একসময় ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা বদলি হই। নার্গিসের আর খোঁজ নেওয়া হয় না। শুনেছি ওর বিয়ে হয়ে গেছে। মার অসুখের সময়, ষোলো বছর আগে যখন গিয়েছি দেশে, নার্গিসের খোঁজ করেছি। নার্গিস এসেছিল দেখা করতে, ওর তিন বাচ্চা নিয়ে। ওর বিয়ে হয়েছে এক ডাকাতের সঙ্গে। নার্গিসকে বিষম মারধর করে। বিয়ের সময় ওরা জানতো না যে লোকটা ডাকাত। ডাকাতি করে স্বামী প্রায়ই ধরা পড়ে। জেল খাটে। স্বামীর আত্মীয় স্বজনের সব কাজকর্ম একা নার্গিসকেই করতে হয়। ওদেরও লাথি গুঁতো খায় ও। সেদিন কয়েক হাজার টাকা নার্গিসের হাতে দিয়েছি। দেখলাম সেই কিশোরী নার্গিসই যেন। তেমনই সরল। তেমনই লাজুক। অসহ্য অভাবের সংসার। তারপরও টাকা হাতে নিতে লজ্জা পায়। ছোটবেলায় ঠিক যেমন একটা বিস্কুট হাতে নিতে লজ্জা পেতো। নার্গিসকে বলেছিলাম ডাকাতের কাছে আর না যেতে, অথবা ডাকাতকে তালাক দিয়ে ভালো কোনও ছেলে দেখে যেন বিয়ে করে নেয়। নার্গিস হেসে বললো, আফা কী যে কইন, বিয়া তো জীবনে একবারই অয়। বিদেশ থেকে দুতিন বার কারো কারও হাতে নার্গিসের জন্য টাকা পাঠিয়েছি। ও টাকা ওর হাতে আর পোঁছয়নি। যার হাতে টাকা দিয়েছি, সে নিজেই সাবাড় করেছে টাকা।
নার্গিস পরশু ফোন করেছিল। কয়েক বছর চেষ্টা করে আমার ফোন নম্বর যোগাড় করেছে। ষোলো বছর পর নার্গিসের কণ্ঠস্বর শুনছি। সেই আগের মতোই। সততা আর সরলতা চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। আফা, কিরম আছুইন? শইলডা বালা? রাইতের খাওয়া খাইছইন? শুনে চোখ জ্বালা করে। ঠিক এভাবেই আমার সঙ্গে আদর করে কথা বলতো ও। আমার চেয়ে বয়সে ছোট। কিন্তু আমাকে দেখে রাখার দায়িত্ব যেন ও-ই নিয়েছিল।
নার্গিসের ডাকাত স্বামী আরেকটা বিয়ে করেছে। পাঁচ বাচ্চা সহ নার্গিসকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। নার্গিসের বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। আরেক মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে। নার্গিস বললো, আমার মেয়ের সাথে কতা কইন আফা। ফোনটা সে দিল তার নাইনে পড়া মেয়েকে। কত গর্ব করে বললো তার মেয়ে নাইনে পড়ে। আমার কী যে ভালো লাগলো জেনে যে নার্গিসের মেয়ে কারও বাড়িতে ক্রীতদাসীর মতো কাজ করে না। সে ইস্কুলে যায়। সে পড়ে।
নার্গিস কোনও টাকা চায়নি। কোনওদিন ও কারো কাছে কিছু চায়নি। আমি নিজেই ভেবেছি, এ বছর বের হওয়া আমার নতুন বইয়ের রয়্যালটির টাকা আমি নেবো না, নার্গিসকে পাঠিয়ে দেবো। এবার এমন ভাবে পাঠাবো যেন নার্গিসের হাতে পৌঁছোয় টাকাটা। আমি নিজে তো ধনী কেউ নই। পঞ্চাশ হাজার টাকা আমার জন্যও অনেক টাকা। আমার না হয় কিছুটা কমই হলো এবার। নার্গিসের তো সারা জীবন কম হয়েছে। আমি কি প্রায়শ্চিত্য করছি? আমার মনে হয়, আমি প্রায়শ্চিত্যই করছি। এই সমাজ একটা অসহায় দরিদ্র মেয়েকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করেছে, তার প্রায়শ্চিত্য। যে মেয়ের ইস্কুলে পড়ার কথা ছিল, সে মেয়ে লোকের বাড়িতে কাজ করতো, বাসন মাজতো, কাপড় কাঁচতো, ঘর মুছতো, উঠোন ঝাঁট দিত, রান্না করতো। প্রচণ্ড অসহায়তা, অনিশ্চয়তা, আর নিরাপত্তাহীনতানিয়ে লোকের বাড়িতে থাকতো, মশা