অনন্ত বিজয় দাসকে কুপিয়ে মারা হয়েছে, একমাস হয়ে গেলো। এবার আরেকজন নাস্তিকের খুন হওয়ার সময় হয়েছে। ভয়ে একএকজন সেঁধিয়ে গেছে গর্তে। গর্ত থেকে তো বের হতে হবে। লিখতে হবে যেমন লিখছিলো। নিজের লেখা বন্ধ করে দেওয়া বা সেন্সর করার চেয়ে খারাপ কোনও সেন্সরশিপ নেই। দেশের ভেতর লেখালেখি মাচায় তুলে ভয়ে গুটিয়ে থাকবে। আর বিদেশে চলে গেলে ওখানে ব্যস্ত হয়ে পড়বে বাঁচার লড়াই চালাতে, হয়তো লেখাই তখন বাধ্য হয়ে বন্ধ করতে হবে। দেশের মৌলবাদী পরিবেশ থেকে খুব দূরে চলে গেলে অনেকের লেখা বন্ধ হয়ে যায়। মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের তাগিদটা চলে যায়। দেশকে বাঁচানোর চেয়ে নিজের বাঁচার প্রয়োজনটা বড় হয়ে দাঁড়ায়। তবে কি আমাদের মেনে নিতেই হবে যে দেশের প্রতিভাবান মানববাদী অস্তিত্ববাদী লেখকরা আর লিখবে না। এভাবেই সরকারের উদাসিনতা এই প্রতিভাবান প্রজন্মকে ধ্বংস করে দেবে?
অনন্ত বিজয় দাসের বন্ধু মনির হোসেন অত্যন্ত প্রতিভাবান ব্লগার। যুক্তি পত্রিকাটি অনন্ত আর মনির বের করতো। মনির হোসেনের নাম ওই ৮৪ জনের লিস্টে আছে, যাদের মেরে ফেলার পরিকল্পনা করেছে ইসলামি সন্ত্রাসীরা। অনন্তকে খুন করার পর থেকেই মনির হোসেনকে খুনীরা মৃত্যুর জন্য তৈরি হতে বলছে। কুপিয়ে মারার জন্য খুনীরা মনিরের পিছু নিয়েছে। মনির এক শহর থেকে আরেক শহরে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। দেশ ছাড়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। কিন্তু গরিব দেশের গরিব যুবকদের ভিসা দিতে আগ্রহী নয় বিদেশের রাষ্ট্রদূতগণ। তাঁরা ব্লগারের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করবেন, কিন্তু ওদের বাঁচাতে এগিয়ে আসবেন না। ইউরোপ আমেরিকা ভরে গেছে। মৌলবাদী সন্ত্রাসীতে। বড় বড় কূটনীতিকও জানেন না কাকে ভিসা দিতে হয়, এবং কাকে দিতে হয় না। বিজ্ঞানমনস্ক যুক্তিবাদী প্রতিভাবানকে ভিসা দিলে তাঁদের দেশের লাভ, আর ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীদের ভিসা দিলে তাঁদের দেশের ক্ষতি। হয়তো জানেন। শুধু চিনতে পারেন না কারা মন্দ লোক, কারা ভালো লোক। অনন্ত বিজয় দাসের মতো হীরের টুকরো ছেলেকে সুইডিশ দূতাবাস ভিসা দেয়নি। অথচ সুইডেন ভরে রয়েছে অনন্তকে যারা খুন করেছে, সেই ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীতে।
যাদের লেখা কোনও পত্রিকায় প্রকাশ হবে না, যাদের মত কোনও টিভিতে প্রচারিত হবে না,কারণ তাদের মত সমাজের অধিকাংশ মানুষের মতের চেয়ে ভিন্ন, তাদের জায়গা ছিল ফেসবুকে। ফেসবুকে তারা তাদের ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারতো। সেই ফেসবুকও এখন মৌলবাদীদের খপ্পরে। ফেসবুক একটা নিয়ম চালু করেছিল, কেউ আপত্তিকর কথা লিখলে, নোংরা ফটো পোস্ট করলে ফেসবুকাররা রিপোর্ট করতে পারে। এটিই কাজে লাগাচ্ছে ইসলামিং রিপোর্টিং গোষ্ঠী। এরা