বাদল বসু লিখেছেন আমি নাকি সটান গিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পা জড়িয়ে ধরে বলেছি, শুভ দোল। মিথ্যে কথা। আমি কোনওদিনই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পায়ে হাত দিইনি, জড়িয়ে ধরা তো দূরের কথা। খুব শ্রদ্ধা করি, এমন কাউকে আমি বড়জোর হাত জোড় করে নমস্কার করি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কেও হাত জোড় করেই নমস্কার করেছি, কিন্তু তাঁর বাড়িতে নয়, কারণ তাঁর বাড়িতে যাওয়ার আগেই তাঁর সঙ্গে আমাদের কলাভবনে এবং ইন্দ্রনাথ মজুমদারের বইএর দোকান সুবর্ণরেখায় দেখা হয়েছিল। শুভ দোল আমি কাউকে আজ অবধি বলিনি।
বাদল বসু লিখেছেন, ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা থতমত খেয়ে গিয়েছি। সুনীলও কিছু বলার এবং বাধা দেওয়ার সুযোগ পাননি। যে ঘটনা আদৌ ঘটেনি, তার আকস্মিকতা বলে তো কিছু থাকতে পারে না। এবং সেই না-ঘটা ঘটনাকে গ্রহণ করা এবং বাধা দেওয়ারও কিছু থাকতে পারে না।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বাড়িতে আমরা বেশিক্ষণ ছিলাম না। লাঞ্চের আগেই চলে আসি। বাদল বসু লিখেছেন, তিনি নাকি ভেতরের ঘরে গিয়ে দেখলেন স্বাতী নিঃশব্দে কাঁদছেন। বাদল বসু কি বলতে চাইছেন তসলিমা সুনীলের জড়িয়ে ধরে শুভ দোল বলেছে, সুতরাং স্বাতী কেঁদেছেন? আমার প্রশ্ন, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পা জড়িয়ে যদি আমি শুভ দোল বলতামই সেই দোলের দিন, তাতে স্বাতী কেন কাঁদবেন?
আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পা জড়িয়ে ধরে শুভ দোল যে বলে, তাকে কি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যৌন হেনস্থা করতে পারেন না? বাদল বসু মনে হয় বলতে চাইছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তসলিমাকে যৌন হেনস্থা করবে কী, তসলিমাই সুনীলকে যৌন হেনস্থা করেছিল ৯২ সালে সুনীলের জড়িয়ে শুভ দোল বলে! যদিও ঘটনাটি বাদল বসুর বানানো, কিন্তু যদি সত্যিও হতো, তাহলেও শান্তিনিকেতনে দোলের দিন কোনও বয়োজ্যেষ্ঠ লেখককে বাড়ি ভর্তি লোকের সামনে পা জড়িয়ে ধরে শুভ দোল বলাটা কোনওভাবেই কোনও রকম যৌন হেনস্থা নয়। এবং যার পা জড়িয়ে ধরা হয়, তার পক্ষে যে পা জড়িয়ে ধরে, তাকে, যৌন হেনস্থা করাটা সম্ভব নয় –এ সম্পূর্ণই অযৌক্তিক।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ করাতে বাদল বসু আমার সম্পর্কে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে, কুৎসা রটিয়ে, মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করছেন যে, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আমাকে যৌন হেনস্থা করেননি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে বাদল বসু কিন্তু তাঁর অনেক গোপন কথা জানতেন। মেয়েদের যে তিনি যৌন হেনস্থা করেন, তা আমার চেয়েও ভালো জানতেন বাদল বসু। কিন্তু এখন সুনীলকে মহান প্রমাণ করতে যদি চান, তাহলে আমার নিন্দা করে সুনীলকে মহান করার পথ তিনি কী কারণে বেছে নিলেন? এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনও বদ উদ্দেশ্য আছে।
ছোট ছোট ভাবনা
