৮
তমিস্রা পঞ্চম নিশা, গগন মণ্ডলে।
ভীষণ আঁধার বসি, ঘন বনতলে ||
নীরব নিস্পন্দ তম, সঙ্গীতের আশে।
সময় হইল তবু, সে ধ্বনি না আসে ||
বিকট আননে ভয়, ঘুমায় কাননে।
দেখে স্তব্ধ স্পন্দহীন, যত তরুগণে-
পাপান্ধ-তিমিরময়, যেন কার মন,
নীরবে করাল কার্য্য, করিছে কল্পন ||
শুষ্ক শুষ্ক পাতা খসি, মাঝে মাঝে পড়ে।
যথা পড়ে তথা পচে, নাহি আর নড়ে ||
পাইয়া অলক্ষ্য লক্ষ্য, কুসুমের বাস।
আমোদে আঁধার দেহ, না ছাড়ে নিশ্বাস ||
পত্র-চন্দ্রাতপ তলে, ক্ষুদ্র খাল চলে।
নাহি দেখা যায় ভাল, নাহি শব্দ জলে ||
ঘুমায়ে পড়িলে জলে, পুষ্পবৃক্ষাবলী।
আঁধারে কলিকাগুচ্ছ, নিরখি কেবলি ||
নীরবে ঝরিয়া ফুল, স্তব্ধে ভেসে যায়।
পতিহীনা বিরহীর, প্রেম আশা প্রায় ||
শুষ্ক ফল খসি জলে, পড়ে একবার।
অমনি চমকে বুক, মন্মথ বামার ||
অন্ধকার মাঝে আলো দুয়ের বদন।
বরষার শশী যেন, মেঘে আচ্ছাদন ||
ভীম স্তব্ধে ভয়ে ভীত, বসি তারা তথা।
উড়ু উড়ু করে প্রাণ, নাহি সরে কথা ||
ভাবে আজি কেন, এত কাঁদিছে অন্তর।
বলিতে বলিতে নারে, হৃদি গরগর ||
সুখের কাননে আজি, কেন কাল ভাব।
ভীষণ স্বপন যেন, দেখিছে স্বভাব ||
আপনি নয়ন কেন, ঝরে অকারণ।
বুঝি আজি ছেড়ে যাবে, জীবন রতন ||
হৃদে ধরি পরস্পরে, মুখপানে চায়।
কেঁদে যেন কি বলিবে, বলিতে না পায় ||
ললিতা লুকাল মাথা, প্রাণনাথ কোলে।
কাঁদিয়ে মুছায় পতি, প্রিয়া আঁখিজলে ||
৯
এখনো এলো না কেন সঙ্গীতের ধ্বনি।
ভীষণ নীরব! হা রে! আছে কি ধরণী?
অকস্মাৎ কোথা হয় গভীর গর্জ্জন।
কাঁপিল গভীর বন কাঁপিল দুজন ||
অদ্ভুত নিনাদ উড়ে যায় বন দিয়ে।
অন্ধকার ভীমতল হইল আসিয়ে ||
ভীমতর নাদে যেন কাঁপে নভ হৃদি।
কাঁদিয়া উঠিল দোঁহে, “হা বিধি! হা বিধি!”
