস্ত্রি ও যোগালির সহায়তায় গৃহনির্মাণ কার্য সমাধা করেন। রাষ্ট্রও এভাবেই গঠিত হয়। রাষ্ট্রে বাস করে জীবন। জীবন মূক; তার প্রতিনিধি কবি ও সাহিত্যিক জীবনের ভালোলাগা, মন্দলাগা, আশা-আকাক্ষা, বিচিত্র সাধ ও গভীর অভীপ্সা এঁদের মারফতেই অভিব্যক্ত হয়। রাজনৈতিক চিন্তাবীররা এঁদের জীবনবোধের সহায়তা নিয়ে আদর্শ রাষ্ট্রের পরিকল্পনা করেন। তার পরে আসেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছোট বড় কর্মীদের সহযোগিতায় তারা গড়ে তোলেন জীবনের আকাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্রসৌধ। কবি-সাহিত্যিকের জীবনবোধের দিকে না তাকালে তা হয়ে পড়ে শ্রী-মাধুহীন কাজ-চলা গোছের ইমারত। তাতে সাধারণ জীবন তথা ব্যবসায় বাণিজ্য চলে ভালোই, কিন্তু সুন্দর জীবনযাপন হয়ে পড়ে অচল।
এ-সম্বন্ধে আরেকটি কথা মনে রাখা ভালো। সৌন্দর্যের সাধনা পূর্ণাঙ্গ চেহারার সাধনা, শুধু শিরদাঁড়ার সাধনা নয়। তাই চেহারা সম্বন্ধে আমরা যতটা সচেতন, মেরুদণ্ড সম্বন্ধে ততখানি নই। আমাদের খাওয়া-পরা বিলাস ব্যসন সমস্ত কিছু এই চেহারার সৌন্দর্যের জন্যই। অবশ্য খাওয়াদাওয়ার ফলে শিরদাঁড়াও শক্ত হয়। কিন্তু সেদিকে আমরা সজাগ নই, আমাদের সচেতনতা কেবল চেহারা নিয়ে। আর চেহারার সৌন্দর্য কেবল খাওয়া-পরার উপর নির্ভর করে না, সেজন্য ভাবসাধনারও প্রয়োজন। এমনকি সৌন্দর্যসাধনার ব্যাপারে খাওয়া-পরার চেয়ে ভাবসাধনার দানই বেশি; আর এই ভাৰসাধনার প্রবণতা মেরুদণ্ড বঁকিয়ে দেয়ার দিকে যতখানি, সিধা রাখবার দিকে ততখানি নয়। তথাপি সাধনাকেই আমরা ভালোবাসি। বিশ্রী চেহারার দৃঢ়মেরুদণ্ড মানুষের চেয়ে সুন্দর চেহারার দুর্বলমেরুদণ্ড মানুষই আমাদের প্রিয়–ক্ষীণকায় শিল্পবীরের সঙ্গেই আমরা হাত মেলাতে চাই, বিপুলকায় মপ্লবীরের সঙ্গে নয়। এখানেই মানুষের মনুষ্যত্বের জয়, কেননা এখানেই সে তার আত্মার মূল্য দেয়।
ব্যক্তির জীবনে শিরদাঁড়ার যে-স্থান, জাতির জীবনে রাজনীতির সেই স্থান। শিরদাঁড়া ছাড়া ব্যক্তি চলতে পারে না। আর রাজনীতি ছাড়া জাতি অচল। তথাপি মাত্রাজ্ঞানহীন মেরুদণ্ডের সাধনা যেমন ব্যক্তির পক্ষে মারাত্মক, মাত্ৰাজ্ঞানহীন রাজনীতির সাধনাও তেমনি জাতির পক্ষে অশুভকর। কেননা, উভয় ক্ষেত্রেই সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে আত্ম বিকৃত হয়ে যায়। জাতি যদি কেবল রাজনীতির সাধনা করে তো তার মেরুদণ্ড ষাড়ের মতো শক্ত হয় বটে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার চেহারাটিও ষাড়ের মতোই কদর্য হয়ে ওঠে। রাজনীতিসর্ব ষণ্ডামার্কা জাতিরা মৌতাতের জন্য মানুষের মতো কোলাকুলি বা করকম্পন না করে ষাড়ের মতো গুঁতোগুঁতি করে। ফলে শান্তি ও শৃঙখলা লণ্ডভণ্ড হয়ে পৃথিবীর সর্বনাশ হয়–মানুষের জীবনে মূল্যবান বলে আর কিছু থাকে। না। প্রতিকারস্বরূপ মনে রাখা দরকার, মেরুদণ্ড বাঁচার লক্ষ্য নয়, উপায় মাত্র রাজনীতিও জাতির লক্ষ্য নয়, উপলক্ষলক্ষ্য সৌন্দর্যধ্যান ও আনন্দসাধনা। লক্ষ্যের স্থান উপলক্ষ তথা দেবতার স্থানে বাহনকে বসিয়ে পূজা করলে কালের হাতে শাস্তি পেতে হয়, আর যুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার ভেতর দিয়ে আমরা সেই শাস্তিই পেতে থাকি।
ওপরের যে বন্ধুটির কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে আবার আমার দেখা হয় কিছুদিন আগে। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ল ও অর্থনীতিতে এম, এ. পড়ছেন। দেখলুম, তার চেহারার পরিবর্তন হয়েছে–আত্মতুষ্টি আর স্ফুর্তি বেদনার স্থান নিয়েছে। তবু সমব্যথী পেয়েছি ভেবে আমার স্বভাব অনুযায়ী তাকে সমাজের মানসিক দৈন্যের কথা বললুম–সমাজ-যে প্রগতিশীল হওয়ার পরিবর্তে দিনদিন পিছিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে ঝাঝালো সুরে ইঙ্গিত করলুম; কিন্তু তাতে তাঁর পূর্বপরিচিত সংবেদনশীল চিত্তের সাড়া পেলুম না। বরং আমার কথায় একটুখানি হেসে নিশ্চিন্তে সিগারেট টানতে টানতে ও পান চিবুতে চিবুতে বললেন : সমাজের দোষ কী? এখন অর্থনীতির ক্ষেত্রে সমাজ যে-স্তরে দাঁড়িয়ে আছে তাতে তার কাছে এর বাড়া আর কিছুই আশা করা যায় না। অর্থনীতিই তো জীবনের ভিত্তি কাজেই আফসোস করে লাভ নেই।
আমি নৈরাশ্যমিশ্রিত সুরে বললুম: কিন্তু সেই অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনের কোনো সুষ্ঠু ব্যবস্থা হচ্ছে কি? কতিপয়ের বড় হওয়ার দিকেই তো সমাজের দৃষ্টি, সাধারণের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার দিকে নয়।
তিনি আশ্বাসের সুরে বললেন :হ্যাঁ হচ্ছে বৈকি? এই-যে লোকেরা চাকরি পাচ্ছে এতেই সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে।
আমি : কিন্তু খুব আশানুরূপ এগিয়ে যাচ্ছে কি?–অন্তত চিন্তাভাবনার ক্ষেত্রে?
তিনিঃ হ্যাঁ, যাচ্ছেই তো। হিন্দুসমাজ কি আর একদিনে এতদূর এগিয়ে এসেছে? আস্তে আস্তে এগিয়ে এসেছে। আমরাও আস্তে আস্তে এগিয়ে যাব। রোম নগরী একদিনে নির্মিত হয়নি, মনে রাখবেন।
