যে সমাজে একটি মেয়ের শিক্ষা , স্বাস্থ্য, সম্মান কিছুই জরুরি বিষয় নয়, মেয়ের ইচ্ছের কোনও মূল্য নেই, অন্যের ইচ্ছেয় বিশেষ করে পুরুষের ইচ্ছেয় জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি যাপন করতে হয় একটি মেয়েকে, সেখানে কোনও একটি রাজ্যের আদালতের রায় একটি মেয়ের জীবনের কী এমনই-বা পরিবর্তন করতে পারে! সমাজ তো আছে আগের মতোই, আগের মতোই নারীবিদ্বেষী।
তলিয়ে দেখলে মঞ্জুর তার স্বামীর কাছে থাকা, বা প্রেমিকের কাছে থাকা—একই জিনিস। দুজায়গাতেই সে আশ্রিতা। দুজায়গাতেই তাকে নিঃশর্তভাবে নিবেদন করতে হবে তার সর্বস্ব। পুরুষদের ইচ্ছে হলে মঞ্জুকে লাথি দেবে, ইচ্ছে হলে চুমু। মঞ্জুর বর্তমান ভবিষ্যত সবই নির্ভর করবে পুরুষের চরিত্র আর মেজাজ মর্জির ওপর। একটি মেয়ের জীবনে এর চেয়ে নিরাপত্রহীনতা আর কী আছে? মেয়েদের জীবনে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তাহীনতাটির নাম ‘পুরুষ’। পুরুষ যত ক্ষতি করতে পারে নারীর, পৃথিবীতে আর কেউ তত পারে না।
নারী যতদিন নিজের জন্য নিজের আশ্রয় না হয়, ততদিন নারী নিশ্চিতভাবেই নিরাপত্তাহীন। অনেকে, জানি খুব রুষ্ট হয়ে বলবে যে, সব পুরুষ তো মন্দ নয়, কত তো ভালো পুরুষ আছে। আছে, সে আমিও জানি। এই যে পুরুষের ভালোত্বের ওপর নারীকে নির্ভর করতে হবে, সেও তো এক অসহায়তা নারীর। পুরুষের ভালোত্ব যতদিন টিকে থাকে, ততদিন নারী নিরাপদ। মন্দ পুরুষ থেকে অমন্দ পুরুষে যাওয়া, সেই অমন্দ পুরুষ থেকে আরও অমন্দ পুরুষে, চরকির মতো পুরুষের দ্বারে দ্বারে কোলে কোলে ঘোরাই কি নারীর কম্ম? কেবল পুরুষের মন্দত্ব আর নির্মমতা নিষ্ঠুরতা অত্যাচার অনাচার থেকে নয়, পুরুষের ভালোত্ব, পুরুষের দান দক্ষিণা দয়া, পুরুষের করুণা কৃপা থেকে নিজেকে বাঁচানোও কিন্তু নারীর জন্য অত্যন্ত জরুরি। পুরুষের নিষ্ঠুরতার চেয়ে কম নিষ্ঠুর নয় পুরুষের করুণা বা কৃপা। এগুলো নারীকে মুগ্ধ আর মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। নারী প্রতিবাদ করার ভাষা হারিয়ে ফেলে। বোবা বোকা বধির হয়ে পুরুষের পায়ে পুষ্পাঞ্জলি দেয়, আরও বেশি মেগালোম্যানিয়াক মনস্টার করে তোলে ওদের।
নারী কবে সহায় হবে নিজের! নারীর কবে আর প্রয়োজন পড়বে না কোনও পুরুষের কৃপার বা করুণার। সেই দিনের স্বপ্ন আমি দেখি। স্বপ্ন দেখি নারী পুরুষের সম্পর্ক বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের পরস্পরের সঙ্গে শে্রদ্ধার যে সম্পর্ক, সে রকম। মানুষের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধ নেই বলেই শ্রেণী বৈষম্য, লিঙ্গ বৈষম্য, জাতপাত, সাম্প্রদায়িকতার মতো কুৎসিত জিনিস দীর্ঘ দীর্ঘ বছর ধরে টিকে আছে। দিন যত যাচ্ছে, মানুষ যত শিক্ষিত হচ্ছে, বিত্তানের উন্নততর সুবিধে যত গ্রহণ করছে, তত উবে যাওয়ার কথা তাবৎ বৈষম্য, কিন্তু হচ্ছে উল্টোটি। মানুষ যেন আরও বেশি ধর্মান্ধ হচ্ছে, আরও বেশি কুসংস্কারাচ্ছন্ন, আরও বেশি সংকীর্ণ।