কামড়াতো, মানুষ চড় থাপড় দিতো, কিল ঘুষি দিতো, পেটাতো, ধর্ষণ করতে চাইতো, তার প্রায়শ্চিত। ডাকাত স্বামী আর তার আত্মীয় স্বজনের অত্যাচারের প্রায়শ্চিত। নার্গিসকে তার জীবনটাই কাটাতে হয়েছে এক জীবন যন্ত্রণার মধ্যে, তার প্রায়শ্চিত্য। এই সমাজের পাপের প্রায়শ্চিত্য আমি করছি। লক্ষ লক্ষ মেয়ে নার্গিসের মতো ভোগে। কিন্তু সবার দুঃখ তো আমি একা ঘোচাতে পারবো না। একজনের দুঃখ অন্তত কিছুটা হলেও ঘোচাবার চেষ্টা না হয় করি।
নাস্তিক নাগরিকদের নিরাপত্তা দিন
আমার বিরুদ্ধে যখন বাংলাদেশ উত্তাল, যখন মৌলবাদী সন্ত্রাসী আর দেশের সরকার মিলে মিশে আমার বিরুদ্ধে হেন বদমাইশি নেই করছে না, তখন কিন্তু এখনকার অনেক নাস্তিক ব্লগারের জন্মও হয়নি। সেই আশির দশক থেকে বাংলাদেশের আগপাশতলা ইসলামের পানি দিয়ে ধোয়া হচ্ছে, ইসলামের সোনা দিয়ে মোড়ানো হচ্ছে। তার ফুল এখন হাতে নাতে পাচ্ছে সবাই। আমাকে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে বলে আজও প্রাণে বেঁচে আছি। এখন দেশের তরুণ নাস্তিক ব্লগারদের এক এক করে কুপিয়ে মারা হচ্ছে। প্রাণ বাঁচানোর জন্য এরা এখন দেশের বাইরে বেরোতে চাইছে। কিছুদিন আগে যুগান্তর পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো পুলিশের এক বিশেষ রিপোর্ট। আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নাকি ভারতে তিনটে স্লিপার সেল পাঠিয়েছে আমাকে মেরে ফেলার জন্য। আমি ইউরোপের নাগরিক, আমেরিকার গ্রীনকার্ড ধারী। আমি বিপদের আঁচ পেলে উড়াল দিতে পারবো। কিন্তু বাংলাদেশের ব্লগাররা উড়াল দেবে কী করে? তাদের পাসপোর্ট চাই, বিদেশ থেকে আমন্ত্রণ চাই, ভিসা পেতে গেলে ব্যাংক ব্যালেন্স সহ হাবিজাবি কাগজপত্র চাই। সবাই ভাবছে, এর পরের ভিকটিম বোধহয় সে নিজেই। আমি লিখেছি অনেক, হাসিনা যেন নাস্তিক ব্লগারদের,যাদের জীবনের হুমকি আছে, নিরাপত্তা দেন। আমার কথা হাসিনা শুনবেন কেন? হু এম আই? তিনি হলেন প্রধানমন্ত্রী। বিশাল জিনিস। হাতের কাছে পেলে তিনিই আমাকে কোপাবেন। আসল কথা হলো, হাসিনা পরের নির্বাচনে জেতার জন্য মৌলবাদী পটাচ্ছেন, তিনি ব্লগারদের নিরাপত্তা তো দেবেনই না, খুনীদের বিরুদ্ধেও কোনও ব্যবস্থা নেবেন না। এই দুঃসহ অবস্থায় দেশ ত্যাগ করা ছাড়া নাস্তিক ব্লগারদের আর কোনও উপায় নেই। আপাতত বাঁচুক। দেশের অবস্থা ভালো হলে না হয় ফিরবে দেশে। কিন্তু শাহরিয়ার কবির চান না ব্লগাররা দেশ ছাড়ক। তিনি বলছেন, এতে লাভ হবে না, জামাতে ইসলামিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। জামাতে ইসলামি নিষিদ্ধ হলে সন্ত্রাসীরা নাস্তিকদের খুন করবে না? কোনও কি গ্যারেন্টি আছে? এতকাল যাবৎ জামাতে ইসলামির বাইরেও লক্ষ লক্ষ মৌলবাদী-সন্ত্রাসীর জন্ম হয়েছে, তারা জামাতের চেয়েও লক্ষ গুণে ভয়ংকর। তারা আইসিস আলকায়দার নির্দেশে চলে। শাহরিয়ার কবির বললেন তাঁর হাতে পিস্তল আছে, এবং তিনি একা বাইরে বেরোন না। শাহরিয়ার কবির না হয় পিস্তল এবং পিস্তলের লাইসেন্স যোগাড় করতে পারেন। কিন্তু অল্প বয়সী নাস্তিক ব্লগাররা পিস্তল কোত্থেকে যোগাড় করবে, লাইসেন্সই বা তাদের কে দেবে? যে সরকার তাদের কোনও দেহরক্ষী দেয় না, সে সরকার দেবে লাইসেন্স?