১. মাহমুদুর রহমান মান্নাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহ, মেডিক্যাল কলেজের নবীন বরণ উৎসবে। আমি তখন নবীন। সবে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছি। গান কবিতা বক্তৃতা শুনিয়ে নবীনদের বরণ করে নিচ্ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন। জাসদের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে ঢাকা থেকে এসেছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না। ঢাকা থেকে যত নেতা এসেছিলেন, সবচেয়ে ভালো বক্তৃতা করেছিলেন মাহমুদুর রহমান মান্না। কী যে মুগ্ধ হয়েছিলাম মান্নার বক্তৃতা শুনে। সবার জন্য শিক্ষা স্বাস্থ্য, সবার জন্য অন্ন বস্ত্র, সবার জন্য নিরাপত্তার দাবি সবচেয়ে বেশি ছিল মান্নার কণ্ঠে। আমার সতেরো আঠারো বছর বয়সের মুগ্ধতা সত্যি বলতে কী, কখনও ফিকে হয়নি। কিছু জিনিস চিরকাল রয়ে যায় স্মৃতিতে। বড় হয়ে খবরের কাগজে পড়েছি মাহমুদুর রহমান মান্নার নিয়মিত কলাম। একই কাগজে আমিও তখন লিখতাম। খুব গর্ব হত, যে পত্রিকায় মান্নার মতো আদর্শ রাজনীতিক লেখেন, সেই পত্রিকায় আমিও লিখি।
কিন্তু কাল শুনলাম তিনি নাকি দেশে কিছু লাশ ফেলে দেওয়ার কথা বলেছেন। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে পড়ছিল এককালের সেই প্রচণ্ড আদর্শবাদী মান্নাকে, যার আহবানে যুব সমাজ দেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছিল। কোথায় গেল দেশ গড়া! আজ মান্না দেশের লোককে গুলি করে মেরে ফেলা হলে আপত্তি করবেন না বলে জানিয়েছেন। কবে থেকে যে তিনিও দেশের নোংরা রাজনীতিতে জড়িয়ে গেছেন জানি না। খুব বেশি কিছু না জানাও হয়তো ভালো। ও-ই ভালো ছিল, জানতাম যে, দেশে এখনও কিছু আদর্শবান মানুষ আছেন, যাঁরা দেশের জন্য, দেশের মানুষের নিরাপত্তার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিতে পারেন। রাজনীতিকদের সবকিছু হয়তো জানতে নেই। তাঁরা যেটুকু জানান, শুধু সেটুকু জানাই হয়তো ভালো। শুধু সেটুকু জানলে আমাদের মনে আশা ভরসা, সুখ স্বপ্ন, সবকিছু অক্ষত অবস্থায় থাকে। তাঁদের লাশ ফেলে দেওয়ার ইচ্ছের কথা জানলে আমাদের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। কেবল কি মান্নাই, সন্ত্রাস, নাশকতা আর লাশ ফেলে দেওয়ার ইচ্ছে নিশ্চয়ই আরও অনেক রাজনীতিকের। দেশটা ক্ষমতাবান,ষড়যন্ত্রবাজ,ধান্দাবাজ রাজনীতিকদের হাতে বন্দি।
২. এরই নাম বুঝি জাত্যাভিমান! বাঙালির বাঙালিত্ব কতটুকু অবশিষ্ট আছে বাংলাদেশে? আরবীয় সংস্কৃতি দিয়ে বাংলা সংস্কৃতিকে কি যথেচ্ছ ধর্ষণ করানো হয়নি? জাতীয় সঙ্গীতটা কেউ আগা থেকে গাইলো নাকি গোড়া থেকে গাইলো, তা বিরাট এক ব্যাপার বটে! কেউ মাঝখান থেকে গাইলে নাকি জনতার জাত্যানুভূতিতে আঘাত লাগে! জাতের নামে বজ্জাতি আর কাকে বলে। যাদের সভ্যতা সংস্কৃতি, শিক্ষা সচেতনতা বলতে প্রায় কিছুই নেই, যারা দারিদ্র, দুর্নীতি, অন্ধতা, হিংসা, ঘৃণা, লোভ, সন্ত্রাস ইত্যাদি থেকে নিজেদের মুক্ত করতে পারে না, তাদের আর কিছু না থাকুক, একটা জাতীয় সীমানা আছে, একটা জাতীয় সঙ্গীত আছে, আর একটা জাতীয় পতাকা আছে! ব্যর্থ সরকাররা ওগুলোই জনতার হাতে ধরিয়ে দিয়ে নিজেদের ব্যর্থতাকে লুকোয়! আর নির্বোধ জনতা ওগুলোই আঁকড়ে ধরে বড় সন্তুষ্ট, তৃপ্ত আর গর্বিত।