প্রাণীজগতে নারীই একমাত্র, যে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে বাস করে তার অত্যাচারীদের সঙ্গে। আর কোন্ প্রাণী তার অত্যাচারীকে প্রেম দেয়, সেবা দেয় নারী যেমন দেয়? নারীর সবচেয়ে সমস্যা যে তারা বুঝতে পারে না এবং তাদের বুঝতে দেওয়া হয় না যে পুরুষ তাদের আশ্রয় হওয়ার অর্থ নারীর কোনও সমস্যার সমাধান হওয়া নয়। পুরুষ আজ হয়তো আশ্রয় দিল, কাল দেবে না। আজ ভালোবাসলো, কাল বাসবে না। আজ বলবে তুমি সুন্দর, কাল বলবে তুমি কুৎসিত। আর যাকেই বিশ্বাস কর নারী, পুরুষকে কোরো না।
কোনও পুরুষ যদি বিশ্বাসযোগ্য হয়ও, তাকে বিশ্বাসযোগ্য করে রাখার জন্য নারীকে সর্বস্ব ত্যাগ করতে হয়। বেশির ভাগ সময়ই সর্বস্ব বিসর্জন দিয়েও কোনও কিছু অর্জন হয় না নারীর। সামান্য অনুকম্পাও জোটে না অনেকের। এবং এটিকে কারও মনে হয় না অন্যায়।
শুভবুদ্ধিসম্পন্ন পুরুষের অভাব বড় প্রকট। পুরুষরা রাজনীতিতে অর্থনীতিতে ত্তানে বিত্তানে শিল্পে সাহিত্যে বাণিজ্যে কর্তব্যে বিরাট বিরাট অবদান রাখছেন, সমাজে নমস্য তাঁরা, তাঁরাও কিন্তু ঘরে এসে স্ত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন, নয় অন্য নারীসঙ্গে মেতে স্ত্রীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন, নয় স্ত্রীকে স্রেফ নিজের সেবাদাসী হিসেবে ব্যবহার করেন। কাকে তবে বিশ্বাস করা যায়! যদি নমস্যদেরই না যায়! আসলে সত্যি কথা কী, বিশ্বাস জিনিসটি লটারির মতো। তুমি জানো না কাকে করা উচিত কাকে নয়। কে ঠকাবে, কে ঠকাবে না। নারীকে মানুষ হিসেবে যেহেতু পুরুষ শ্রদ্ধা করে না, তাই শেষে গিয়ে নারীকে ঠকতেই হয়। এবং এটিকে অতি স্বাভাবিক একটি ব্যাপার বলেই ভেবে নেওয়া হয়। কেউ অবাক হয় না। নারী যে এত ঠকে, এত মার খায়, তারপরও পুরুষকেই বিশ্বাস করে, পুরুষের কাছেই আশ্রয় চায়। নারী যদি নিজেকে বিশ্বাস না করে, তবে চিরকালই যুক্তিহীন-বুদ্ধিহীনের মতো পুরুষকে বিশ্বাস করা ছাড়া আর তার উপায় কী আছে। নারী তার সারা জীবন তার নির্বুদ্ধিতার জন্য যত শাস্তিই পায়, সবচেয়ে বড় শাস্তি তার এটিই যে পুরুষকে বিশ্বাস করতে হয়।
১৭. মাথায় প্রবলেম না থাকলে সব নারীরই নারীবাদী হওয়ার কথা
১. আজ থেকে সতেরো বছর আগে লিখেছিলাম বাংলা সংসদ অভিধানের কথা যে অভিধানে পুরুষ শব্দের অর্থ মানুষ কিন্তু নারী শব্দের অর্থে আর যা কিছুই থাকুক, মানুষ নেই। সতেরো বছর আগে অনেকে চোখ কপালে তুলেছিল। অনেকে অভিধান খুলে হতবাক বসে থেকেছে, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেনি। কিন্তু কেউ কি বিশ্বাস করতে পারে যে এখনও অভিধানের ওই শব্দার্থ অপরিবর্তিত আছে?
