ইমরানাকে যতদিন ‘তাদের মেয়ে’ হিসেবে দেখা হবে, যতদিন ‘আমাদের মেয়ে’ হিসেবে হবে না, যতদিন সে ভারতের মেয়ে না হবে, ততদিন ইমরানাদের দিকে আঙুল তুলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায় দেখবে এবং দেখাবে। ইমরানার দুর্ভোগকে কখনও তারা নিজেদের দুর্ভোগ বলে অনুভব করবে না। অনুভব করবে না বলেই তারা রা-শব্দ করবে না, বা চিল্লিয়ে প্রতিবাদ করবে না। ‘মুসলিম-বিরোধী’ দুর্নাম কামাতে হয় কী না এই ভয়ে সিঁটিয়ে থাকবে। বর্বরতাকে মেনে নিলেই অসাম্প্রদায়িক বা সেকুলার হিসেবে দিব্যি ‘নাম’ হয়। সহজে নাম হওয়ার এটি একটি পন্থা বটে। চোখ কান নাক মাথা বুঁজে থেকে ‘নাম’ করে নেওয়া। নাম না হয় হল, কিন্তু দেশটির কী হয়? দেশের প্রায় পনেরো কোটি মানুষ যদি অন্ধকারে পড়ে থাকে, যদি অশিক্ষা কুশিক্ষা অন্ধত্ব আর দারিদ্র ছাড়া আর কিছু তাদের সামনে না থাকে! তাদের মধ্যে তো খুব স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে ঠগ জোচ্চোর বদমাশ ধর্ষক সন্ত্রাসী খুনী এবং আরও হরেক রকম উপদ্রব। দূরদর্শী আছে কেউ? কোনও লোকনীতিক? ইমরানাদের বাঁচাবার জন্য না হলেও অন্তত দেশটিকে বাঁচাবার জন্য ধর্মীয় শিক্ষার পরিবর্তে ধর্মমুক্ত শিক্ষার ব্যবস্থা করা, শরিয়তি আইনের পরিবর্তে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রণয়ন করা, অন্ধকারের পরিবর্তে আলো ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা যতদিন না লোকনীতিকরা অনুধাবন করতে পারছেন ততদিন ভারতের ভবিষ্যত নিয়ে ভয় দূর হওয়ার নয়। কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন দিয়ে দেশকে সভ্য করা যায় না। গেলে সৌদি আরবে মানবাধিকার, নারীর অধিকার আর গণতন্ত্র বিরাজ করতে পারতো।
ভারতে কিন্তু জনহিতকর কাজের অভাব নেই। ‘একে বাঁচাও ওকে রক্ষা করো’ আন্দোলন লেগেই আছে বছরভর। নানা রকম আইনও আছে নানা জিনিস রক্ষা করার। কিন্তু চরম দুর্দশা থেকে লাঞ্ছনা থেকে অপমান থেকে মৃত্যু থেকে মুসলমান মেয়েদের রক্ষা করার কোনও আন্দোলন বা কোনও আইন এই ভারতবর্ষে নেই। আট কোটি মুসলমান মেয়ের চেয়ে একটি কৃষ্ণসার হরিণের মূল্য এ দেশে বেশি। কৃষ্ণসার হরিণকে বাঁচাবার আইন আছে, আট কোটি মেয়েকে বাঁচাবার কোনও আইন নেই।
একটি শিশু যখন জন্ম নেয়, তার কোনও ধর্ম থাকে না। তাকে বাবা মার ধর্মভুক্ত হতে বাধ্য করা হয়। বুদ্ধি হবার পর তার কোনও অধিকার থাকে না নিজের জন্য কোনও ধর্ম অথবা ধর্মহীনতাকে পছন্দ করার। শাহবানু, ইমরানা, লতিফুন্নেসা, গুড়িয়ারা কি মুসলমানের ঘরে জন্ম নিয়ে দোষ করেছে? কেন তাদের রাষ্ট্র তাদের নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করবে, কেন তারা বঙ্গিত হবে গণতান্ত্রিক অধিকার, মানবাধিকার, সমানাধিকার, বাক স্বাধীনতা, এবং প্রাপ্য নিরাপত্তা থেকে? কী অপরাধ তাদের? আজ শিকলে, বোরখায়, আধাঁরে, পাঁকে বন্দি এইসব মেয়ে। লক্ষ কোটি মেয়ে। এরা ‘তারা’ নয়, এরা ‘আমরা’, এরা স্বাতী, সরস্বতী, এরা দ্রৌপদি, এরা পার্বতী, এরা শ্বেতা, মহাশ্বেতা। এক মেয়ে যখন বন্দি, আমি বিশ্বাস করি তখন সব মেয়েই বন্দি। মেয়েদের বন্দি করা হচ্ছে এই সমাজে, এই দেশে, আর এই দেশেরই এই সমাজেরই মানুষ হয়ে নিজেদের মুক্ত ভাবে যে মেয়েরা, ধিক তাদের। কোনও মেয়েই মুক্ত নয়, যখন সব মেয়ে মুক্ত নয়। এই বোধটি আর কবে মেয়েদের মনে উদয় হবে! অবশ্য উদয় হলেই বা করার কী আছে? মেয়েরা তো ছোট বড় মাঝারি নানান রকম খাঁচায় বন্দি। কারই বা কী করার আছে কঠিন কঠোর পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে! চিৎকার করা যায়। চিৎকার করে কিছু হোক বা না হোক, চিৎকার তো অন্তত হয়। এটিই মেয়েরা যদি সবাই মিলে করতে পারতো! নিজেদেরকে অযথা সুখী এবং স্বাধীন মনে না করে। নিরাপদে এবং নিরুপদ্রবে আছে বলে ভুল না করে!
