মিনু আর এখন বেড়ালের মতো কাঁদে না। কাঁদে মানুষের মতো। হাসেও হয়তো মানুষের মতো। এই মিনুরই পূর্বনারীরা জঙ্গল থেকে মানুষের এলাকায় ঢুকে পড়েছিল। এককালে, ইঁদুর শিকার করার কাজ পেয়ে বর্তে গিয়েছিল। আজ সেই বনবেড়ালের বংশধর ঘরের জীবন যাপনে এমনই অভ্যস্ত হয়েছে যে ইঁদুর দেখলে ভয় পায়। খেলনা ইঁদুরের ঘাড়ে বেশ ছুটে এসে কামড় দেয়, কিন্তু জ্যান্ত ইঁদুর দেখে দৌড়ে পালায়। ঘর-পোষা বেড়ালগুলোর স্বভাব চরিত্র এত পাল্টে যাচ্ছে যে বেড়ালের বদলে অন্য কোনও নামে হয়তো এদের ডাকতে হবে। কী নামে?
বারসেলোনা
বারসেলোনার গল্প বলেছি? শহরটা আমার খুব প্রিয়। আমার স্প্যানিশ পাবলিশার এডিশান বিবারসেলোনারই। প্রথমবার যখন গিয়েছিলাম আমার বই উদ্বোধনে,মাদ্রিদ থেকে উড়ে এসেছিলেন এক মন্ত্রী। জাস্ট অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য মূলত হয়তো ফটো তোলার জন্য আমার সঙ্গে। পরের দিনের নিউজপেপার ছেয়ে গিয়েছিল দুজনের ছবিতে। অনুষ্ঠানে বক্তব্য পেশ করার চেয়ে আমার ভালো লেগেছে পিকাসো মিউজিয়াম, দালি মিউজিয়াম, গাউদির গির্জায় ঘুরে বেড়াতে, মিরোর কাজ দেখতে। ভূমধ্যসাগরের পাড়ে বসে থাকতে। বারসেলোনার মেয়র বাড়িতে ডিনার খেতে ডেকেছিলেন। শহরের চাবি টাবিও হয়তো দিয়েছিলেন। ক্যাটালান লেখকরাও ডেকেছিলেন। ওঁরা বারসেলোনাকে ক্যাটালুনিয়া বলেন। ক্যাটালান কালচার নিয়ে। ভীষণ গর্বিত।
শেষবার বারসেলোনায় গিয়েছি বারসেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্টারকালচারাল কমিউনিকেশনএর ওপর একটি বক্তৃতা দিতে। সেবার কী আশ্চর্য, ছাত্রছাত্রীরা আমাকে নিয়ে উৎসব করেছিল। ওদের ক্যাটালান কালচারে পোরোঁ নামে ওয়াইন রাখার জন্য একধরনের পাত্র আছে, যেটি দেখতে বোতল আর বদনির মতো। সেই পোরোঁর নল দিয়ে ওয়াইন ঢালতে হবে মুখে। হাতটা যত দূরে সম্ভব রেখে। এভাবে ওয়াইন খাওয়া ওদের ট্র্যাডিশান। কিন্তু এ তো আমার ট্র্যাডিশান নয়। বাইরের মানুষ হিসেবে আমি যেভাবে পোরোঁ থেকে খেতে পেরেছি, একটুও না ফেলে, দেখে ছাত্রছাত্রীরা রীতিমত মুগ্ধ। আমাকে একটা সার্টিফিকেট দিয়েছিল, পোরোঁ থেকে ওয়াইন খাওয়ায় ব্যাপারে থিওরি অ্যান্ড প্র্যাকটিসে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করার জন্য। আস্ত একটা পোরোঁও দিয়েছিল উপহার। সেন্স অব হিউমার যে কী প্রচণ্ড ওদের। দুটো ছবি আছে। বলে ওরা দেখতে কেমন তা জানি, কিন্তু ওদের কারওর নাম এখন মনে নেই।
বিলবাও
বিলবাওয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম একবার। বিলবাও স্পেনের একটি শহর। বাস্ক ভাষার দেশ বলা যায়। যে বাস্ক ভাষা পৃথিবীর অন্য কোনও ভাষার সঙ্গে মেলে না। এ ভাষাটি কোত্থেকে এলো কেউ জানে না। আপাতত ধরা যাক এটি আকাশ থেকে এসেছে। আমার বক্তৃতার টপিক ছিল ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন। মূলত অনুষ্ঠান ছিল ফ্রিডম অব মিউজিক নিয়ে। শিল্পীরা এসেছিল বিভিন্ন দেশ থেকে। বিশেষ করে যে সব শিল্পীকে গান গাইতে বাধা দেওয়া হয়, কারণ তাদের গানের কথাগুলো সরকারের পছন্দ হয় না। আমার হোটেল রুমে একদিন অনেক রাত অবদি আড্ডা দিয়েছিলো ডেনমার্কের ফ্রিমিউজের অ্যাকটিভিস্ট, ইরান আর জিম্বাবুয়ের শিল্পীরা। তারা আমাকে সেইসব নিষিদ্ধ গান গেয়ে শুনিয়েছিল।
প্রায় সাতদিন ছিলাম। ওই সাতদিনে চমৎকার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল আমার বডিগার্ডদের সঙ্গে। ওরা আমাকে বাস্ক কিছু শব্দ শিখিয়েছিলো। টয়লেটটা কোথায় বাস্ক ভাষায় কমুনা, নন ডাগো, ধন্যবাদ বাস্ক ভাষায় এসকেরিক আস্কো। এরকম আরও অনেক। আমি যেতে চেয়েছিলাম তাপাস খেতে, আর গুগেনহাইম মিউজিয়াম দেখতে। ওখানে তো নিয়ে গেলই, বিলবাওটা পুরো ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলো, লাঞ্চ খাইয়েছিল, হ্যাঁ আমাকে খাইয়েছিল ওরা, দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল একটা ব্রিজ, গুস্তাভ ইফেলের এক শিষ্য যে ব্রিজটি বানিয়েছিল।
সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, আমাকে যখন এয়ারপোর্টে বিদায় দিতে এসেছিল। ওরা, ওদের মুখ ছিল বিষণ্ণ, একজনের চোখে ছিল জল। বুঝি যে ওরা মন্ত্রী টস্ত্রীর বডিগার্ড হয়ে অভ্যস্ত, কখনও হয়তো কোনও লেখকের বডিগার্ড হয়নি যারা ওদের সম্মান দেয়, তাই বলে জল? অনেকদিন নেটে যোগাযোগ করেছে আমার সঙ্গে। বলেছে নর্থ সীতে সেইলিংএ যাবে ফ্যামিলি নিয়ে, আমিও যদি যাই তাহলে ভীষণ আনন্দ পাবে। আমার যাওয়া হয়নি।
ব্যক্তিগত শোক
আমার ছোড়দার মৃত্যু হলো নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে। ঠিক যেভাবে মৃত্যু হয়েছিল লেখক হুমায়ুন আহমেদের। ওই একই হাসপাতালে। হুমায়ুন আহমেদের ছিল কোলন ক্যানসারের সঙ্গে লিভার মেটাসটাসিস। আমার ছোড়দারও ছিল লিভার মেটাসটাসিস, তবে মূল ক্যানসার কোলনে ছিল না, ছিল প্যানক্রিয়াসে। ক্যানসারের ভালো চিকিৎসা পাওয়ার পর দুজনের শরীরে ক্যানসার প্রায় ছিল না বললেই চলে। কিন্তু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের রক্তে ঢুকে পড়ে হাসপাতালের ভয়ংকর ব্যাকটেরিয়া, কোনও ওষুধেই যার মৃত্যু নেই, যে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত খেয়ে ফেলতে থাকে ফুসফুস, কিডনি, মস্তিষ্ক, হৃদপিণ্ড। এই ব্যাকটেরিয়াগুলোকে হসপিটাল বাগ বলা হয়। খুব ভয়ংকর এই বাগ। কোনও অ্যান্টিবায়োটিকই এই বাগকে সামান্যও স্পর্শ করতে পারে না, এই বাগের জন্ম হাসপাতালেই। হাসপাতালের নানা অ্যান্টিবায়োটিক পেতে পেতে কিছু ব্যাকটেরিয়া আজরাইলে পরিণত হয়। এই ব্যাকটেরিয়া যাকে ধরে, তার মৃত্যু অনিবার্য। হসপিটাল বাগকে কাবু করার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। হুমায়ুনের আহমেদের মৃত্যু দেখিনি, পূরবী বসুর কাছে শুনেছি কী ভাবে মারা গেছেন তিনি। তবে আমার ছোড়দার মৃত্যুটা আমাকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে হয়েছে। যদি ছোড়দা ক্যানসারে মারা যেতো, দুঃখ হতো না। ক্যানসারে মারা যাবে এরকমই জানতাম। ডাক্তারও এরকমই বলেছিলেন। প্রস্তুতিও নেওয়া ছিল। কিন্তু হাসপাতালের ব্যাকটেরিয়া একটা জলজ্যান্ত মানুষকে মেরে ফেলবে, সেটা ভাবা যায় না। বিশেষ করে সে হাসপাতাল যদি পৃথিবীর উন্নত দেশের অন্যতম একটি হাসপাতাল হয়। বেলভিউ হাসপাতালে হসপিটাল বাগ আছে। কারণ হাইজিন সুবিধের নয় এই হাসপাতালে। সাধারণত মেডিক্যালের যন্ত্রপাতির মধ্যেই লেগে থাকে এই ব্যাকটেরিয়া। নার্সরা এক রোগীকে স্পর্শ করে হাত না ধুয়ে আরেক রোগীকে স্পর্শ করলেও এই ব্যাকটেরিয়া ছড়ায়। কী করে ছড়িয়েছে হসপিটাল বাগ এই হাসপাতালে, কী করে আমার ছোড়দার রক্তে ঢুকেছে, তা আমরা জানি না। ডাক্তাররা যখন বুঝতে পারলেন ছোড়দার ফুসফুস চলে গেছে, কিডনি চলে গেছে, তখন আমাদের কাঁচুমাচু মুখে বললেন, কালচার রিপোর্টে দেখছি রেসিসট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া রক্তে, কোনও অ্যান্টিবায়োটিকই কাজ করছে না। হাঁ হয়ে থাকি। তাহলে কি জানিয়ে দেবো, নিউইয়র্কের বড় হাসপাতালটি নোংরা, এখানে চিকিৎসা করতে এলে হসপিটাল বাগআক্রমণ করে, এবং রোগীদের মেরে ফেলে? দুএকজন ডাক্তার মিনমিন করছিল, আসলে কেমোথেরাপি নিতে নিতে ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এত কমে গেছে যে…। ইমিউনিটি কমে যাওয়ার কারণে কি আর হসপিটাল বাগ ধরেছে, কোনও সুস্থ মানুষকেও তো ধরতে পারতো এই বাগ!
