‘ইমরানা তো আমাদের নয়, তাদের।’ সুতরাং ‘তারা’ যা ইচ্ছে করে, তাই করবে ইমরানাকে। এমন কথা অমুসলমানদের অনেকেই উঠতে বসতে বলছে। প্রশ্ন হল, এই তারাটা কারা? তারাটা নাকি মুসলমানরা। এর মানে হচ্ছে ইমরানা মুসলমানদের, সুতরাং মুসলমানি বিধিব্যবস্থার শিকার তাকে হতেই হবে। মুসলমান না হয়ে সে হিন্দু বা খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ বা জৈন বা ইহুদি বা নাস্তিক হলে তাকে শিকার হতে হত না। ভারতে ভিন্ন ভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য বরাদ্ধ ভিন্ন ভিন্ন ধর্মভিত্তিক আইন। এসব আইনের সংস্কার হয়েছে আজ অনেককাল। যেমন, হিন্দু পুরুষের বহুবিবাহ নিষিদ্ধ, হিন্দু নারী সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে আর বঙ্গিত নয়। কিন্তু মুসলমানদের মাথার ওপর সপ্তম শতাব্দীর আইন, যেমন ছিল তেমনই আছে, সংস্কারের কিছুই হয়নি এতকাল, আর ভারতবর্ষের সব মুসলমানকে মাথা পেতে বরণ করতে হচ্ছে এই পচা পুরোনো আইন, এই আইন তারা পছন্দ করুক বা না করুক। প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোয় কিন্তু শরিয়তি আইনের প্রচুর সংস্কার হয়েছে, ওখানে পুরুষেরা ‘তালাক তালাক তালাক’ উচ্চারণ করলেই তালাক হয় না, ওখানে পুরুষের একসঙ্গে চার স্ত্রী রাখার খায়েশ হলেই তা পূরণ হয় না। ইসলামি রাষ্ট্রেও শরিয়তি আইনের সংস্কার হচ্ছে। সংস্কারের বালাই নেই কেবল ভারতেই। আজ ইমরানাকে ইসলামি আইনের কবল থেকে বাঁচতে দেওয়ানি বা ফৌজদারি আইনের আশ্রয় নিতে হয়। ইসলামি আইনে বা শরিয়তি আইনে ধর্ষক শ্বশুরের শাস্তি নেই। শাস্তি তো নেই-ই, বরং উপঢৌকনের ব্যবস্থা আছে। ধর্ষিতাকে উপঢৌকন হিসেবে ধর্ষকের লিঙ্গে নিবেদন করা হয়। ধর্ষক যেন দিবানিশি নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় ধর্ষণ করে যেতে পারে ধর্ষিতাকে। ভারতীয় আইনে ইমরানারা বিচার পায় ঠিকই, কিন্তু ধর্মীয় আইনেই আবার অবিচার জোটে। এক আইনে মেয়েদের বাঁচানো হয়, আরেক আইনে মারা হয়। কিন্তু, সভ্য আইনের পাশাপাশি অসভ্য আইন বহাল রাখার যুক্তি কী? সমতার পেছনে অসাম্যকে লেলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য কী? পরস্পরবিরোধী দুটো আইনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য দোলনা দুলিয়ে কারও কি আদৌ কোনও লাভ হচ্ছে? লাভ হয়তো কিছু বদ পুরুষের হচ্ছে, মেয়েদের ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে মজা করে মজা দেখার লাভ। কিন্তু ক্ষতি তো হচ্ছে তাবৎ মেয়েদের! অর্ধেক জনসংখ্যার। অযুত সম্ভাবনার। তার চেয়ে একটি আইনই থাকুক, যে আইনে অপরাধীর শাস্তি হয় আর নিরপরাধী মুক্তি পায়! না, এটিতে অনেকের আপত্রি। আপত্রি কিছু জঙ্গি সন্ত্রাসী মুসলমানের আর লোকনীতির (পলিটিজ্ঞের) লোকের। ‘মুসলমানরা যেহেতু চাইছে শরিয়তি আইন — তা তাদের দিতে হবে।’ কেন চাইছে, কী শিক্ষা থেকে চাইছে, কী বিদ্যা থেকে চাইছে, এই আইন কারও কোনও ক্ষতি করছে কী না তা খতিয়ে দেখার কেউ নেই। এই আইন কি শিক্ষিত বিবেকবান মুসলমানরা চাইছে? এই আইন কি মুসলমানরা চাইতো যদি তারা বিজ্ঞান-শিক্ষায় সত্যিকার শিক্ষিত হত? ‘মুসলিম পারিবারিক ও উত্তরাধিকার আইন’ মানুষের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করছে কি না, নারীর সমানাধিকারকে মানছে কী না, গণতন্ত্রের সব শর্ত পূরণ করছে কি না – তা দেখছেটা কে শুনি? কে দেখছে যে ধর্মীয় আইনের প্রথম এবং প্রধান এবং একমাত্র ভিকটিম হচ্ছে মেয়েরা। মেয়েরা এবং মেয়েরাই।
