জ্যোতিষচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে লিখিত পত্র
নীলমণি কি পাইবে না পাইবে তাহা জানি না। তুমি আমার বড় সুসময় দেখিয়াছ। রথযাত্রা, ঠাকুর বাড়ীর মেরামত, তোমার কন্যার বিবাহ, বাকী দেনার পরিশোধ (তোমার ছোটকাকা কিছুই দিলেন না।) ইত্যাদিতে ব্যতিব্যস্ত, এই সময় তুমি গচ্ছিত টাকার মত ব্যতিব্যস্ত করিয়াছ। আমার অসাধ্য হইয়াছে—ইতি—
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
তাং ২৩শে আষাঢ়
কাল তোমাকে যখন পত্র লিখিয়াছিলাম, তখন আমার তেতলা ঘরে আগুন লাগিয়াছিল। ঘর পোড়ে নাই কিন্তু বিস্তর দ্রব্য সামগ্রী পুড়িয়া ক্ষতি হইয়াছে। সেই সময়ে তোমার পত্র পাইয়া উত্তর দিয়াছিলাম, তাই অমন পত্র লিখিয়াছিলাম। নহিলে লিখিতাম না। টাকাকড়ি এক পয়সা হাতে নাই। পূঁজি ভাঙ্গিয়া বিবাহের উদ্যোগ করিতেছি—
ইতি—তাং ২৪শে আষাঢ়
1st Aug. 1889
প্রিয়তমেষু—
তোমার পত্র পাইয়া ও তুমি কঠিন রকম পড়িয়া যাওয়ার সম্বাদ পাইয়া চিন্তিত আছি। কোথায় কি রকম জখম হইয়াছে কিরূপ চিকিৎসা হইতেছে এক্ষণে কেমন আছ আর এখন লোক পাঠান আবশ্যক কিনা লিখিবে।
তুমি বাড়ী আসিলে সপিণ্ডীকরণ হইবে। আমি সেই সময় দিনস্থির করিয়া দিব। ভাদ্র মাস পড়িতে না পড়িতে যাহাতে পরিবার লইয়া যাওয়া হয় সে চেষ্টা করা আবশ্যক।
কাঁটালপাড়ার সব ভাল আছে, সংবাদ পাইয়াছি।
14th Aug., 1889
কল্যাণবরেষু—
তোমার পত্র পাইয়াছি। তুমি সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করিয়াছ কিনা লিখিবে। তোমার কনিষ্ঠ পুত্রের অন্নপ্রাশন এক্ষণে হইতে পারে না, কেননা তাহার সর্বাঙ্গে ফোঁড়া ও জ্বরও কখন কখন হইয়া থাকে। অসুস্থ শরীরে অন্নপ্রাশন দিতে নাই। উপনয়নের সময়ে হইবে।
সুতরাং এক্ষণে সপিণ্ডীকরণের প্রয়োজন নাই। নীলমণি মুড়াগাছায় গিয়াছিল। পুনশ্চ আসিয়াছে; সে মুড়াগাছায় যাওয়ার পর আমার পরিবারবর্গ লইয়া রাখিতে কাঁটালপাড়ায় গিয়াছিল, এক্ষণে তাহারা সেইখানেই আছে অতএব চিন্তার বিষয় নাই।
টাকা মাসকাবারে কৈলাসের নিকট পাঠাইব। কৈলাসকে টাকা মজুত রাখিতে বলিবে, আমি বাড়ী গিয়া খরচপত্র করিব। আমি সংসারের সকল বন্দোবস্ত করিতেছি।
যদি মেহেরপুরে পীড়া বেশী না থাকে তবে পরিবার লইয়া যাওয়াই ভাল। কেননা তোমার নিজের তত্ত্বাবধান না হইলে ছেলেগুলি ভাল থাকে না। আর তোমাদের বাড়ীর কূয়া-পায়খানা অতিশয় অনিষ্টকারী জানিবে।
অনিলার একটী সম্বন্ধ আসিয়াছে। পাত্র ধনী ব্যক্তি, সব ভাল কিন্তু বয়স ৩৬ বৎসর। তোমার মত কি-না। অনিলার বিবাহে ব্যয় করা তোমার বা আমার ক্ষমতা নাই, অতএব যাহাতে অল্পব্যয় হয় তাহাই খুঁজিতে হয়। কৃতদার পাত্রে ব্যয় হইবে না।
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
২৮শে শ্রাবণ
প্রাণাধিকেষু—
এবার যখন কোন সুযোগ পাইবে আমার ঘরের চাবির গোছা পাঠাইয়া দিও। তোমার পিতার আমলের বঙ্গদর্শন তিন বৎসর আমার জন্য বাঁধাইয়া দিও।
আমি এক বেল কাগজ পাঠাইয়াছি, পৌঁছিয়াছে কিনা সংবাদ পাই নাই। সংবাদ লিখিবে। রথের সে ১৫ টাকা কি হইল লিখিবে। বড়বাবু দিয়াছেন কি?
