বাংলাদশ থেকেও যেন অচিরে পতিতাপ্রথার বিলুপ্তি ঘটে। সমগ্র বিশ্ব থেকেই যেন নারীবিরোধী এই প্রথাটি নির্বংশ হয়। ব্যাপারটি সোজা নয়, পতিতাপ্রথা টিকিয়ে রাখার জন্য নানা মহল উদগ্রীব, এতে কিছু নারী সংগঠন যেমন আছে, স্বয়ং পতিতারাও আছে।
ক্রীতদাসপ্রথার সঙ্গে পতিতাপ্রথার মূলত কোনও পার্থক্য নেই। ক্রীতদাসরা যখন তুলো ক্ষেতে চাষের কাজ করতো, দাসমালিকরা প্রায়ই সশরীরে উপস্থিত হয়ে কিছু ক্রীতদাসীকে যৌনকর্মের জন্য তুলে নিয়ে যেতো। ত্বক যাদের একটু কম কালো, সাধারণত তাদেরকেই পছন্দ করতো। বাজারে নিয়ে যৌন ব্যবসার জন্য ভাড়া খাটাতো, নয়তো সরাসরি পতিতালয়েই তাদের নগদ টাকায় বিক্রি করে দিতো। আঠারো/উনিশ শতকে যে প্রথাটিকে বলা হতো ক্রীতদাস প্রথা, বিংশ/একবিংশ শতকে সেই প্রথাকে বলা হচ্ছে পতিতাপ্রথা।
উনিশ শতকে ক্রীতদাসপ্রথার বিলুপ্তির সময় মানুষের ক্রয় বিক্রয় নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল বিরাট বিতর্ক। ক্রীতদাসদের মুক্তির প্রশ্ন উঠলে সমাজের অনেক সাদা ভদ্রলোক মন্তব্য করেছিলো, আফ্রিকার কালো মানুষগুলো আসলে ক্রীতদাস হিসেবেই ভালো আছে। স্বাধীনতা উপভোগ করার কোনও অধিকার বা যোগ্যতা তাদের নেই। সত্যি কথা বলতে কী, এই ক্রীতদাসদাসীগুলোর সঙ্গে যত না মানুষের মিল, তার চেয়ে বেশি জন্তু জানোয়ারের মিল।
শুধু সাদারা নয়, অনেক ক্রীতদাসীও এই প্রথার বিলুপ্তি চায়নি। বিশেষ করে সেই ক্রীতদাসীরা, যারা মালিকদের বাড়িতে বাচ্চাকাচ্চা দেখাশোনা, রান্না বান্না আর ঘরদোর পরিষ্কারের কাজ করতো। তাদের অবস্থা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা চাষের ক্ষেতের ক্রীতদাসীদের চেয়ে ভালো ছিলো। মালিকদের বাড়ির খাবার খেয়ে, যদিও উচ্ছিষ্ট, তৃপ্তই ছিলো বাড়ির ক্রীতদাসীরা। আসলে ক্রীতদাসীর জীবন ছাড়া অন্য কোনও জীবনের কথা তারা নিজেদের জন্য ঠিক কল্পনাও করতে পারতো না। বাড়ির ক্রীতদাসীরা না চাইলেও ক্ষেতের ক্রীতদাসীরা কিন্তু ক্রীতদাসপ্রথার বিলুপ্তি চেয়েছিলো।
আমরা আজ সেই ইতিহাসেরই পুনরাবৃত্তি করছি। পতিতাপ্রথার পক্ষে সাধারণত যারা মুখর তারা নিজেরা কখনও পতিতা ছিলোনা বা যৌনব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলো না, পতিতালয়ের বা পতিতাপ্রথার নির্যাতন তাদের সইতে হয়নি। যৌনব্যবসায় জড়িত এমন অনেক মেয়েও পতিতাপ্রথার পক্ষে বলছে। তারা বলছে, অন্য যে কোনও শ্রমের মতো পতিতাবৃত্তিও শ্রম। আগ বাড়িয়ে এও কেউ কেউ বলছে যে এই শ্রম নাকি সমাজে মেয়েদের ক্ষমতায়নে সাহায্য করছে।
