সারা পৃথিবীতে বেড়ালের সংখ্যাট কোটি। বিবর্তনের মজা এখানেই। মানুষের সঙ্গে মানুষের এলাকায় বাস করা বেড়ালগুলোই টিকে আছে। বনের বেড়ালগুলো বরং নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। যে বেড়ালগুলো বুদ্ধি করে বন থেকে চলে এসেছিল মানুষের আশ্রয়ে, তারা ঠিক কাজ করেছিল। চোখ কান খোলা রাখতে হয়, ভালো ভাবে বাঁচা যাবে এমন কিছুর গন্ধ পেলে পুরোনা জায়গা ছেড়ে নতুন জায়গায় তড়িঘড়ি চলে যেতে হয়। মানুষ তার জীবনের শুরু থেকেই জায়গা বদলাচ্ছে। ক্রমশ ভালো আবহাওয়া, ভালো পরিবেশ, ভালো বাড়ি, ভালো খাদ্য, ভালো শিক্ষা, ভালো বেঁচে থাকার দিকে যাচ্ছে। জায়গা বদলেছে বলে হোমো সেপিয়েন্স নামের মানুষ-প্রজাতি টিকে আছে, নিয়ানডার্থাল নামের মানুষ-প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
মানুষ যখন মূলত শিকারী ছিল, তখন কুকুরকে সঙ্গে রাখতো। যখন থিতু হলো, কৃষিকাজ শুরু করলো, তখন কুকুরের বদলে বেড়াল হলো বিশ্বস্ত সঙ্গী। বেড়াল শস্য খেতে আসা ইঁদুর মারতো, ও খেয়েই দিব্যি মনের সুখে খামারে বাস করতো। আর মানুষও খুশি ছিল বেড়ালের ওপর, বেড়ালকে দিয়ে ইঁদুর মারার কাজ চলতো বলে, শস্যের অভাব হতো না বলে। প্রাচীন মিশরীয়রা বেড়ালের পুজো করতো। বেড়াল দেবীর নাম ছিল বাস্ট। বেড়াল-পুজোর মন্দিরও ছিল মিশরে। মিশরীয় আইনে মানুষের চেয়েও বেশি মর্যাদা পেতো বেড়াল। কোনও বাড়িতে আগুন ধরলে, আগে মানুষকে নয়, আগে বেড়ালকে বাঁচানোর নিয়ম ছিল। শুধু মিশরের রাজা বাদশাহর মমি বানানো হতো তা নয়, বেড়ালেরও মমি বানানো হতো, বেড়ালের এক কবরখানায় তিন লক্ষ বেড়ালের মমি পাওয়া গেছে। কেউ কোনও বেড়ালকে প্রাণে মেরে ফেললে জেল-হাজত জরিমানা নয়, যাবজ্জীবনও নয়, রীতিমত মৃত্যুদণ্ড হত। প্রাচীন রোমও অনেকটা এরকমই ছিল। বেড়ালকে স্বাধীনতার প্রতীক বলে ভাবা হত। দুরপ্রাচ্যে বেড়ালের মর্যাদা আবার অন্য কারণে বেশি ছিল। বেড়ালরা নথিপত্র। পাণ্ডুলিপি এসব ইঁদুরের দাঁত থেকে রক্ষা করত বলে।
চারদিকে বেড়ালকে যখন মানুষ ঈশ্বরের বা প্রায় ঈশ্বরের সম্মান দিচ্ছে, তখন মধ্যযুগে, হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই, বেড়ালকে অশুভ প্রতীক, ডাইনির সঙ্গী, শয়তানের দূত বলে ভাবতে শুরু করলো ইওরোপীয়রা। প্লেগের জন্য দায়ী বেড়াল, এমনও অভিযোগ করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশে বেড়াল নিয়ে এখনও কুসংস্কার চূড়ান্ত। কালো বেড়াল পথে পড়লে গাড়ি থামিয়ে দেয় লোকে। একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কালো বেড়াল রাস্তা পার হচ্ছে মানে কী? এর মানে, বলেছিলাম, কালো বেড়ালটা কোথাও যাচ্ছে। কুসংস্কার যারা বোঝে, তারা কৌতুক বোঝে না।
