দ্বিতীয় সর্গ
১
মরি প্রেম যার মনে, সে কি চায় রাজ্যধনে,
প্রিয়মুখ ত্রিসংসার তায়।
হৃদে তার যে রতন, আলো করে ত্রিভুবন,
অন্য মণি নিবায় বিভায় ||
এক মোহে সদা মত্ত, না জানে আপনি মর্ত্ত্য,
যাহা দেখে তাই প্রেমাকুল।
রবি শশী তারাকাশ, পয়োদ পবনশ্বাস,
সাগর শিখর বনফুল ||
যেন লক্ষ বিদ্যাধরে, সদা কর্ণে গান করে,
কি মধুর শব্দহীন ভাষা।
হেরিয়ে সামান্য কলি, নয়ন সলিলে গলি,
উছলে অনন্ত ভালবাসা ||
প্রেমে যার মন বাঁধা, না পারে দিবারে বাধা,
সমুদ্র শিখর নদী বনে।
কলঙ্ক বিপদ ক্লেশ, ঝটিকার ধরি বেশ,
শিরোপরি গরজয়ে যত।
আশ্রয় করিয়া আশা, প্রণয়ীতে ভালবাসা,
প্রণয়ীর প্রাণে বাড়ে তত ||
জ্বালা সয় নিরবধি, সেও ভাল পায় যদি,
একবার আঁখির মিলন।
দুঃখের গভীর বনে, সেই স্বপ্নে সুখ মনে,
প্রেম রীতি কে জানে কেমন ||
২
চলিল চরণ চন্দ্রবদনী।
ঢলিয়ে ঢলিয়ে মন্দচরণী।
ঊষার প্রখর তারকা ধনী।
চলিল গজেশগামিনী ||
উভয়ে মরেছে হৃদি যাতনে।
উভয়ে পেয়েছে প্রাণরতনে।
কাঁধে কাঁধে ধরি চলে কাননে।
গভীর নীরব যামিনী ||
শিরোপরে শাখা বিনান ঘন।
আসিবে কেমনে শশিকিরণ।
তরল তিমির ভীষণ বন।
দেখিয়া শিহরে কামিনী।
আঁধার আকাশে নক্ষত্রাবলি।
তেমনি কাননে কুসুম কলি।
আমোদে হৃদয়ে যেতেছে গলি।
সে নব নীরদ দামিনী ||
ষণ তিমিরে ভীষণ স্থির।
মাঝে মাঝে খসে পত্র শাখীর।
ধীরে ধীরে ঝরে নির্ঝর নীর।
আঁধারে নিরখে রঙ্গিণী ||
লাগিয়া নির্ঝরে ঈষৎ আলো।
দেখে ফুলময় সে জল কালো।
আঁধারে কুসুম পরশে গাল।
শিহরে সরোজ অঙ্গিনী ||
যেতে পতি সনে চন্দ্রবদনী
মরি কি সঙ্গীত শুনিল ধনী।
ললিত মোহন গভীর ধ্বনি।
নির্ঝর নিনাদ সঙ্গিনী ||
নীরব কানন উঠে শিহরি।
শিহরে দুজনে দুজনে ধরি।
হৃদয়ে হৃদয়ে গাঁথিল মরি।
বাঁধিল মনঃকুরঙ্গিনী ||
৩
স্তব্ধ বনে অন্ধকারে, ভেসে ভেসে চারি ধারে
মোহে তায় দুই জনে, আপনাকে ভুলিল।
দুজনার মুখ চেয়ে, দুজনারে বুকে পেয়ে,
প্রেম আর সেই গানে, এক হয়ে মিলিল |
জ্ঞান পেয়ে কহে কেন, এ গহনে ধ্বনি হেন,
এ ধ্বনি দেবের যেন, চল দেখি যাইয়ে।
আ মরি! কহিছে ধনী, শুনি নাই হেন ধ্বনি,
হরিল কানন ভয়, হৃদয় নাচাইয়ে ||
বনমাঝে যায় যত, ধ্বনি সুনিকট তত,
দেখে শেষে তরু কত, কুঞ্জ এক ঘেরেছে।
স্থির শোভা কিবা তার, বুঝি প্রেম আপনার,
সাধের প্রমোদাগার, তার মাঝে করেছে ||
৪
এ কুঞ্জ হইতে যেন আসিছে সঙ্গীত।
হেন ভাবি দুই জনে আইল ত্বরিত ||
নিকুঞ্জ প্রবেশ মাত্র থামিল সে ধ্বনি।
কানন পূর্ব্বের মত নীরব অমনি ||