আনন্দমঠ যে সংখ্যায় বাহির হইয়াছে সেই সংখ্যা হইতে এক কপি বঙ্গদর্শন অক্ষয় সরকারকে দিও। “With B.C. Chatterjee’s compliments” লিখিয়া দিও। তাহা হইলে তোমাদের দেওয়া বুঝাইবে না। আনন্দমঠ শেষ হইলে দেওয়া বন্ধ করিবে।
আমায় হাবড়ায় পত্র লিখিও। বঙ্গদর্শন অচল হইলে আমাকে জানাইও। টাকা বা matter সম্বন্ধে যাহা উপকার করিতে পারি করিব।
রাধানাথ আমাকে আন্দাজি ৩০৲ দিয়াছে। তোমাদের যদি despatch বন্ধ থাকে তবে লিখিও, আমি টাকা পাঠাইব।
ইতি তাং ১৪ জুলাই
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চাটার্জি
ঝিনাইদাহ, ২২শে কার্তিক
প্রিয়তমেষু—
তোমার পিতাকে আর অধিক কুইনাইন খাওয়াইবা না। কলিকাতায় পাঠাইবা। আমি জ্বরে বড় কষ্ট পাইয়াছি। যশোহর হইতে ডাক্তার ও ঔষধ আনাইয়া চিকিৎসা হইয়াছে। কাল রাত্রিতে জ্বর ছাড়িয়াছে। এই পত্রের সহিত তোমাদের সাংসারিক খরচ ১০০৲ টাকা, পূজার ১০৲ টাকা, ৺ঠাকুর সেবার বাকী ১৬৲, একুনে ১২৬৲ টাকা পাঠাইলাম। তোমার পিতর হাতে দিবে।
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
প্রাণাধিকেষু,
বারাসতের ডেপুটি-ম্যাজিষ্ট্রেট কেদার বসু রবিবার দিন প্রাতে কাঁটালপাড়ায় যাইবেন ও বৈঠকখানায় দুইদিন বাস করিবেন। বৈঠকখানাটি ঝাঁট দিয়া সাফ করাইয়া টেবিল চৌকি পাতিয়া রাখিবা। শয়ন জন্য একখানি তক্তপোষ পাতিয়া দিবা। রন্ধন জন্য কোন চালা সাফ করাইয়া রাখিবা, রাত্রিতে শয়ন জন্য আমায় যেরূপ বিছানা দাও, সেইরূপ দিবা। কেদারবাবু বড় ভদ্রলোক, পরম বৈষ্ণব ও শুদ্ধাচার। তাঁহাকে আনাইবার জন্য ষ্টেশনে ৮||• টার ট্রেণে লোক উপস্থিত থাকিলে ভাল হয়।
পুঃ কর্তার সপিণ্ড সময়ে সমাজ খাওয়ানো হয় নাই, আগামী বুধবার উদ্যোগ করার ইচ্ছা আছে, আম্র দধি ইত্যাদির বন্দোবস্ত রাখিবা। ভাল গ্লাস দেওয়ার জন্য কুম্ভকার ঠিক করিবা।
কেদারবাবুকে আনিতে ষ্টেশনে তুমি নিজে গেলে ভাল হয়।
আং শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
প্রিয়তমেষু,
মুরলী যে কাঁটালপাড়ায় যায় এমন কোন সম্ভাবনা নাই। বড়বাবুরও চাকর নাই। চাকর যাহাকে যাহাকে বহাল করিয়াছিলেন তাহারা পালাইয়াছে। কেহ থাকিতে চাহে না। আজ তিনি পৃথক বাসা করিয়াছেন, তাঁহার বাসায় অটল মোতায়েন আছে, অতএব মুরলীকে পাঠাইলে আমার বাসায় কাজ চলিবে না। অটল মুরলী উভয়ে উপস্থিত না থাকিলে বড়বাবুর কার্য চলে না। কেননা তাঁহার বাসায় জনপ্রাণী নাই। আমার কাঁটালপাড়া যাইবার কোন সম্ভাবনা নাই। বড়বাবুর অবস্থা ঘণ্টায় ঘণ্টায় পরিবর্তন হইতেছে, কখন কি রকম হয় তাহার স্থির নাই। তিনি আমাকে কোথাও যাইতে দেন না। রাত্রে উঠাইয়া আনেন। সুতরাং তাঁহাকে ফেলিয়া আমি কাঁটালপাড়া যাইতে পারিব না।
তোমার জ্যেষ্ঠতাতের এই মরণাপন্ন অবস্থা, আর তোমার পিতার শয্যাগত এই অবস্থায় তুমি যে ভোজের ঘটা বাধাইয়াছ তাহা অতি বিস্ময়কর। তোমার বালকবুদ্ধি আজও যায় নাই।
যাহা হউক সেখানে মুরলীর যাওয়া হইল না। সেখানে লোকাভাবে অটলকে পাঠান হইল না। আমার ছুরিকাঁটা যাহা ছিল তাহা ঝিনাইদহ হইতে আসিবার সময় Shirres সাহেবকে দিয়া আসিয়াছি। বেসেট যাহা আছে তাহা টেবিলে বাহির করা যায় না।
আমার বিবেচনায় যদি গোপেন্দ্রকৃষ্ণকে খাওয়াইতে হয়, তবে আমাদের দেশী ব্যঞ্জনাদি উত্তম করিয়া খাওয়াইলে ভাল হইতে পারে। তুমি যে ২||• পাঠাইয়াছিলে তাহা ফেরত পাঠাইলাম।
ইতি তাং বুধবার
শ্রীবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
১লা ফেব্রুয়ারী ১৮৮৬