১০
গভীর জলদ নাদ, গড়ায় আকাশ ছাদ,
থেকে থেকে উচ্চতর স্বনে।
পবন করিছে জোর, যেন সাগরের সোর,
হুঙ্কারে গরজে প্রাণপণে ||
বারেক চঞ্চলাভায়, দেখি নীল মেঘ গায়,
কটা মাথা নাড়ে ক্ষিপ্তবন।
পাতা উড়ে ঢাকে ঘনে, পড়িতেছে ঘোর স্বনে,
বড় বড় মহীরুহগণ ||
ঘোরতর চীৎকার, লক্ষ লক্ষ অনিবার,
মানুষ চিবায় ভূতগণে।
সমুদ্র সমান সোরে, বরিষা আছাড়ে জোরে
রেগে রেগে গর্জ্জে বায়ু সনে ||
উপরি উপরি ধ্বনি, আছাড়ে সহস্রাশনি,
খণ্ডে খণ্ডে ছেঁড়ে বা গগন।
বিদারিয়ে বিটপীরে, বজ্রাগ্নি পোড়ায় শিরে,
কাঁদে যত সিংহ ব্যাঘ্রগণ ||
১১
ভীষণ নীরব। যেন মরেছে ধরণী।
হে ধাতঃ কাঁপালো স্তব্ধ আবার কি ধ্বনি ||
বলিছে গম্ভীর স্বরে, “রে নরযুগল।
দেবের নিকুঞ্জে এসে পাও কর্ম্মফল ||”
ফিরে বার ঘর ঘর, গরজিল জলধর,
মাতিল মরুৎ ফিরে বার।
চেচায় অশনি ঘন, ভীমবলে তরুগণ,
মত্ত শির নাড়িছে আবার ||
১২
থামিল ঝটিকারণ, হলো নিশাশেষ।
শ্বেতমেঘময়াকাশে, উদিল নিশেশ ||
জলে করে জলময়, কানন নিকুঞ্জ।
তরু লতা তৃণ ভূম, পুষ্পলতা পুঞ্জ ||
ফুলময় ছোট খাল বিমল চঞ্চল।
ছায়াকারী শাখা হতে ঝরে বিন্দুজল ||
উজ্জ্বল পুলিনতলে ম্লান তারা মত।
মরিয়ে রয়েছে ঝড়ে ললিতা মন্মথ ||
মানবের কি কপাল! সংসার কি ছার!
বহিতে জীবন ভার কে চাহিবে আর
নাথভুজে মাথা দিয়ে পড়েছে মোহিনী।
মুখে মুখে কাঁদে যেন দুটি সরোজিনী ||
ললিতার মুখশশী ভিজে বরিষায়।
সরোজ শিশির মাথা মাটিতে লোটায় ||
শীতল ললাটে জলে জ্বলে শশধর।
জলে ভিজে পড়ে আছে অলকানিকর ||
ফুটায় কবরী চারু, দীর্ঘ তৃণোপরে।
মন্মথ রয়েছে তবু নাহি তুলে ধরে ||
এখনো সুস্থির মুখ রূপের ছায়ায়।
প্রাণ গেল তবু রূপ নাহি ছাড়ে তায় ||
সেরূপ ঘুমায় যেন, সন্ধ্যা ধরাপরে;
ভয়ে প্রকৃতির যেন নিশ্বাস না সরে ||
স্থির শ্বেত ভাল সেই, নহে নিরমল।
দেখিলে শিহর হয় শরীর বিকল ||
পড়ি তায় মরণের ভয়ঙ্কর ছায়া।
চন্দ্রিকায় যেন কালো, কাদম্বিনী কায়া ||
যেন চন্দ্রকরে স্থির বারিধি বিস্তার।
পড়ে তায় শিখরীর ছায়া অন্ধকার ||
কোমল পল্লব নীল মুদেছে নয়ন।
এরি কি কটাক্ষে ছিল সুখের স্বপন?
এখনি কেঁদেছে কত কাঁদিবে না আর।
সফরী সমান নাহি নাচিবে আবার ||
বুঝি তার প্রিয় তারা মন্মথ বদনে।
চাহিতে চাহিতে বুঝি মুদেছে মরণে ||
মানবের কি কপাল! এই সে হৃদয়।
কোথা তার প্রেম মোহ কোথা আশা ভয়!
বিবাস বিমল পড়ি শশীর কিরণে।
ভিতরে নিস্পন্দ যেন জগৎ এক্ষণে ||
এক বৃন্তে দুটি ফুল মুখে মুখ দিয়ে।
সে হৃদি কুসুমাসনে পড়েছে ছিঁড়িয়ে ||
তেমনি একাঙ্গে এরা থেকে চিরকাল।
মরিল অধরাধরে কি সুখ কপাল ||
যার লাগি ছিল বেঁচে পারিত বাঁচিতে।
তারি সনে মরে গেল তাহারি হৃদিতে ||
সুখের কপাল! কত সংসার যাতনা।
বিকার বিয়োগ শোক সহিতে হলো না ||
ছিঁড়িয়াছে ভীম ঝড়ে একই প্রহারে।
কাটে নি ক্রমশঃ কীট, প্রাণের সুসারে ||
গভীর গোপনগামী সুখ-স্রোতোপরে।
পড়ে নাই ভেসে ভেসে ডুবিতে সাগরে ||
যা হবার হইয়াছে এই মাত্র স্থির।
এই আছে অবশেষ, সে প্রেমশশীর ||
ওইখানে দেহাম্বুজ মাটি হয়ে যাবে।
জানিবে কে? দেখিবে কে? কেঁদে কে ভিজাবে?