আশ্চর্য্য হইয়া দোঁহে রহিলেক স্থির।
দেখিতেছে শোভা কুঞ্জ গগন শরীর ||
কেহ নাই বন কিম্বা গগন ভিতর।
তথাপি কেমনে এলো এ মধুর স্বর ||
ললিতার জ্ঞান হলো প্রবেশ সময়।
যেন কোন স্বপ্ন-দৃষ্ট মত শোভাময়
দুই মনোরম রূপ নারী নরাকারে,
দেখিল চকিত মত নিকুঞ্জের ধারে ||
মন্মথ মোহিনী প্রতি কহিছে হে প্রিয়ে।
দেখি কালিকার দিন এখানে রহিয়ে ||
আজিকার মত যদি কালিকায় হবে।
দেব কি মানব যক্ষ জানা যাবে তবে ||
আজিকার মত এসো রই এই স্থানে।
এমন মোহন স্থান পাবে কোন্খানে ||
৫
মোহিনী মন্মথ সনে মনোমত স্থলে।
এমন যামিনী যাপে এমন বিরলে ||
এমন বিপদহীন বিজন কানন।
এমন বিরল প্রেম গম্ভীর এমন ||
কে জানে সে সত্য কি না স্বপন নিশার।
বলে এলে কে জানিত হেন তবে তার ||
রবে না এমন সুখ মানব কপালে।
ভাবিয়ে বিচল চিত্ত এ সুখের কালে ||
এই ভয় মনোমাঝে হয় আর যায়।
যেন কোন মেঘ-ছায়া পড়িছে ধরায় ||
এই মত গেল নিশি নিকুঞ্জ মন্দিরে।
সে দিন কাটালে সুখে নিশি এলো ফিরে ||
৬
কাননে যামিনী পরকাশে, নিরমল নীলে শশী ভাসে।
নিশীথে নিদ্রিত বন, নিদ্রা যায় মেঘগণ,
নিদ্রা যায় বাতাস আকাশে ||
উঠিল নীরবে আচম্বিত, প্রেমময় ললিত সঙ্গীত।
স্থির শূন্যে ভেসে যায়, গগন গহন তায়,
শিহরিছে পুলক পূরিত ||
যেন কেহ বিরহের জ্বরে, প্রেমময়ী পরশে শিহরে।
নাথহৃদে ছিল ধনী, গলিল শুনিয়ে ধ্বনি,
মোহে মিশে প্রাণে প্রাণেশ্বরে ||
গভীর নিশ্বাসে থামে গান, অবকাশে তারা পায় জ্ঞান।
জানিল সে কালিকার, সেই ধ্বনি পুনর্ব্বার,
হেথা হতে গেছে অন্য স্থান ||
প্রেয়সীরে কহিছে মন্মথ, ধ্বনি যে জুড়ায় শ্রুতিপথ।
এখানে গেয়েছে কাল, কামিনি লো কি কপাল!
আজ ধ্বনি অন্য স্থান গত ||
আজি গীত গাইছে যথায়, চল মোরা যাইব তথায়।
কে গায় কিসের তরে, কেন গায় স্থানান্তরে,
করি চল যাহে জানা যায় ||
নাথ সনে লক্ষ্য করি ধ্বনি, চলে বনে শশাঙ্কবদনী।
ঘন গাঁথা তরুদলে, ঘন তম তার তলে,
ভয়ঙ্কর নীরব কেমনি ||
পূর্ব্বমত নিকুঞ্জ মণ্ডলে, আসিল সে প্রেমিক যুগলে
পূর্ব্বমত স্বপ্নসম, দুই রূপ নিরুপম,
যথা হইতে দ্রুত গেল চলে ||
৭
কাঁপিয়ে বিষম ভয়ে বলে হাঁ রে বিধি।
এমন সুখেতে কেন হেন কর বিধি ||
পৃথিবীতে কোন স্থান সুখের কি নয়?
কানন বাসেও কি গো বিপদ নিশ্চয় ||
দেবতা কুপিত বলি দুজনাতে ভীত।
কি হবে তৃতীয় রাত্রে দেখিতে চিন্তিত ||
তৃতীয় নিশীথে গীত আর এক স্থানে।
পূর্ব্বমত তথা গিয়া ভয়ে মরে প্রাণে ||
সেই মত পেলে ভয় চতুর্থ রজনী।
পঞ্চম রজনীযোগে কোথায় সে ধ্বনি?
