নারীরা এ দেশে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে না। নারীদের কোনও অহংকার থাকতে নেই। সেই কবে ভোটাধিকার আন্দোলনের নেত্রী এলিজাবেথ ক্যাডি স্ট্যানটন বলেছিলেন, ‘উই আর, অ্যাজ এ সঙ্গে, ইনফিনিটলি সুপিরিয়র টু ম্যান।’ ক’টা মেয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে এ কথা বিশ্বাস করে এবং বলে?
আমরা নারীরা পুরুষের চেয়ে সবদিক থেকে বড়। এ কথা বললে পুরুষ যেমন কৌতুকরসে হেসে ওঠে, নারীও হাসে। কেবল লিঙ্গে নয়, বিবেকে বুদ্ধিতে, বিচক্ষণতায়, বিদ্রোহে, বিস্ফোরণে, বীক্ষণে নারী চিরকালই পুরুষের চেয়ে ঊর্ধ্বে। কিন্তু শক্তিকে শেকলে বন্দি করে রাখা হয়েছে আজ হাজার বছর। সোজা এতকালের শেকল ছেঁড়া?
আমি মনে করি পুরুষবিদ্বেষ হল একটি সম্মানজনক রাজনৈতিক আদর্শ, যে আদর্শে অত্যাচারিতের অধিকার আছে অত্যাচারী শ্রেণীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছুড়ে দেওয়া।–ক’জন বলে এমন কথা এদেশে? এখন তো লিবারেলিজমের যুগ। যত আপোস করো, তত ভালো। যত মেনে নাও, তত তুমি সহিষ্ণু, তত তুমি শান্তিকামী। চিরকাল যারা অশান্তি করে, অশান্তি যাদের রক্তে, মস্তিষ্কের কোষে কোষে, তাদের সঙ্গে কি সত্যিকার কোনও শান্তি চুক্তি হয়, না, হতে পারে?
সেই কতকাল আগে মেরিলিন ফ্রেঞ্চ ‘দ্য উইমেনস রুম’ বইতে লিখেছেন, ‘পুরুষের প্রতি আমার অনুভূতি পুরুষ নিয়ে আমার অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সত্যি কথা বলতে কী, পুরুষের প্রতি আমার কোনও সহানুভূতি নেই। ডাখাও কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে এক ইহুদি যেমন কোনও তরুণ নাৎসি সেনাকে পেটে গুলি খাওয়া অবস্থায় কাতরাতে দেখে নির্বিকার হেঁটে চলে যায়, তেমন করে আমি পুরুষ দেখি। আমি এমনকী প্রয়োজনও বোধ করি না কাঁধ শ্রাগের। আমি কেয়ার করি না। মানুষ হিসেবে লোকটি কী ছিল, কেমন ছিল, তার ইচ্ছে অনিচ্ছে এগুলো আমার কাছে কোনও বিষয় নয়।’
পুরুষকে তুচ্ছ করার শক্তি এবং সাহস এ সমাজে ক’জনের হয়? তুচ্ছ না করলে পুরুষতন্ত্রের কবল থেকে মুক্তি নেই কোনও নারীর। বিয়েকেও ত্যাগ করেছিল আমাদের লড়াকু পূর্বনারীরা। সাহস আছে কারও এমন কথা উচ্চারণ করার, ‘যেহেতু বিয়ে মানে নারীকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দি করা, নারীবাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বিবাহপ্রথার গায়ে জোরে লাথি মারা। বিবাহপ্রথাকে নির্মূল না করলে নারী স্বাধীনতা কখনই অর্জিত হবে না।’
‘না না না আমরা পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলছি। আমরা এগিয়ে গেছি অনেক। আমরা আমাদের প্রাপ্য অধিকার পেয়ে গেছি কত আগে। যা বাকি আছে পাওয়ার, তার জন্য পুরুষকে সঙ্গে নিয়েই লড়াই করবো।’ ‘সচেতন’ বলে বড়াই করা নারীরাই বলছেন এমন কথা। নারী-পুরুষ উভয়কেই নারীর অধিকারের জন্য লড়তে হবে — এই মত নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রায় সকলের। কিন্তু ধর্ষককে সঙ্গে নিয়ে সত্যি কি লড়াই করা যায়? দুই বা তিন ইঙ্গি জিনিসটি নিয়ে অহংকার এমন কোনও পুরুষ আছে করে না? যে পুরুষ নিজেদের নারীবাদী বলে, তারাও সময় সময় উরুসন্ধিতে হাত রেখে জিনিসটির উপস্থিতি পরখ করে নেয়। ধর্ষকের জাতকে বিশ্বাস করেছো কী মরেছো।
কী ব্যাপার, জাত নিয়ে কথা? হ্যাঁ জাত নিয়েই কথা। পুরুষেরা আলাদা জাত। তারা মনুষ্যজাত থেকে ভিন্ন। এমন কথা প্রচণ্ড রাগ করেও কেউ বলে না এ সমাজে। মেয়েদের রাগ টাগ কি একেবারেই গেল? রাগের মাথায় তো অনেক কিছু করছে মেয়েরা, রাগের মাথায় ধর্ষকের ধর্ষদণ্ড কেন কেউ কেটে নেড়িকুত্তা দিয়ে খাওয়াচ্ছে না? ক্রোধে রাগে কেন উচ্চারণ করছে না সত্য, যে সত্য মুখে এসে গেলেও মেয়েদের গিলে ফেলতে হয়! গিলে ফেলেছে হাজারবছর। এখনও?
১৬. এক পুরুষ থেকে আরেক পুরুষ—নারীর সমস্যার এ কি কোনও সমাধান?
