মানুষ শুধু উদ্বর্তনে তৃপ্ত থাকতে পারে না, বিকাশই তার জন্য প্রয়োজনীয় আর তাতেই মনুষ্যত্বের জয়। উদ্বর্তনের জন্য অত্যধিক উদ্বেগ বিকাশের প্রতিকূল। কেননা, তা শুধু সঙ্কীর্ণ বৃদ্ধি-আশ্রিত সন্দেহ ও ঘৃণা-বিদ্বেষকে বড় করে তোলে, আর সন্দেহ-বিদ্বেষ বিকাশের সহায় নয়, অন্তরায়। সেজন্য প্রয়োজনীয় উদার বুদ্ধি লালিত আনন্দ আর প্রেম আলোক আর মাধুর্য। কথায় বলে সাবধানের মার নেই, কিন্তু আসলে অতি-সাবধানেরই আত্মিক মৃত্যু ঘটে। ভয়ার্ততার ফলে তার আত্মা সঙ্কুচিত ও মলিন হয়ে যায়। আত্মরক্ষার তাগিদে যে জীবনের অধোগতি ঘটে, অন্তত উন্নয়ন হয় না, উদ্ভিদজগতের দিকে তাকালে তা সহজে উপলব্ধি করা যায়। পশুদের সঙ্গে সগ্রামে টিকে থাকার উদ্দেশ্যেই কোনো কোনো বৃক্ষ তিক্ত বা উগ্রগন্ধযুক্ত দেহ নিয়ে অঙ্কুরিত হয়। বেল ও লেবু পাতার উগ্রগন্ধ ও তাদের দেহে কাটার উৎপত্তি পশুদের সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকার তাগিদেই। এমন যে গোলাপ, এককালে সেও বন্যপুষ্প ছিল, গায়ের কাঁটা দেখলেই তা টের পাওয়া যায়। মানুষের হাতে পড়ে এখন সে সভ্য-ঘ্য হয়েছে। এখন সে দুর্বল, অসহায়–বেড়ার ভিতর ছাড়া বাড়তে পারে না। সভ্য মানুষও একপ্রকার দুর্বল মানুষ রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধান ছাড়া বাঁচতে পারে না! গোলাপের জন্য যেমন বেড়া, মানুষের জন্য তেমনি রাষ্ট্র। রাষ্ট্রছাড়া মানুষ সভ্য-ভব্য হয়ে বাঁচতে পারে না। রাষ্ট্র যেমন মানুষকে রক্ষা করে, রাষ্ট্রকে রক্ষা করাও তেমনি মানুষের কর্তব্য হয়ে পড়ে। কিন্তু যেদিন রাষ্ট্র বলে : আমিই, আমাকে রক্ষা করো, তোমাদের নিজের দিকে তাকাবার দরকার নেই, আমার পূজা করাই তোমাদের জীবনের সার্থকতা; সেদিন সত্যই মানুষের দুর্দিন, সেদিন মানুষের সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়।
গোলাপের কাছে যদি ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ নীতি বারবার আওড়ানো যায়, আর বলা হয় যে, গরু-ছাগলরা তাকে গ্রাস করবার জন্য চারদিকে ওত পেতে আছে, তো পাপড়িগুলি কাঁটায় পরিণত হয়ে গোলাপের গোলাপত্ব নষ্ট হতে বিলম্ব হবে না। অচিরেই তার সৌন্দর্য যাবে ধসে, আর তার কদর্যতা ও কাঠিন্য মাথা উঁচিয়ে আত্মঘাষণা করবে।
মনুষ্যত্ব সম্বন্ধেও একথা খাটে। সঙ্কীর্ণতা মনুষ্যত্ব-গোলাপের পাপড়িগুলিকে কাটায় পরিণত করে। সঙ্কীর্ণতার গোড়ায় ভয়–খেয়ে ফেলবে এই শঙ্কা ‘সারভাইভাল অব দি ফিটেস্ট নীতি এই ভীতির পরিপোষক। তা শত্রুর কথা মনে করিয়ে দেয়, ভুলিয়ে দেয় না; আর শত্রুকে না-ভুলতে পারলে সুন্দর হওয়া যায় না। হিন্দু-মুসলমান পরস্পরকে কালো রঙে চিত্রিত করে দেখলে তাদের লাভ হবে না, ক্ষতি হবে-সে কালোর প্রভাব কালিমা