২৯৫ ক,খ,গ এই তিনটি ধারাকেই উপমহাদেশ থেকে অতি শীঘ্র বিদেয় করা উচিত। এটি থাকলে এটি ব্যবহৃত হবেই মানুষের বাক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। সুতরাং না থাকাটাই বাঞ্ছনীয়। ৬৬ক বাতিল করাটা প্রথম ছোট্ট পদক্ষেপ। ধীরে ধীরে পা ফেলতে হবে বৃহত্তর শত্রুর দিকে। পৃথিবীর কোনও সভ্য দেশে বাক স্বাধীনতা বিরোধী এত আইন নেই। থাকলেও মৃত পড়ে আছে, লেখক-শিল্পীর স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এখানকার মতো ওসব আইন অন্য কোথাও এত ব্যবহৃত হয় না। ফোজদারি আইনের ২৯৫ক,খ কে বাতিল করার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন সব করবো।
বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির ৫৭ ধারাটিও ভারতের ৬৬ক এর মতো, একই ধরনের। বাংলাদেশে কেউ কি নেই ওই ধারাটিকে চ্যালেঞ্জ করার? বাংলাদেশেও ৫৭ ধারার আওতায় হুটহাট ধরে নিয়ে যায় ছেলে মেয়েদের। অন-লাইনে কেউ কোনও লেখার লাইক দিল, বা কোনও প্রতিবাদে নাম লেখালো, ওমনি তাকে বেধে নিয়ে যাওয়ার জন্য পুলিশ আসবে। ৫৭ ধারায় কম ধর-পাকড় হয়নি, কম হেনস্থা হয়নি। আশা করে আছি বাংলাদেশের মানুষ ৫৭ ধারাটি অতি শীঘ্র বাতিল করবে এবং দেশটির পরিবেশ বাসযোগ্য করে তুলবে। একটা গণতন্ত্র শুধু ধর্মবিশ্বাসী মানুষের নিরাপত্তার অঙ্গীকার করে না, ধর্মমুক্ত মানুষদের নিরাপত্তা দেওয়ার অঙ্গীকারও করে। মত এবং ভিন্ন মত– দুই অধিকারও নিশ্চিত করে।
নারীবিরোধী ও মানবতাবিরোধী ধর্মান্ধদের তথাকথিত ধর্মানুভূতিতে যেন আঘাত লাগে, সে কারণে জগৎ সজাগ। এখনও কি জগতের সময় হয়নি সবাইকে সমান চোখে দেখার! ধর্মান্ধদের বাড়তি খাতির না করার! যুক্তিবাদীদের মানবাধিকারকে সম্মান করার!
বাঘ আর বেড়াল
১. প্রসেনজিৎ লিখেছেন, বাঘের কিন্তু জাত আলাদা হয়, বেড়ালকে ভুল করে বাঘ না ভাবাই ভাল। অমনি বাংলাদেশের লোকরা ভেবে বসলো প্রসেনজিৎ বাংলাদেশের ক্রিকেট টিম নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। বেচারাকে ননস্টপ গালাগালি করতে লাগলো সবাই। এদিকে প্রসেনজিৎ ক্ষমা চাইলেন, বললেন তাঁর ওই মন্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশ বা এর ক্রিকেট দলের কোনও সম্পর্ক নেই, তিনি তাঁর সিনেমার একটি ডায়লগ বলেছেন মাত্র। বাংলাদেশের ক্ষুব্ধ দেশপ্রেমিকদের রাগ এখনও পড়েনি। নায়ক মশাইকে হাতের কাছে পেলে কী করতো, ওরাই জানে।
আমি মনে করি প্রসেনজিৎ ভুল লিখেছেন। বাঘ এবং বেড়ালের জাত মোটেও আলাদা নয়। ওরা এক জাত। ওরা ফিলাইন জাত। বাঘরাও একধরনের বেড়াল। আকারে বড় এই যা। প্রসেনজিৎ বেড়ালকে তুচ্ছ করে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের লোকরাও বেড়ালকে অপমান করেছে। বাঘ না ডেকে তাদের বেড়াল ডাকা হয়েছে। মনে করে ক্ষুব্ধ হয়েছে তারা।
যে বেড়াল দশ হাজার বছর আগে জঙ্গল ছেড়ে লোকালয়ে এসে মানুষের উপকার করেছিলো, যে বেড়ালকে প্রাচীন মানুষেরা রীতিমতো পুজো করতো, যে বেড়াল এখনও মানুষের সঙ্গে মানুষের ঘরে পরিবারের একজন হয়ে বাস করে, সেই বেড়ালকে নিচু করে, বাঘকে– যে বাঘের সঙ্গে আমাদের ঘরগেরস্থালীর সম্পর্ক নেই, যে বাঘ আমাদের পেলে চিবিয়ে খাবে, সেই বাঘকে আমরা আপন ভাবছি বেশি, ভালবাসছি বেশি! না, বাঘের সঙ্গে আমার কোনও বিরোধ নেই। বাঘ যেন বিলুপ্ত না হয়, তা আমি ভীষণই চাই।
কিন্তু বেড়ালকে খবরদার এভাবে আর তুচ্ছতাচ্ছিল্য করোনা। বেড়াল না থাকলে মানুষের একসময় না খেয়ে মরতে হতো, মনে রেখো। বাঘ হিংস্র, তাই ভালো লাগে? বেড়ালও কিন্তু হিংস্র হতে পারে। চটিয়ে একবার দেখ না!
