এ লড়াই কঠিন লড়াই। ধর্ম আর পুরুষতন্ত্র, পৃথিবীর বিশাল দুই শক্তির বিরুদ্ধে লড়ার চেয়ে কঠিন কাজ আর কী আছে! প্রতিটি নারীর সামনে আজ দুটো মারমুখো দৈত্য, হয় লড়াই করো নয় মরো। নারীরা আপোস করেও মরছে, লড়াই করতে গিয়েও মরছে। মরতেই যখন হবে, তখন শত্রুকে ছিঁড়ে কামড়ে মরাই ভালো।
১৯. কামড়ে খামচে মেয়েদের ‘আদর’ করছে পুরুষেরা
যে সমাজে পুরুষ নারীর কর্তা, নারীর প্রভু, নারীর নিয়ন্ত্রক, নারীর নিয়ন্তা, সেই সমাজে নারীর সঙ্গে পুরুষের যা-ই হোক, প্রেম হতে পারে না। ননীটা ছানাটা খেয়ে বড় হওয়া পুরুষ এঁটোটা কাঁটাটা খেয়ে বড় হওয়া নারীর সঙ্গে বড়জোর খুনসুটি করতে পারে, প্রেম নয়। নারীর প্রতি পুরুষের করুণা এবং পুরুষের প্রতি নারীর শ্রদ্ধাকে এ সমাজে প্রেম বলে বিবেচনা করা হয়। এই প্রেম হৃদয় এবং শরীর দুটোকেই ঢেলে দেয় তথাকথিত যোগ্য বা অযোগ্য পাজ্ঞে। নারীর হৃদয় নিয়ে পুরুষ যা করে, তা অনেকেরই জানা। কিন্তু শরীর নিয়ে কী করে? নারীর প্রতি যেহেতু পুরুষের কোনও শ্রদ্ধা নেই, নারীর শরীরের প্রতিও নেই। নারীর শরীর পাওয়া পুরুষের জন্য বাঘের হরিণ পাওয়ার মতো। হরিণের জন্য কোনও শ্রদ্ধাবোধ বাঘের নেই। ছিঁড়ে খেতে বাঘের কোনও গ্লানি নেই। খিদে পেয়েছে, শিকার করেছে, খেয়েছে। খেয়ে ঢেঁকুর তুলতে তুলতে নিজের টেরিটরিতে ফিরে যাবে, ফের খিদে পেলে ঝাঁপিয়ে পড়বে নতুন কোনও হরিণ পেতে, না পেলে মোষ বা মানুষ।
পুরুষেরা কটকটি কামড়ানোর মতো নারীর ঠোঁট কামড়ালো, এর নাম দিয়ে দিল চুম্বন। যে নারী এভাবেই চুম্বনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে, সে তো চুম্বন বলতে তা-ই বোঝে, ধারালো দাঁতের কামড়, ঠোঁট ফুলে যাওয়া, ছিঁড়ে যাওয়া, রক্তাক্ত হওয়া। ঠোঁট কামড়ানোর পর পুরুষেরা নারীর বুক নিয়ে পড়ে। দলে পিষে সর্বনাশ করে। ক্ষণে ক্ষণে খামচে ধরে। নখে ছেঁড়ে, দাঁতে কাটে। নারীকে ভালোবাসলে, নারীর শরীরকেও ভালোবাসতে পারতো পুরুষ, ভালোবাসলে আঙুল নরম হত, দাঁত নখ লুকিয়ে থাকতো। পুরুষ নিজের আনন্দ ছাড়া অন্য কিছু বোঝে না। নারীর কিসে ভালো লাগবে, কিসে লাগবে না, তা জানার চেষ্টা তারা কোনওদিন করেনি। জানলেও গুরুত্ব দেয়নি, নারীর সুখ অসুখের তোয়াত্তা পুরুষ করেনি কখনও।
নারীও অনেক সময় জানে না, কী করলে তাদের ভালো লাগবে, কী করলে শরীরে সুখ হবে। নারীকে যেভাবে যা বোঝায় পুরুষ, নারী সেভাবেই বোঝে। তার কি আর আলাদা করে নিজের মাথা এবং হৃদয় খাটিয়ে কিছু বোঝার ক্ষমতা আছে? নেই। শরীরের সম্পর্কে পুরুষ হল ‘দ্য মাস্টার, মেগালোম্যানিয়াক ম্যাচো’, আর নারী তার ক্রীড়নক। পুরুষ সুপিরিয়র, নারী ইনফিরিয়র। পুরুষ অ্যাকটিভ। নারী প্যাসিভ। নারী প্যাসিভ না হলে পুরুষের মুশকিল