এ জগত পুরুষের। ভারতবর্ষ তো আরও বেশি পুরুষের। পুরুষ কামনা করবে নারীকে, পুরুষের যখন খুশি, তখন। নারীর কামনা বাসনা থাকতে নেই। থাকলেও প্রকাশ করতে নেই। নারীর শরীর জাগতে নেই, জাগলে ঘুম পাড়িয়ে রাখাই মঙ্গল। নারীর এগিয়ে আসতে নেই। চুমু খেতে নেই। যৌনতায় নারী প্রধান ভূমিকা নিতে পারে না। নারী যৌনপ্রভু নয়, ‘যৌনদাসী’। এই চরিত্রটি সযতনে নারীকে উপহার দিয়েছে পুরুষ। যৌনতায় নারী যদি সঙ্গেীর ভূমিকাও নেয়, তবুও পুরুষের পিলে চমকে ওঠে, শিশ্ন শিথিল হয়। যতক্ষণ না নারী যৌনদাসীর ভূমিকায় নামছে, ততক্ষণ অবধি পুরুষের উত্থান অনিশ্চিত।
নারী যৌনতৃষ্ণায় কাতরালে সে নারী মন্দ, পুরুষ যৌনতৃষ্ণায় কাতরালে পুরুষ বীর্যবান, শৌর্যবান। এই বৈষম্য নিয়ে সত্যিকার সুস্থ কোনও যৌনসম্পর্ক কি হতে পারে নারী পুরুষে? না। পারে না। ঘরে ঘরে নারী-পুরুষ দুজন মিলে যে যৌনসম্পর্ক করছে, তাকে কথ্য বাংলায় বলা হয় ‘পুরুষ নারীকে করছে’। মুখের ভাষা থেকেই কিন্তু বেরিয়ে আসে বৈষম্যের বিভৎস চিত্র। ‘ওরা করছে’র বদলে ‘ও করছে’। একজন কাজ করছে, আরেকজন বসে আছে, ব্যাপারটা এরকম। যৌনতায় নারীর কোনও ভুমিকা নেই, থাকতে নেই — তা সর্বজনমান্য রায়।
উত্থানরহিতে জগত ভর্তি। অথচ দেখলে বোঝার জো নেই। কারও লজ্জা নেই, মাথা হেট নেই, দুশ্চিন্তা নেই। উত্থানরহিতদের মস্তক কিন্তু উত্থিত থাকে। আর যে নারীরা উত্থানরহিতদের শিকার, তারাই বরং মাথা নত করে দিন কাটায়। দুঃসহ রাঙ্গির কাটায়। নারী যৌনতৃপ্তি পাক, এটা আন্তরিকভাবে খুব বেশি উত্থানরহিত কি চায়? চাইলে চেষ্টা থাকতো নিজেকে সংশোধনের। যৌনতার নামে দিনের পর দিন নারীর ওপর অত্যাচার চালাতো না।
পুরুষ যেদিন বিশ্বাস করবে নারীর সমঅধিকারে, পুরুষ যেদিন নারীর স্বাধীনতাকে শর্তহীন সম্মান জানিয়ে ধন্য হবে, পুরুষ যেদিন তাদের কুৎসিত পৌরুষ বিসর্জন দিয়ে, তাবৎ পুরুষিক নৃশংসতা-কদর্যতা ত্যাগ করে মানুষ হবে, মানবিক হবে, নারীকে স্পর্শ করবে প্রেমে, যে প্রেমে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে থাকে শ্রদ্ধা; সেদিনই হবে সত্যিকার নারী পুরুষের যৌনসম্পর্ক। তার আগ অবধি ঘটনা ওই একই, একজন ভোগ করে, আরেকজন ভোগে।
‘নারী স্বাধীনতা’র অর্থ ‘যৌন স্বাধীনতা’—এরকম মন্তব্য অনেকে করে। বিদ্রুপ করে বলা কথা। কথা কিন্তু সত্য। যৌন স্বাধীনতা ছাড়া নারী কখনও সত্যিকার স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে না, পারেনি। যে নারীর শরীর তার নিজের অধিকারের বাইরে চলে যায়, সেই নারী কোনও অর্থেই ‘স্বাধীন নারী’ নয়। শিক্ষা পেলেও, স্বনির্ভর হলেও, এই নারীবিদ্বেষী সমাজে নারীরা ‘যৌনদাসীত্ব’ থেকে মুক্তি পেতে পারে না । এই দাসীত্ব থেকে মুক্ত হয়ে, এই বন্দিত্ব থেকে