২.বেড়ালের ইতিহাসটা না জানো তো বলি, শোনো। মানুষের এলাকায় বাস করা যত বেড়াল আছে পৃথিবীতে, সবারই পূর্বনারী বা পূর্বপুরুষই নিয়ারইস্টার্ন ওয়াইল্ডক্যাট বা নিকটপ্রাচ্যের বনবেড়াল। এই বেড়ালদের ডিএনএ নিকটপ্রাচ্যের বনবেড়াল ছাড়া অন্য চার রকম যে বনবেড়াল আছে– ইওরোপীয় বনবেড়াল, দক্ষিণ আফ্রিকার বনবেড়াল, মধ্য এশীয় বনবেড়াল, চীন-মরুভূমির বনবেড়াল– ওদের ডিএনএ-র সঙ্গে মেলে না। জিজ্ঞেস যদি করো নিকটপ্রাচ্যের দেশগুলো কী কী, বলবো, বাহরাইন, সাইপ্রাস, মিশর, ইরান, ইরাক, ইজরাইল, জর্দান, কুয়েত, লেবানন, লিবিয়া, ওমান, কাতার, সৌদী আরব, সুদান, সিরিয়া, তুরস্ক, আরব আমিরাত, প্যালেস্টাইন, ইয়েমেন।
আমরা এতকাল জানতাম চার হাজার বছর আগে জঙ্গল থেকে বনবেড়াল প্রথম ঢুকেছিল মিশরের লোকালয়ে। কিন্তু আমাদের এতকালের ওই জানাটা ভুল ছিল। বনবেড়াল জঙ্গল থেকে লোকালয়ে এসেছে আরও আগে। নানা রকম প্রমাণ জড়ো করে এখন অবধি যা তথ্য পাওয়া গেছে, তা হল, নিকটপ্রাচ্যের বনবেড়ালদের মধ্যে কেউ কেউ, সম্ভবত হায়েনা আর বাঘ ভালুকের হাত থেকে বাঁচার জন্য, মানুষের এলাকায় ঢুকে পড়েছিল, দশ বা বারো হাজার বছর আগে, কোনও নিকটপ্রাচ্যদেশে। আজ তারই বংশধর আমাদের মাঠে ময়দানে, রাস্তা ঘাটে, অলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ানো আর বাসা বাড়িতে বাসা করা বেড়াল। ১৯৮৩ সালে সাইপ্রাসে প্রথম পাওয়া গেছে আট হাজার বছর পুরোনো বেড়ালের চোয়ালের হাড়। তারপর বছর দশ আগে যেটা পাওয়া গেছে, সেটা চোয়ালের হাড়-টাড় নয়, রীতিমত কঙ্কাল। আস্ত একটা মানুষের সঙ্গে আট মাস বয়সী আস্ত একটা বেড়ালকে কবর দেওয়া হয়েছিল, কবরটা সাড়ে নহাজার বছর পুরোনো। কবরটা দেখেই বোঝা গেছে, ওই এলাকায় বেড়ালরা মানুষের সঙ্গে বসবাস শুরু করেছে বেশ অনেক আগেই। কিছু কিছু নৃতাত্ত্বিক তো বলতে শুরু করেছেন, দশ বারো নয়, পনেরো হাজার বছর আগে বনবেড়াল মানুষের এলাকায় ঢুকেছে। দীর্ঘকালের সম্পর্ক না হলে অত আদর করে কেউ কোনও বেড়ালকে নিয়ে কবরে শুতো না। সাইপ্রাসে তুরস্কের চাষীরা বাসা বেঁধেছিল। তারাই সম্ভবত তুরস্ক থেকে পোষা বেড়াল নিয়ে আসে। তুরস্ক থেকেই, তা না হলে আর কোথাও থেকে বেড়াল জোটার কোনও সম্ভাবনা ছিল না সাইপ্রাসে। সাইপ্রাসের আশে পাশের কোনও জঙ্গলে বনবেড়াল ছিল না।