যে প্রাণীটি লোকে সবচেয়ে বেশি পোষে, তা গরু নয়, ঘোড়া নয়, কুকুর নয়, পাখি নয়, তা বেড়াল। ইওরোপ আমেরিকার প্রায় ঘরে ঘরে বেড়াল। এক যুক্তরাষ্ট্রেই পোষা বেড়ালের সংখ্যা নকোটি। যে প্রাণীটি কোনও দুধ দেয় না, বোঝা বইতে পারে না, যার চামড়া দিয়ে কোনও কিছু বানাবার উপায় নেই, যে মানুষের কোনও উপকারে আসে না আজকাল, সেই প্রাণীকেই সবচেয়ে বেশি পুষছে মানুষ, ব্যাপারটি খুবই অদ্ভুত। এক বন্ধু বলেছিল, বেড়াল জল এড়িয়ে চলে, আর তাদের সবচেয়ে প্রিয় খাবার কি না মাছ! বিবর্তন দুনিয়ার কত কিছু যে পাল্টে দেয়। আমার বেড়ালটার কথাই বলি, নাম মিনু। নিজের মাছটাও নিজে খেতে জানে না। কাঁটা বেছে দিলে তবে খাবে। দেখে একবার আমার এক বন্ধু বলেছিলো, কী ব্যাপার, তুমি তো বেড়ালটাকে কাঁটা বেছে মাছ খেতে দিচ্ছ। আমি তো এতকাল জানতাম বেড়ালরা কাঁটা খায়। কাঁটা বেছে বেড়ালকে মাছ খেতে দেওয়ার মানে বেড়ালের বেড়ালত্ব কিছু আর অবশিষ্ট নেই, মনুষ্যত্ব ডেভেলপ করেছে।
তা ঠিক, মিনুকে দেখলে যে কেউ বলবে মিনুর ভেতরে বেড়ালত্ব কিছু আর নেই, যা আছে, তা মনুষ্যত্ব। আজ নবছর মিনু আমার সঙ্গে। গড়িয়াহাটের মাছের বাজারে অসহায় দাঁড়িয়ে থাকা ছানাটাকে বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম, আজ তার জীবন অনেকটা রানির মতো বা দেবীর মতো। কত রকম সরকারী নির্যাতন গেল আমার ওপর, সবাই চলে গেলো, সব বন্ধু, সব অনুরাগী, শুধূ মিনু রয়ে গেলো। ও আর যাবে কোথায়! রাস্তার জীবনে ও আর অভ্যস্ত নয়, শিকার করেও খেতে পারবে না, চুরি করেও না। ওসব ও অনেককাল ভুলে গেছে অথবা শেখেইনি কোনওদিন। রাস্তায় বেরোলে গাড়ি ঘোড়া কুকুর মানুষের হাতে নির্ঘাত মরবে। তার চেয়ে নিরাপদ ঘরে ঘুমোবে খেলবে, সুস্বাদু খাবার দেওয়া হবে, বিদেশি কোম্পানির ট্রিটস,রয়েল ক্যানিন ফুড, কখনও নাক সিঁটকাবে, অভিমান করবে, রাগ করবে, খেতে পীড়াপীড়ি করলে খাবো না বলে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে থাকবে, হাতে পায়ে ধরেও মুখ খোলানো যাবে না, কখনও মর্জি হলে তবেই মুখে খাবার তুলবে। বাড়ি ভর্তি তার খেলনা, পুরো বিকেল জুড়ে তার সঙ্গে খেলতে হবে। আবদারের অন্ত নেই। গরমে তার এসি চাই, শীতে তার পশমী কম্বল চাই, উলের জ্যাকেট চাই, হিটার চাই। কেউ বিশ্বাস করুক না করুক, তার আলাদা শোওয়ারঘর, আলাদা বিছানা, আলাদা টয়লেট। টয়লেট কখনও অপরিষ্কার পেলে। চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করবে। আগে তার টয়লেট পরিষ্কার চাই, পরে অন্য কথা। শুধু যে নিজের কথাই ভাবে, তা নয়। সেদিন জ্বর হয়েছিল আমার, যতক্ষণ না জ্বর না সারলো, শিয়র থেকে নড়লো না। এই হলো আমার পালিতা কন্যা মিনু।