রাজস্থানের কোর্টের রায় শুনে আমি নিজেই খানিকটা চমকে উঠেছিলাম। প্রচণ্ড নারী-বিরোধী ঐতিহ্য আর সনাতন সংস্কৃতি যেখানে রমরমা, কী করে রাজস্থানের মতো একটি রাজ্যে, যেখানে নারীর স্বাধীনতা অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় অনেক কম, ঘোষিত হয় এই রায়, যে, স্বামীর অনিচ্ছাসঙ্গে্েবও প্রাপ্তবয়স্ক বিবাহিত মেয়ে প্রেমিকের সঙ্গে বসবাস করার অধিকার রাখে! অবিশ্বাস্য হলেও ঘটনাটি ঘটেছে। মঞ্জু নামের মেয়ে এখন বাস করছে তার প্রেমিক সুরেশের সঙ্গে, স্বামীর সঙ্গে নয়। হাই কোর্টের দুজন বিচারক জিসি মিশ্র এবং কেসি শর্মা এই রায় দেন, যে, মেয়েদের পণ্য হিসেবে ব্যবহার করার অধিকার থাকা কারওরই উচিত নয়।
বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানটির গায়ে এই রায় বড় একটি আঘাত বটে। কোনও প্রতিষ্ঠানই এতকাল এত মারমার কাটকাট চলেনি, বিবাহ যেমন চলেছে। কোনও প্রতিষ্ঠানে চিড় ধরে, ভাঙে, আবার হয়তো টিমটিম করে কিছুদিন জ্বলে, একসময় ধপ করে নিভে যায়। বিবাহের টিমটিম নেই, নিভে যাওয়া নেই। হিপি আমলে সেই ষাটের দশকে একবার লালবাতি জ্বলেছিল বটে, সেও পুবে নয়, পশ্চিমে। পশ্চিমের ছেলে মেয়েরা বিয়ে করা বন্ধ করেই দিয়েছিল। সেই লালবাতি আশির দশকে এসে সুবজ হতে শুরু করলো। রক্ষণশীলতা পা পা করে ইওরোপের দিকে দৈত্যের মতো এগোলো। পুবে তো দৈত্যদের বরাবরই জয়জয়কার।
এই পুবে, এই ভারতবর্ষে বসে কিনা আজ শুনছি আদালত বলছে, ‘কোনও মেয়েকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কারও সঙ্গে বাস করার জন্য জোর করা উচিত নয়।’ সময় যেন হঠাৎ করে একশ বছর এগিয়ে গেছে। আসলে তো কিছুই এগোয়নি। রায়টি বরং এই সমাজের চরিত্রের সঙ্গে বদ্দ বেমানান। দেশের কোনও একটি আদালতে কোনও এক শুভবুদ্ধিসম্পন্ন বিচারক হঠাৎ একটি চমৎকার রায় দিয়ে দিলেন, এই সমাজের কিছুর সঙ্গেই যে রায়টি মেলে না, তাতে নেচে ওঠার কিছু কি আছে? যে মঞ্জু আজ প্রেমিকের সঙ্গে বাস করছে, সেই মঞ্জু কি আদৌ একফোঁটা স্বস্তিতে আছে? তাকে লোকেরা অকথ্য ভাষায় দিন রাঙ্গির গালি গালাজ করছে না? সামনে পেলে পিটিয়ে তার লাশ ফেলে দেবে, হুমকি দিচ্ছে না? নষ্ট মেয়ে, খারাপ মেয়ে, অসতী, বেশ্যা এসব কি উঠতে বসতে বলছে না? আমরা খুব সহজে অনুমান করতে পারি, যে, ভয়ংকর নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে কুঁকড়ে আছে মঞ্জু। এ অবস্থায় সে নিশ্চয়ই সামান্যও উপভোগ করতে পারছে না তার প্রেমের জীবন। সুরেশের প্রেমও কি বেশিদিন টিকে থাকবে! অন্যের ‘বিয়ে করা’ বউকে ঘরে তোলার জন্য তাকে কি কম বিদ্রুপ সইতে হচ্ছে! পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন নিশ্চয়ই ছি ছি করছে। মানুষ আর কদিন বাস করতে পারে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, আর ব্যঙ্গ বিদ্রুপের মধ্যে? মেয়েরা না হয় পারে, অভ্যেস আছে। সারাজীবন এসব সইতেই তাদের সারাজীবন শেখানো হয় । কিন্তু পুরুষ তো বুক ফুলিয়ে চলার জন্য যা দরকার সবই করবে। পুরুষ-সুরেশ অসুবিধে দেখলে প্রেমিকের খোলশ থেকে যে কোনও মুহূর্তে বেরিয়ে আসবে। সুরেশ যদি ত্যাগ করে মঞ্জুকে? মঞ্জু তখন কার আশ্রয়ে যাবে? হয় স্বামী-পুরুষটির কাছে ফিরে যাবে, নয়তো অন্য কোনও নতুন প্রেমিক-পুরুষের আশ্রয়ে। এছাড়া আর কী! নারীর সমস্যার এ কি সত্যিই কোনও সমাধান, যখন তাকে এক পুরুষের আশ্রয় থেকে আরেক পুরুষের আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হতে হয়? তার চেয়ে নারীর যদি কারও আশ্রয়ের প্রয়োজন না হত, নিজেই নিজের জন্য সে যথেষ্ট হত! কারও করুণার তোয়াত্তা না করে যদি সে বেঁচে থাকতে পারতো, নিজের আত্মসম্মান এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে, দুর্বিনীত এবং দুঃসাহসী!