ভারত আজ উদাহরণ হতে পারতো সত্যিকার গণতন্ত্রের। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ধীরে ধীরে ভারতের উদাহরণ মেনে গণতান্ত্রিক হতে পারতো আরও। শুধু প্রতিবেশীই বা বলি কেন, মধ্যপ্রাচ্যের ধর্মরাষ্ট্রগুলোও শিক্ষা নিতে পারতো। আজ এত বড় একটি রাষ্ট্র ভারত, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক শক্তি ও অতুল সম্ভাবনা, দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে । এই ভারত দায় নিতে পারতো সভ্যতার। দায় যদি বড়রা না নেয়, তবে নেবে কে?
আসছে নভেম্বরে কলকাতা শহরে হতে চলেছে ধর্মমুক্ত মানববাদী মজ্ঞের কনভেনশন। কনভেনশনে ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি চাই’ বলে দাবি উঠবে। এই মজ্ঞের সকলের জন্ম মুসলিম পরিবারে। গিয়াসউত্তিন, সুলতানা ওয়াজেদা, মোজাফফর হোসেন, সুলেখা বেগম, জাহানারা খাতুন, ফাতেমা রহমান, গোলাম ইয়াজদানি, মহব্বত হোসেন এরকম অনেকে। সরকার কি কিছু জঙ্গিকে মুসলমানের প্রতিনিধি না ভেবে এই শিক্ষিত সচেতন বিবেকবান যুক্তিবাদী বিজ্ঞানমনস্ক, মানববাদে এবং মানবাধিকারে, গণতন্ত্রে এবং সেকুলারিজমে বিশ্বাসী মানুষদের মুসলমানের প্রতিনিধি ভাবতে পারেন না? পারলে চিত্র বদলে যায়। একটি বৈষম্যহীন আগামির স্বপ্ন আমরা দেখতে পারি। মজ্ঞের আরও দাবি ‘মানবাধিকার, নারীর অধিকার, ধর্মমুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা, ধর্মীয় সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ’—এসব প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগও নির্বিঘ্নে নেওয়া যেতে পারে।
খুব বেশি তো দাবি নয়, অতি সামান্যই দাবি, সামান্য একটু সভ্য হওয়ার দাবি। রাষ্ট্রকে, আইনকে, সমাজকে সামান্য সভ্য করার দাবি। দাবিটি তো অযৌক্তিক নয়। দাবিটি তো ন্যায্য। এই দাবিকে যারা তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চায়, তারা কি সত্যিই বৈষম্যহীন বিদ্বেষহীন সমাজ চায়? তারা কি আদৌ দেশের এতটুকু ভালো চায়?
১১. মঙ্গল কামনা
১. ভাইদের মঙ্গল কামনা করার জন্য কলকাতায় শুরু হয়েছে ভাইফোঁটার আয়োজন। আমাকে ক’জন আবদার করেছিল ভাইফোঁটা দেবার জন্য। আমি সেই ভাইদের বললাম, ‘আপনারা বোনফোঁটার ব্যবস্থা করুন। বোনদের মঙ্গল কামনা করে তাদের কপালে ফোঁটা পরান। আপনাদের মঙ্গল তো অনেক হলো। এবার বোনের মঙ্গলের জন্য কিছু করুন। নিয়ম পাল্টান।’