বেরিয়ে নারী যদি যৌন স্বাধীনতা পুরোপুরি ভোগ করতে পারে, তবেই সে নারীকে ‘স্বাধীন’ বলে মানবো আমি। যৌন স্বাধীনতা মানে পুরুষ পেলেই শুয়ে পড়া নয়, পুরুষের সঙ্গে না শোয়ার নামও যৌন স্বাধীনতা। চারদিকে ধর্ষকের ভিড়, এ সময় ধর্ষক-ধ্বজভঙ্গদের আহ্বানে আদেশে সাড়া না দেওয়ার জন্য যে যৌন স্বাধীনতা, তা থাকা প্রতিটি নারীর প্রয়োজন। ঠোঁট কামড়ে, স্তন খামচে যে পুরুষেরা পৌরুষ ফলাতে চায়, তারা যত যা-ই হোক না কেন, তাদের ধাত্তা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার যৌন স্বাধীনতা না পেলে মুক্তি নেই নারীর। যে পুরুষেরা কেবল নিজের যৌনসুখ নিয়ে মগ্ন, নারীর যৌনসুখ নিয়ে ভাবা যাদের কম্ম নয়, সেই পুরুষদের সবলে অস্বীকার করার যৌন-স্বাধীনতা যে করেই হোক অর্জন করুক নারী।
২০. সোনার বাংলার সোনার নারীরা শোনো: ঘনিয়ে আসছে ঘোর দুর্দিন
বাংলাদেশে দুই রাজনৈতিক নেত্রী বহুকাল থেকে দেশ শাসন করছেন। হাসিনা আর খালেদা। খালেদা নিশ্চিতভাবেই ধর্মীয় মৌলবাদীদের বন্ধু। আর হাসিনাকে ভাবা হত সেকুলার, অসাম্প্রদায়িক, মৌলবাদের বিপক্ষ শক্তি। হাসিনার দল আওয়ামি লীগ এবার জিতে যাবে, এরকমই অনেকে ভেবেছিল। কারণ ধর্মীয় মৌলবাদীদের দাপটে, সন্ত্রাসে জনজীবন জর্জরিত। আশা ছিল দেশটিতে আবার ধর্মনিরপেক্ষতা আনা, মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসার বন্ধ করা, ফতোয়াবাজদের ফতোয়া বন্ধ করা, মৌলবাদীদের দাপট বন্ধ করার বিরুদ্ধে হাসিনাই একমাত্র নেত্রী যিনি রুখে দাঁড়াতে পারেন। প্রতিক্তিয়াশীল মৌলবাদী শক্তি যখন দেশটিকে ধ্বংস করে ফেলছে, তখন হাসিনার দিকে খুব স্বাভাবিকভাবেই তাকিয়ে ছিল দেশের শুভানুধ্যায়ী মানুষ। সবাইকে স্তম্ভিত করে, স্থবির করে হাসিনা জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ফতোয়াবাজদের অধিকার দেবেন ফতোয়া দেবার। বললেন, তিনি মাদ্রাসাগুলোকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা দেবেন, ব্লাসফেমি আইন আনবেন, এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে একটি নির্ভেজাল ইসলামী রাষ্ট্র বানিয়ে তবে ছাড়বেন। ১৯৯৩ সালে হাবিবুর রহমান নামের যে সিলেটি মৌলবাদী লোকটি আমার বিরুদ্ধে ফতোয়া ঘোষণা করেছিলো, মাথার দাম ঘোষণা করেছিল, সে আগামী নির্বাচনে আওয়ামি লীগের একজন প্রার্থী। হাসিনা অবলীলায় হাত মিলিয়েছেন ইসলামী মৌলবাদী দলের নেতা শায়খুল হাদিসের সঙ্গে, দেশ জুড়ে ধর্মীয় সন্ত্রাস ছড়াতে যার জুড়ি নেই। কারও কি বিশ্বাস হয় এমন কথা! বিশ্বাস না হলেও এসব সত্য। বিশ্বাস না হলেও সত্য যে বাংলাদেশ নামের দেশটির আর কোনও সম্ভাবনা নেই গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শে ফিরে যাবার।