হয়। হরিণ নড়েচড়ে উঠলে বাঘের ভক্ষণে যেমন মুশকিল হয়, তেমন। জগতে পুরুষই রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে, ধর্মে, অধর্মে, সমাজে, সংসারে, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সংস্কৃতিতে মহান মস্তান হয়ে বসে আছে। এই নীতি রীতিগুলো পুরুষময় করে রাখার জন্য পুরুষেরা ভয়ংকররকম অ্যাকটিভ। এই অ্যাকটিভ পুরুষ বিছানায় গিয়ে নারী নামক ভোগের বস্তুটিকে কী করে অ্যালাউ করবে অ্যাকটিভ হওয়ার? অসম্ভব। ইগোর ঘরে আগুন জ্বলবে। পুরুষ ততটুকুই নড়তে দেবে নারীকে, যতটা নড়ন হলে পুরুষের গায়ে পুলক লাগে। বাৎসায়নমশাই চোষঙ্গি কলার কথা জোর গলায় বলে গেলেও এক মিশনারি কলাতেই তৃপ্ত বাঙালিবাবুরা, বাকি তেষঙ্গি কলার পেছনে সময় খরচ না করে নারীকে প্যাসিভ বা পুঁইশাক বানিয়ে রাখার কলা কৌশল ভালো রপ্ত করেছেন।
পুরুষের রসবোধ কম। কম বলেই নারীর রসবোধ নিয়ে আতংকিত তারা। রসক্ষরণ না হলে যাত্তা মসৃণ হয় না, জানার পরও রসক্ষরণের রাস্তায় পুরুষের যেতে বড় আপত্রি বা আলসেমি। পুরুষ প্রস্তুত সুতরাং সব্বাইকে প্রস্তুত হতে হবে। ঘোড়া প্রস্তুত, লাগাম প্রস্তুত। অর্ডার অর্ডার। এক তুড়িতে পুরুষ গ্রহণে প্রস্তুত হও নারী। তানাহলে তুমি আর নারী কীসের? তুমি আর সেবিকা কীসের? আনন্দদায়িনী, মনোরঞ্জনী কীসের? পুরুষের সুখশান্তিস্বস্তির জন্য আত্মাহুতি দিতে নারী সর্বত্র একপায়ে খাড়া।
শীর্ষসুখ জানে নারী? ক’জন নারী জানে? নারী জানে জগতের যত সুখ, সবই পুরুষের জন্য। নারীর যে একেবারে সুখ নেই তা নয়, নারীর সুখ পুরুষকে সুখ দিয়ে। নারীর অন্য সুখ থাকতে নেই। আনন্দ বলতে কিছু অনুভব করতে নেই। পুরুষ এভাবেই যুগ যুগ ধরে নারীর মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিয়েছে ত্যাগী হওয়ার মন্ত্র। নারীর ত্যাগই পুরুষের সবচেয়ে বেশি প্রার্থনীয়। নারী তার নিজস্বতা, তার পৃথক অস্তিত্ব, তার সাধ, তার সুখ সবই সানন্দে ত্যাগ করবে আর এই ত্যাগকেই পুরুষ তারিয়ে তারিয়ে ভোগ করবে। নারীর ত্যাগএর মতো এত সুস্বাদু আর উপাদেয় জগতে আর কোনও খাদ্য নেই।
নারীরা যদি সমকামী হত, বেঁচে যেত। অসমকামী হওয়ার অসুবিধে হল, অনাদর, অবহেলা, অপমান, অসন্তোষকে একরকম সঙ্গেী করেই জীবন কাটাতে বাধ্য হতে হয়। পুরুষ পালকের মতো করে স্পর্শ করবে নারীর সারা শরীরে, নারী একটু একটু করে কুড়ি যেমন ফুল হয়ে ফোটে, তেমন ফুটবে। বাঘিনীর মতো কামার্ত চোখে তাকাবে, হরিণের মতো কাতর চোখে নয়। পুরুষের নিঃশ্বাসে স্পর্শে, ঘামে গন্ধে, কামে, কাঙক্ষায় উপচে উঠবে তীব্র প্রেম। ওঠে কি? না। দৈত্যের মতো উঠে আসে ধর্ষনেচ্ছা। মেগালোমেনিয়া। মাচিসমো। নারীকে পিষে নিংড়ে ছোবড়া করে দেওয়ার পুরুষিক সুখ।