লক্ষ লক্ষ। দলবদ্ধ। এদের সর্দার বলে দেয় আজ একে মারো, কাল ওকে ধরো। চলে তাদের গণরিপোর্টিং। এদের রিপোর্টের কারণে প্রগতিশীল, নারীবাদী, নাস্তিক, মৌলবাদ বিরোধীরা তাদের আইডি হারাচ্ছে। মৌলবাদবিরোধী নাস্তিকগোষ্ঠী সংগঠিত নয়, তারা সংখ্যায় লক্ষ লক্ষ নয়। তারা রিপোর্ট করে মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের ফেসবুক থেকে হঠাতে পারবে না। রিপোটিংএর ভয়ে, খুনীদের ভয়ে নাস্তিক ব্লগাররা বেশিরভাগই ব্লগ লেখা বন্ধ করে দিয়েছে। ইত্তিলা ইতু, চার্বাক শুভ্রর মতো প্রগতিশীল ফেসবুকারদের আইডি এখন কাজ করছে না। আবদুল মামুন অসাধারণ ফেসবুকার। তার লেখা মানুষকে সচেতন করে। মানুষকে ভাবতে শেখায়। আবদুল মামুন প্রগতিশীল পাঠকদের মধ্যে জনপ্রিয়। একটি নাম। আবদুল মামুনের আইডি ৩০ দিনের জন্য নিষিদ্ধ করেছে ফেসবুক। সেও মৌলবাদীদের রিপোর্টিংএর শিকার। আইসিস, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম, আর আল কায়দার খুনী সন্ত্রাসীদের আইডি কিন্তু যেমন ছিল তেমন আছে। ফেসবুকের কর্তারা এত কিছু বোঝে, শুধু এটা বোঝে না কাদের রাখতে হয়, কাদের বিয়ে করতে হয়? ফেসবুক এখন সন্ত্রাসীদের প্রিয় জায়গা। এটিকে তারা সন্ত্রাস ছড়ানোর কাজে ব্যবহার করে। কী ভালোই না হতো ফেসবুক কর্মকর্তা যদি ফেসবুককে ধর্মান্ধতা, মৌলবাদিতা, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, খুন বন্ধ করার কাজেও ব্যবহৃত হতে দিতো। কিন্তু কী করে হবে, যদি রিপোর্টিং এর ব্যবস্থা থাকে এবং ফেসবুক ভর্তি থাকে জঙ্গী সন্ত্রাসীতে। আমি বুঝি না কেন ফেসবুকের কেউ যাচাই করে দেখে না কারা রিপোর্ট করে, এবং যাদের আইডি রিপোর্ট করে, তারাই বা কারা, তারা কী লেখে! যাচাই না করলে, এভাবেই চলতে দিলে যেভাবে চলছে, আজ হোক কাল হোক সব মুক্তচিন্তককে ফেসবুক থেকে বিদেয় নিতে হবে। নাস্তিক ব্লগাররা বাংলাদেশের নাগরিক। এই নাগরিকরা প্রতিদিন মৃত্যুর হুমকি নিয়ে জীবন যাপন করছে। তারা জানেনা কে কখন পেছন থেকে তাদের মাথায় কোপ বসাবে। বাংলাদেশ যদি কোনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে থাকে, তবে নাস্তিক ব্লগারদের নিরাপত্তা দেবে। আর যদি এটি সম্পূর্ণ ইসলামী রাষ্ট্র, তবে নিরাপত্তা দেবে না। বাংলাদেশ ঘোষণা করে দিক যে, এটি এখন সম্পূর্ণই ইসলামী রাষ্ট্র। ঘোষণা করুক, কোনও সভ্য আইন বলে কিছু নেই এ দেশে, এ দেশ শরিয়ার দেশ। মদিনা সনদ অনুযায়ী দেশ চলছে, এবং চলবে, এটা ফাইনাল। বলে দিক।
পড়ানো