লেপনকারীর চরিত্রেও লাগবে। অপরকে ভালো ভেবেই আমরা ভালো হতে পারি, খারাপ ভেবে নয়। বাঘ বা সাপের সঙ্গে বাস করছি এই সচেতনতা মনুষ্যত্বের পরিবর্তে পশুত্বকেই বঁচিয়ে রাখে। কূটবুদ্ধি ও হ্রস্বদৃষ্টি রাজনীতিক তা বুঝতে পারেন না বলে ভিন্ন সমাজের দুরভিসন্ধি ও চক্রান্তকে বড় করে তুলে নিজের সমাজের ক্ষতিই করেন, কল্যাণ নয়। মানুষকে ভালো ভাবতে হবে নিজের ভালোর জন্যই নিজের ভিতরের শ্রেষ্ঠ বৃত্তিগুলিকে সক্রিয় রাখবার এই একমাত্র উপায়। ভয় ও সন্দেহ জীবনের পক্ষে মারাত্মক, এই বিশ্বাস না থাকলে জীবন অসুন্দর হয়ে পড়ে, খোশমেজাজ ও বহাল তবিয়ত নষ্ট হয় আর তা নষ্ট হলে মানুষের ভালো কাজের মূল্য দেওয়া যায় না। উত্তেজনার বশে কৃত মহৎ কাজেরও মূল্য কম। তাই ‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ নীতি জোরেশোরে প্রচার না করাই ভালো। যদি একান্তই বলতে হয়, তবে তা যেন দুর্বলের কানে কানে বলা হয়, সবলের কানে কানে নয়। সবলকে তা করে তুলবে অত্যাচারী ও স্বাধিকার প্রমত্ত অত্যাচারের দার্শনিক সমর্থন পেয়ে সে শক্তির অপব্যবহার করবে।
মানুষের জন্য বড় নীতি প্রেমের নীতি, হিংসা বা বিদ্বেষের নীতি নয়। যোগ্যতমের উদ্বর্তন মতবাদ এই প্রেমের নীতিতে অবিশ্বাসী করে মানুষকে সর্বনাশের পথে চালায়। প্রয়োজনীয় মন্দ ব্যাপার ( Necessary evil) যখন জীবনের সারবস্তু ( Summum bonum of life) হয়ে ওঠে, তখন জীবনের আর কিছুই থাকে না প্রকৃত ঐশ্বর্যের ব্যাপারে তা একেবারেই ফতুর হয়ে পড়ে। বাঁচার সাধনা আর ঐশ্বর্যের সাধনা এক নয়, ঐশ্বর্যের জন্য ত্যাগের প্রয়োজন। ছোট জিনিসের দাবিকে না দমালে বড় জিনিসের দাবি বড় হয়ে উঠতে পারে না। বাঁচার সাধনার আধিক্যের ফলে মানুষের ভেতরের ছোট মানুষটিই প্রাধান্য লাভ করে, বড়মানুষটি নষ্ট হয়ে যায়। সেবার অভাবে দেবতা অন্তর্হিত হন, মন্দির খালি পড়ে থাকে।
‘যোগ্যতমের উদ্বর্তন’ নীতির সুস্পষ্ট প্রকাশ অর্থ-প্রতিপত্তির লোভে। চরিত্রকে কলুষিত করতে এর মতো আর দ্বিতীয় কিছুই নেই। এই লোভের হাতে যারা ধরা দেয়, তাদের অবস্থা সত্যই মারাত্মক হয়ে পড়ে। অচিরেই তারা জীবন্ধনে বঞ্চিত হয়ে দীন হয়ে পড়ে। তাদের না থাকে সৌন্দর্যবোধ, না থাকে আনন্দ গ্রহণের ক্ষমতা। তাদের জীবন হয়ে পড়ে ফাঁকা, আর সেই ফাঁক পূর্ণ করবার জন্য তাদের অর্থ প্রতিপত্তি লাভের চেষ্টা আরও বেড়ে চলে। ফলে ধন যত বাড়ে, জীবন তত নির্ধন হতে থাকে। সিন্দুক যত ভর্তি হয়, অন্তর তত শূন্য হতে থাকে। এই শূন্য জীবন নিয়ে অর্থ প্রতিপত্তির জোরে তারা সমাজের নেতা হয়ে দাঁড়ায়, আর নিজের শূন্যতা তথা কদর্যতা (কেননা, বাগান খালি থাকে না, ফুলগাছ না থাকলে কাঁটাগাছ থাকে) সমাজদেহে সংক্রমিত করে সমাজের অশেষ ক্ষতি করে।