‘তারা আলাদা আমরা আলাদা।’ ‘মুসলমানরা যদি নিজেরাই নিজেদের কবর খুঁড়তে চায়, তাতে আমাদের কী! আমরা বাঁচলেই তো হলো।’ এরকম কাণ্ডজ্ঞানহীন বাক্য বুদ্ধিজীবীরাও উচ্চারণ করেন। তবে মুসলমানরা না বাঁচলে তাঁরাও যে বাঁচবেন না, এ কথা বারবারই তাঁরা ভুলে যান। বাঁচতে হলে একসঙ্গেই সবাইকে বাঁচতে হয়। মুসলমানরা শক্ত শক্ত কোদাল শাবল নিয়ে নিজেদের কবর সত্যি সত্যি খুঁড়ছে। যারা খুঁড়ছে তাদের খুব কম সংখ্যক জানে যে তারা খুঁড়ছে। বোধবুদ্ধিহীন বাকিরা জানে যে এ তাদের বেহেস্তে যাবার সুড়ঙ্গপথ। সবচেয়ে আফশোসের ব্যাপার এই, যে, এই বেঁচে যাওয়া আমরা জানি না যে ওটা আমাদেরও সুড়ঙ্গপথ, তবে বেহেস্তে যাবার নয়, নরকে যাবার। কোদাল শাবল নিয়ে আজ নিজেদের কবর যারা খুঁড়ছে, তারা কিন্তু সবসময় নিজেদের কবরই খুঁড়বে না, অন্যদের কবরও খুঁড়বে। কবরে পা পিছলে পড়বে যাদের ৪৯ জন্য কবর নয়, যারা সেইফসাইডে, তারাও। মাটি তো এক। না কি? আসলে এক দেশের, এক রাষ্ট্রের মানুষের মধ্যে আলাদা আলাদা কানুন চালু করলে মানুষ চিরকাল আলাদাই থেকে যায়। সেগ্রেগেটেড। বিচ্ছিন্ন। তারা কিছুতেই একাত্ম হতে পারে না। সৌহার্দের বন্ধন সৃষ্টি হয় না। যতদিন না আমাদের আর তাদের একত্রবাস হচ্ছে, ততদিন তাদেরকে অচেনা গ্রহের অচেনা জীব বলেই আমাদের মনে হবে। না হওয়ার কোনও কারণ নেই। মূল জনস্রোত থেকে পিছিয়ে পড়া কোনও সংখ্যালঘুর জন্য মুক্তচিন্তায় পারদর্শি হওয়া দুঃসহ। আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগতে তারা বাধ্য হয়। ভুগতে ভুগতে একদিন ধর্মকেই আঁকড়ে ধরে নিজের পরিচয় হিসেবে। ধীরে ধীরে তারা ধর্মবাদী হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে অসহিষ্ণু অচেতন মৌলবাদী।
বিজেপি বলছে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির কথা। ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ বলে যাদের খ্যাতি আছে, তারা রাগ করেছে শুনে। বিজেপির বিরুদ্ধশিবির বলেই তাদের উল্টোকথা বলতে হবে, স্বরচিত এই নিয়ম মেনে বলছে তারা – ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি মানি না’। এটি মানার দু হাজার কারণ থাকলেও বলছে মানি না। না মানার কী কী কারণ? একটিই কারণ। বিজেপি মানছে। বিজেপি মানছে বলে অন্য দলের তা মানা যাবে না। বিজেপি যদি বলে সূর্য পূর্বদিকে ওঠে, তাহলে কি বিরুদ্ধশিবিরকে বলতে হবে যে সূর্য পূর্বদিকে ওঠে না, ওঠে পশ্চিমদিকে? অনেকে মনে করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি মানে মুসলমানদের বুঝি ‘হিন্দু আইন’ মানতে হবে। হিন্দু আইনের কথা এখানে হচ্ছে না, অন্য কোনও ধর্মভিত্তিক কোনও আইনের কথাও হচ্ছে না, অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বলতে যা বোঝায় তা হল সমানাধিকারের ভিত্তিতে রচিত বিধি, যে বিধিতে ধর্মের ধ-ও নেই, নারী ও পুরুষের সমান অধিকার যে বিধি নিশ্চিত করে। একটি সভ্য গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য এই ধর্মগন্ধহীন নিষ্কলুষ বিধি নিতান্তই অপরিহার্য। মানবাধিকারের সুবিধে কিছু মানুষকে দেওয়ার, এবং কিছু মানুষকে সেই সুবিধে থেকে বঙ্গিত করার আইন বহাল থাকে যে রাষ্ট্রে, সেই রাষ্ট্রকে আর যাই বলা যাক, গণতান্ত্রিক বলা যায় না। যে কোনও ধর্মীয় আইনই যে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, এবং নারীর অধিকারের পরিপন্থী তা যে কোনও সুস্থ মানুষেরই বোঝার কথা।