উড্রো উইলসন ফেলো হিসেবে আমেরিকার বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি কিছুকাল পড়িয়েছিলাম। আগে কখনও তো ছাত্র ছাত্রী পড়াইনি। ওই প্রথম। প্রথম দিকে ক্লাসের চাপ অতিরিক্ত মনে হচ্ছিল।পরে, ধীরে ধীরে সবকিছু সহজ হয়ে গিয়েছিল। আসলে আমার পড়ানোগুলো কোনও সিলেবাস থেকে নয়। এক একটা ক্লাসে একেকটা বিষয় পড়াতাম। এর জন্য আমার কোনও পড়াশোনা করার দরকার হতো না। আমি যা জানি, যে বিষয়ে যতটুকুই আমার জ্ঞান, তা ই বলতে হতো। মানববাদ, নারীবাদ,বর্ণবাদ,শিল্প, সাহিত্য, যুদ্ধ, ধর্ম, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শান্তি– কী ছিল না বিষয়! ছাত্রছাত্রীরা বেশ খুশি ছিল, বেশ উত্তেজিত। আমার কত কত অভিজ্ঞতা যে শেয়ার করেছি। কিন্তু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দুএকজন ধর্মপ্রাণ প্রধান একসময় আপত্তি জানালেন, তাঁরা উড্রো উইলসন ফেলো প্রোগ্রামে জানিয়ে দিলেন, কী, আমি নাকি ধর্মের সমালোচনাটা বেশি করছি। আমার লেকচার কিছু ছাত্রছাত্রীর ধর্মানুভূতিতে আঘাত দিচ্ছে। আমার চাকরি নট। ইওরোপের কোনও কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাকে পড়াতে হয়েছে। ধর্ম নিয়ে কনজারভেটিভ আমেরিকার মতো সমস্যা ওখানে নেই। লুক্সেমবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ক্লাস নিয়েছি একদিন। নারীর অধিকার নিয়ে বলতে গিয়ে ধর্মের সমালোচনা করেছি, বিশেষ করে ক্রিশ্চিয়ানিটির। মন দিয়ে শুনেছে সবাই। বুদ্ধিদীপ্ত সব প্রশ্ন করেছে। ক্লাস শেষ হলে আমার সঙ্গে ছবি তোলার জন্য ব্যাকুল হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অনুরোধ করেছেন, ফের কখনও লুক্সেমবার্গ এলে আবার যেন ক্লাস নিই।
পতিতাপ্রথা বন্ধ হোক
পতিতাপ্রথা নির্মূল করার জন্য ফ্রান্সে চমৎকার একটা আইন পাশ হয়ে গেল। মূল কথা হলো, শরীর বেচতে পারো তুমি, কিন্তু শরীর কিনতে পারো না। ধরা পড়লে পতিতার খদ্দেরকে পনেরোশ ইউরো জরিমানা দিতে হবে। পনেরোশ ইউরো বাংলাদেশের টাকায় এক লক্ষ আটান্ন হাজার আটশ তিপান্ন। পতিতাদের জন্য কোনও জরিমানা বা শাস্তির ব্যবস্থা নেই। বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, দুঃখিতা, নির্যাতিতা মেয়েদের বাঁচাবার জন্য আসলে শরীর বেচা অন্যায় নয়, পতিতাপ্রথা নির্মূল আইনে এই অংশটির অবতারণা। পতিতাপ্রথা বন্ধ করার আইন অনেক দেশই করেছে, কিন্তু সুইডেনই প্রথম এই অভিনব আইনটি তৈরি করেছিল, যৌন সম্পর্কের জন্য শরীর বিক্রি করা অন্যায় নয়, শরীর কেনা অন্যায়। কিন্তু এখানেই সবকিছুর শেষ নয়। পতিতাদের জন্য নতুন চাকরি বা ব্যাবসার ব্যবস্থা করা দেওয়া তো আছেই, অন্যের যৌন পুতুল না হয়ে নিজের মান মর্যাদা নিয়ে নতুন জীবন যাপনে যাওয়ার পথও তাদের দেখিয়ে দেওয়া হয়। সুইডেনের আইনটি ইউরোপের অনেক দেশকেই প্রভাবিত করেছে, এবং অনেক দেশই সুইডেনের এই আইনটি গ্রহণ করেছে। ফ্রান্সের প্রথম নারী অধিকার মন্ত্রী নাজাত বেলকাসেম ফ্রান্সে এই পতিতাপ্রথা বিলুপ্তির আইনটি পাশ করার ব্যাপারে সেদিন আমার একটা লেখা বের হয়েছে লা মন্দ নামের ফরাসি পত্রিকায়। নাজাত খুব উচ্ছ্বসিত আমার লেখাটি নিয়ে। নাজাত কিন্তু জাতে ফরাসি নন, মরক্কোর মেয়ে, মুসলমান। কিন্তু ফান্সেই লেখাপড়া করেছেন, বেড়ে উঠেছেন। তিরিশের কোঠায় বয়স, নারীবাদী, সংগ্রামী।