কলগার্ল হিসেবে যারা কাজ করে, ম্যাডামএর ভূমিকায় যারা, তাদের অভিজ্ঞতা নিঃসন্দেহে রাস্তার পতিতাদের চেয়ে ভিন্ন। তাই পতিতাদের উঁচু শ্রেণী, মাঝারী শ্রেণী, আর নিচু শ্রেণীতে ভাগ করার একটা প্রবণতা দেখা দেয়। এ কিন্তু অনেকটা সেই ক্রীতদাসীর শ্রেণীভাগের মতো। বাড়ির ক্রীতদাসীরা উঁচু শ্রেণীর ক্রীতদাসী, আর ক্ষেতে খাটা ক্রীতদাসীরা নিচু শ্রেণীর ক্রীতদাসী। তা ঠিক, তবে সবচেয়ে নিষ্ঠুর সত্য হলো, তারা সবাই ক্রীতদাসী। এক মালিকের অধীনেই তাদের দাসত্ব করতে হয়েছে। দাসত্ব চকচক করলেই দাসত্বের সংজ্ঞা পাল্টে যায় না। যে মেয়েরা আজ এই পতিতাপ্রথার ভেতরে থেকে এই প্রথার পক্ষে কথা বলছে, এই প্রথা থেকে তারা না বেরিয়ে এলে তাদের পক্ষেও বোঝা সম্ভব নয় প্রথাটি ঠিক কী। বাড়ির ক্রীতদাসীদেরও ক্রীতদাসপ্রথার বাইরে এসে বুঝতে হয়েছে ক্রীতদাসপ্রথাটা ঠিক কী ছিল।
ক্রীতদাসপ্রথা আর পতিতাপ্রথার মূলে আছে খাঁটি দাসত্ব। শুধু পরিচয়টা দুক্ষেত্রে ভিন্ন হতে হয়। পতিতাপ্রথার জন্য দরকার যৌন পরিচয়, ক্রীতদাসপ্রথার জন্য দরকার বর্ণ পরিচয়। এই দুই প্রথা ও প্রতিষ্ঠান একই প্রকৃতির। একই প্রক্রিয়ায় মানুষের ওপর শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালানো হয়। মানুষকে অসম্মানিত, অপমানিত, নির্যাতিত ও নিগ্রীহিত করা হয়।
এই পৃথিবীতে মেয়েদের বিরুদ্ধে একটা যৌনযুদ্ধ চলছে। দীর্ঘ দীর্ঘ কাল এই যুদ্ধটা চলছে। এটাকে পৃথিবীর প্রাচীনতম পেশা বলে লোককে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা হয় বটে, আসলে এটা কিন্তু প্রাচীনতম পেশা নয়, এটা বরং মেয়েদের বিরুদ্ধে পৃথিবীর প্রাচীনতম নির্যাতন। শুধু প্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েদের বিরুদ্ধে বলাটা ঠিক নয়, মেয়েশিশুদের বিরুদ্ধেও বটে। আজ বিশ্বের প্রায় সর্বত্র শিশুদের জোর জবরদস্তি করে, ভয় দেখিয়ে, ধর্ষণ করে, মেরে আধমরা করে যৌনক্রীতদাসী বানানো হচ্ছে। পুরুষের যৌনক্ষুধা মেটাতে, পুরুষের শরীরকে কিছুক্ষণের জন্য পুলক দিতে লক্ষ কোটি অসহায় মেয়ে ও শিশুকে বেঁচে থাকার সর্বসুখ বিসর্জন দিতে হচ্ছে, মানুষ হয়েও মানুষের ন্যূনতম অধিকার থেকে তারা নিজেদের বঞ্চিত করতে বাধ্য হচ্ছে।
পতিতাপ্রথার সহজ সংজ্ঞা হলো, মেয়েদের বিরুদ্ধে পুরুষের যৌন নির্যাতন। আরও একটু খুলে বললে পতিতাপ্রথার মানে মেয়েদের বিরুদ্ধে পুরুষের যৌন হেনস্থা, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, মানসিক নির্যাতন, মেয়েদের ওপর পুরুষের অবাধ আধিপত্য, মেয়েদের মানবাধিকার লঙ্খন। এসব যদিও যে কোনও গণতন্ত্রে আইনত নিষিদ্ধ, কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পতিতালয়ের ভেতরে এসব বহাল তবিয়তে চলছে। যতটা ঘৃণ্যতম, কুৎসিততম, জঘন্যতম, উৎকটতম, কদর্যতম, নিকৃষ্টতম ব্যবহার কোনও মেয়ের সঙ্গে করা সম্ভব পুরুষের, তা নির্দ্বিধায় পুরুষেরা করে পতিতাদের সঙ্গে। যদিও এই ব্যবহার করলে আইনের চোখে তারা অপরাধী, কিন্তু পতিতাবৃত্তিকে বৈধ করলে এইসব অপরাধকে আপনাতেই বৈধ বলে মেনে নেওয়া হয়।