চন্দ্রিকার নীলাকাশ গায়, দুটি দেবদারু দেখা যায়।
ভীম বনে তলে তার, অতি স্তব্ধ অনিবার,
কাল যেন প্রহরী তাহায় ||
সেই নদী সেই তরুবরে, দুখময় তর তর স্বরে,
বারেক না ক্ষান্ত আছে, নক্ষত্রমণ্ডলী আছে,
অদ্যাপি বিলাপ কেন করে ||
গম্ভীর সে ধ্বনি নিরবধি, যেন বা সন্ধ্যায় শরন্নদী।
শুনিলে শিহরি স্মরি, মেধার মারুতোপরি,
জানিনে যেতেছি কি জলধি ||
শ্যামলা গুল্মিনী চির নব, ব্যাপিয়াছে সেই স্থান সব।
তারাফুল তারা ধরে, অনন্ত আমোদ করে,
সুধাপানে শিহরিছে নভ ||
এ কাননে গভীর এমন, কে করে রে বাঁশরী বাদন।
অনিবার নিশাভাগে, যেন কার অনুরাগে,
গায়ে সাধে মনের যাতন ||
মোহমন্ত্রে তার স্থির বন, শোনে ধ্বনি-বিহীন স্পন্দন।
পত্রটি নাহিক সরে, যেতে যেতে শুনে স্বরে,
নাহি সরে নীরধরগণ ||
চন্দ্রিকার শূন্য কুঞ্জোপর, মোহন স্বপ্নজ শোভাধর।
কারা যেন শুনে তায়, উড়ে নীল নভ গায়,
মর্ম্মরিত প্রচুর অম্বর ||
তাহে কত সুধাবাস ঝরে, কুসুম বরিষে কুঞ্জোপরে।
ভাঙ্গে স্বপ্ন ঊষা আসি, অমনি নীরব বাঁশী,
গল্যে যায় সে রূপ নিকরে ||
ধূলি হয়ে এই কুঞ্জবনে মন্মথ-মোহিনী নাথ সনে।
প্রতি নিশি এই মত, হয় যথা নিদ্রাগত,
ললিতা মন্মথ দুই জনে ||
বাল্যরচনা
[এই কবিতাগুলি লেখকের পঞ্চদশ বৎসর বয়সে লিখিত। লিখিত হওয়ার তিন বৎসর পরে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত হইয়া বিক্রেতার আলমারীতেই পচে-বিক্রয় হয় নাই। তাহার পর আর এ সকল পুনর্মুদ্রিত করিবার যোগ্য বিবেচনা করি নাই, এখনও আমার এমন বিবেচনা হয় না যে, ইহা পুনর্মুদ্রিত করা বিধেয়। বাল্যকালে কিরূপ লিখিয়াছিলাম, তাহা দেখাইয়া বাহাদুরী করিবার ভরসা কিছুমাত্র নাই; কেন না, অনেকেই অল্প বয়সে এরূপ কবিতা লিখিতে পারে। যাহা অপাঠ্য, তাহা বালক প্রণীত হউক, বা বৃদ্ধপ্রণীত হউক, তুল্যরূপে পরিহার্য্য। অতএব কিছু পরিবর্ত্তন না করিয়া “ললিতা” নামক কাব্যখানি পুনর্মুদ্রিত করিতে পারিলাম না। “মানস” নামক কাব্যখানিতে পরিবর্ত্তন বড় সহজ নহে, এ জন্য সে চেষ্টা করিলাম না। তথাপি সামান্যরূপ পরিবর্ত্তন করা গিয়াছে।]
